এনামুল হক এনি, ধর্মপাশা
আনোয়ার হোসেন ধর্মপাশা ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র। পত্র পত্রিকায় শিল্পকলা একাডেমির নাম দেখেছে। শিল্পকলা একাডেমির কি কার্যক্রম জানে না সে। সে এও জানে না ধর্মপাশা উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি কোথায় অবস্থিত।
একই কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র রোজোয়ান মিয়ার কাছেও উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির বিষয়টি অজানা। ধর্মপাশা আশরাফুল উলুম হাফিজিয়া মাদ্রাসার বিপরীতে একটি ঘর তার কাছে শিল্পকলা একাডেমি বলে মনে হয়। এখানে সঙ্গীত ও সংস্কৃতি চর্চা হতে দেখেছে সে। প্রতিবেদকের কাছে এটি (স্থানীয় উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর অস্থায়ী কার্যালয়) শিল্পকলা একাডেমি নয় এমনটি জানার পর অবাক হয় সে।
ধর্মপাশা জনতা মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র মাসুম মিয়া। আনোয়ার হোসেন ও রেজোয়ান মিয়ার মতো সেও জানে না উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির অবস্থান কোথায় আর কি তার কার্যক্রম। শুধু আনোয়ার হোসেন, রেজোয়ান মিয়া ও মাসুম মিয়া নয় এখানকার নতুন প্রজন্ম বা উঠতি বয়সের তরুণদের কাছে উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির বিষয়টি বেশ অজানা।
ধর্মপাশা-মধ্যনগর সড়কের ধর্মপাশা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের উত্তর পাশে উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির অবস্থান। একটি জরাজীর্ণ আধাপাকা ভবন। ভবনের একটি দরজা খোলা আরেকটি তালাবদ্ধ। জানালাগুলো জরাজীর্ণ। দু’একটি ভেঙে গেছে। ভবনের ভেতরে মলমূত্র, ময়লা আবর্জনার স্তুপ, আছে একটি টেবিল। এভাবেই দীর্ঘ বছর ধরে উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি
অবহেলা আর জরজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে।
২০১৪ সালে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সভাপতি করে প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ স্থানীয় সংস্কৃতিসেবীদের নিয়ে শিল্পকলা একাডেমির কমিটি গঠন করা হয়। তবে সেই কমিটি সফলতার মুখ দেখতে পারেনি। এরপর বিভিন্ন সময় ভবনটি নামমাত্র সংস্কার করা হলেও এটি ব্যবহার উপযোগী হয়ে উঠেনি। ফলে এ উপজেলায় সংস্কৃতি চর্চা মারাত্মকভাবে ব্যহত হচ্ছে।
বাংলাদেশ কবি ইউনিয়ন (বাকই) এর সভাপতি কবি শাকিল আহমেদ মুন জানান, উঠতি বয়সের তরুণ কিংবা শিক্ষার্থীরা উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি সম্পর্কে না জানার বিষয়টি দুঃখজনক নয় বরং দুঃখ ও লজ্জাজনক বিষয় হচ্ছে এর সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের গাফিলতির কারণে বছরের পর বছর ধরে শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম বন্ধ থাকার বিষয়টি।
উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে থাকা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আশরাফুল ইসলাম জানান, তিনি ধর্মপাশা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার দায়িত্ব গ্রহণের আগে তৎকালীন মৎস্য কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পরে তিনি জাহাঙ্গীর আলমের স্থলাভিষিক্ত হন। উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না পাওয়ায় জরাজীর্ণ হয়ে আছে বলে দাবি করেন তিনি।
ধর্মপাশা উপজেলা উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি চয়ন কান্তি দাস ও সাংগঠনিক সম্পাদক সাজিদুল হক সাজু জানান, বিভিন্ন কারণে ধর্মপাশা উপজেলা সাংস্কৃতিক চর্চায় পিছিয়ে। উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি দীর্ঘ বছর ধরে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। বিভিন্ন সময় এটি সংস্কার করা হলেও সংশ্লিষ্টদের গাফিলতি, সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও এর কার্যক্রম বন্ধ থাকায় কিছু মানুষ মলমূত্র ত্যাগের অন্যতম জায়গা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ফলে এটি পরিত্যক্ত ও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে উঠেছে। তাই দ্রুত এর সংস্কার করে সংস্কৃতি কর্মীদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়ার জন্য জোর দাবি জানান তিনি।
ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) ইয়াছিন কবির জানান, তিনি এখানে আসার পর জেনেছেন ২০১৪ সালে উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির একটি কমিটি হয়েছিল এবং এর কার্যক্রম বন্ধ আছে। ওই কমিটির সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা করে উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি চালুর ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
জেলা উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম জানান, সুনামগঞ্জ জেলা লোক সংস্কৃতি চর্চার উর্বর ভূমি। জেলা প্রশাসক একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি (জেলা প্রশাসক) যেখানে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনকে অনুপ্রেরণা দেন এবং উদ্বুদ্ধ করেন সেখানে ধর্মপাশা উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি জরাজীর্ণ থাকার বিষয়টি হতাশাজনক। সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চা ব্যাহত হলে সমাজ এগিয়ে যাবে না, বাধাগ্রস্থ হবে বারবার। দ্রুত ধর্মপাশা উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি চালু করতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি জোর দাবি জানান তিনি।
এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে দেখবেন বলে জানান সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম।