বিশেষ প্রতিনিধি ও এনামুল হক
ধর্মপাশার ১০ ইউনিয়নের ৯ টিতেই বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে বেকায়দায় পড়েছে আওয়ামী লীগ। ষষ্ঠ ধাপে (৪ জুন) এই উপজেলার নির্বাচন। আগামী ১৯ মে উপজেলার ১০ ইউনিয়নের প্রার্থীদের মনোনয়ন প্রত্যাহারের দিন। বিদ্রোহীরা প্রার্থীতা থেকে সরে না দাঁড়ালে সবকয়টি ইউনিয়নেই দলীয় প্রার্থী অর্থাৎ নৌকা প্রতীকের বিজয় অনিশ্চিত হয়ে পড়বে বলে মন্তব্য করেছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সম্পাদক দুজনেই। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি স্থানীয় সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বলেছেন,‘যোগ্য প্রার্থীরা নৌকা পায়নি, এমনকি মনোনয়ন বোর্ডেই তাদের নাম যায়নি, এই অবস্থায় বেশিরভাগ ইউনিয়নেই চ্যালেঞ্জে পড়েছে দলীয় প্রার্থীরা’।
উপজেলার সেলবরষ ইউনিয়নে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন আলাউদ্দিন শাহ্। এই ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা মুক্তিযোদ্ধা নূর হোসেন ও আওয়ামী লীগ নেতা আবু হেনা লিটন।
পাইকুরাটি ইউনিয়নে দলীয় প্রার্থী করা হয়েছে বর্তমান চেয়ারম্যান মো. ফেরদৌসুর রহমানকে। এখানে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা মোজাম্মেল হক ইকবাল ও রেহান উদ্দিন।
ধর্মপাশা সদর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন বর্তমান চেয়ারম্যান দলীয় নেতা ফখরুল ইসলাম চৌধুরী। এই ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন দলীয় নেতা সেলিম আহমদ।
মধ্যনগর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন প্রবীর বিজয় তালুকদার। এই ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন পরিতোষ চন্দ্র সরকার ও সাখাওয়াত হোসেন।
চামরদানী ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন আলমগীর খসরু। এই ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন বর্তমান চেয়ারম্যান মধ্যনগর থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক প্রভাকর তালুকদার পান্না, আওয়ামী লীগ নেতা জাকিরুল আজাদ মান্না ও মিল্টন তালুকদার।
জয়শ্রী ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন দলীয় নেতা সঞ্জয় রায় চৌধুরী। এখানে জাহাঙ্গীর আলম হয়েছেন বিদ্রোহী প্রার্থী।
সুখাইড় রাজাপুর দক্ষিণ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী হয়েছেন বর্তমান চেয়ারম্যান মোকারম হোসেন, এখানে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন আমানুর রাজা চৌধুরী ও মোকাব্বির হোসেন।
সুখাইড় রাজাপুর উত্তর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী হয়েছেন ফরহাদ হোসেন, বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা মনিন্দ্র চন্দ্র তালুকদার এবং তার ছেলে মুহিত লাল তালুকদার মুন।
বংশিকু-া দক্ষিণ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন আজিম মাহমুদ। বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন সাইদুর রহমান ও আকরাম হোসেন।
ধর্মপাশার একজন বিদ্রোহী প্রার্থী ও আওয়ামী লীগ নেতা বলেন,‘পরিচয় প্রকাশ করলে, নির্বাচনে আমার বিরুদ্ধে আদা-জল খেয়ে লাগবে নেতারা। ধর্মপাশা, তাহিরপুর ও জামালগঞ্জের সকল ইউনিয়নেই মনোনয়ন প্রদানের নেপথ্যে ভূমিকা রেখেছেন পুরাতন জেলা কমিটির এক নেতা, তিনি দায়িত্বশীল আরো ৩-৪ জনকে নিয়ে বাণিজ্যিক সি-িকেট গড়ে তুলেছিলেন। তাদের এই সি-িকেটের কাছে যারা ধরণা দিয়েছে তারা মনোনয়ন পেয়েছে। অন্যদিকে দু’একজন রয়েছে দল করুক আর না করুক, স্থানীয় সংসদ সদস্যের আস্থাভাজন হওয়ায় (সংসদ সদস্যের বদৌলতে) দলীয় মনোনয়ন পেয়েছে। এ কারণে অনেক যোগ্যরা মনোনয়ন পায়নি, ক্ষোভও ছড়িয়ে পড়েছে ইউনিয়নে-ইউনিয়নে। ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে’।
চামরদানী ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান প্রভাকর তালুকদার পান্না বলেন,‘মনোনয়ন বাণিজ্যের কারণেই আমি বাদ পড়েছি, আমি বর্তমান চেয়ারম্যান, মধ্যনগর থানা আওয়ামী লীগেরও যুগ্ম আহ্বায়ক, আমাকে কেন মনোনয়ন দেওয়া হলো না, মনোনয়ন বোর্ডের একজন প্রভাবশালী সদস্যকে এই প্রশ্ন আমি করেছিলাম, বলা হয়েছে সার্ভে রিপোর্ট আমার পক্ষে ছিল না, অবশ্য চার জুনেই দেখা যাবে সার্ভে রিপোর্টের ফলাফল কী হয়’।
ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমদ বিলকিস বলেন,‘৯ ইউনিয়নেই বিদ্রোহীরা জোরে-শোরে প্রচারণায় নেমেছে, দলের উপজেলা সভাপতি এমপি, আমি একা ৯ ইউনিয়নের এই বিদ্রোহ কীভাবে সামাল দেই, তবুও সকল ইউনিয়নেই নৌকার পক্ষে গিয়ে ভোট চাইবো, বিদ্রোহীরা প্রত্যাহার না করলে, সবকয়টি ইউনিয়নেই দলীয় প্রার্থীর বিজয় অনিশ্চিত হয়ে পড়বে’।
স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বলেন,‘প্রার্থী বাছাইয়ে অনিয়ম হওয়ায় বেশিরভাগ ইউনিয়নে কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়বে নৌকা, যোগ্য প্রার্থীদের নামই কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ডে যায়নি। এর মধ্যে মনিন্দ্র তালুকদার, জামাল হোসেন, মোবারক হোসেনসহ অনেক জনপ্রিয়দের নাম কেন্দ্রীয় মনোনয়নবোর্ড পায়নি। কোথাও কোথাও মনোনয়ন বাণিজ্যের কথাও শুনা গেছে। এখন দলীয় প্রার্থীদের বিজয় অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে’।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান বলেন,‘তৃণমূলের সিদ্ধান্ত মোতাবেকই প্রার্থী করা হয়েছে, জেলা থেকে মূল্যায়ন করা কঠিন এজন্য তৃণমূলের মতামত বিবেচনায় আনা হয়েছে, প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করার আগে আমার সঙ্গে পরামর্শ করে ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন ও সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমদ বিলকিসকে নিয়ে জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার ইমন তাঁর ঢাকার বাসায় বসে বিরোধ মিটিয়ে দিয়েছেন, পরে রতন-বিলকিস মিলেই তালিকা দিয়েছেন, এখন এসব অভিযোগ্য হাস্যকর হবে’। বিদ্রোহী প্রার্থী সংসদ সদস্য রতনের ঈশারায়-ই হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।