- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

ধানের আড়ৎ এ ঝুলছে তালা

এনামুল হক এনি, ধর্মপাশা
গভীর পানির ধান আর ঘি’য়ের উপর নির্ভর করেই গড়ে ওঠেছিল ধর্মপাশার মধ্যনগর বাজার। এখন আর ঘিয়ের আড়ৎ নেই এখানে। কিন্তু আছে ধানের আড়ত। হাওরাঞ্চলের প্রাচীন বাজারগুলোর মধ্যে সাচনা, আজমিরিগঞ্জ, দিরাই, মারকুলী, ভৈরব, বাদাঘাটের পাশাপাশি মধ্যনগর বাজার ধানের জন্য বিখ্যাত। এখানে  অর্ধশতাধিক ধানের আড়ৎ রয়েছে।
প্রতি বছর বৈশাখে হাওরগুলোতে ধানা কাটা শুরু হলে মধ্যনগর বাজারের আড়ৎগুলোতে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। স্থানীয় ধান ব্যবসায়ীরা আড়ৎগুলোতে বইয়াখাউরী, টেপী, গচি, রাতা, বাঁশমতি, কালিজিরা, লাল ধান, ছুরাইক্কা, বোরোসহ দেশীয় জাতের ধান সংগ্রহ করে মজুদ করেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ধান সংগ্রহের জন্য সুমেশ্বরী নদীতে সারিবদ্ধভাবে বড় বড় নৌকা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। আনন্দের সাথে আড়ৎ থেকে ধান তোলা হয় নৌকায় এবং ধানের চালান নিয়ে যাওয়া হয় দেশের বিভিন্ন চাতালে।
এখান থেকে চালান হওয়া বিপুল পরিমাণ ধান দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসলেও এবারের চিত্র ভিন্ন। হাওরের প্রায় শতভাগ ধান পানিতে তলিয়ে গেছে এবার। তাই কৃষকেরা আড়ৎ এ ধান তুলবে তো দূরের কথা বছরের খোরাকিই তুলতে পারেনি। ফলে সুমেশ্বরী নদীর পাড় এখন শূন্য। বড় বড় নৌকার ভিড় নেই এখানে।          আড়তে আড়তে ঝুলছে তালা। মৌসুমের শুরুতেই ফড়িয়াদের মাধ্যমে ধান সংগ্রহের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছেন তাঁরা। এবার আড়ৎ এ এক তোলা ধানও উঠবে না। বিনিয়োগকৃত অর্থ ওঠে আসবে কি না তাও বলা যাচ্ছে না। ফলে আড়ৎদারেরা এখন দিশেহারা। আড়ৎগুলোর সাথে কৃষক, শ্রমিকসহ হাজার হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। ফসলহানির ফলে পুরো হাওরাঞ্চলে খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে। ধনী-গরিব সবাই এখন সমান। কৃষকেরা যেমন ফসল হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন তেমনি আড়ৎ মালিকেরাও পড়েছেন বিপাকে। পরিবার পরিজন নিয়ে এক অজানা সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন সবাই।   
যদি হাওরবাসী ঠিকমত ফসল ঘরে তুলতে পারতো তাহলে মধ্যনগর বাজারে এই সময়ে প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার মণ ধান বেচাকেনা হতো জানিয়ে মধ্যনগর ধান-চাল আড়ৎদার সমিতির সভাপতি জ্যোতির্ময় রায় বলেন, ‘মধ্যনগর থেকে মুন্সিগঞ্জ, চাঁদপুর, ভৈরবসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের চাতাল মালিকেরা ধান সংগ্রহ করেন। কিন্তু এবার এখানে কেউ আসবে না। বিষয়টি স্থানীয় অর্থনীতি থেকে শুরু করে জাতীয় অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব ফেলবে। আমি স্থানীয়ভাবে ধান সংগ্রহের জন্য ফড়িয়াদের মাধ্যমে ১০/১২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছি। ফড়িয়ারা স্থানীয় কৃষকদেরকে সেই টাকা দিয়ে দিয়েছে। কৃষকেরা সেই টাকা কৃষি কাজে ব্যবহারও করে ফেলেছে। ফলে সেই টাকা এখন আর ওঠে আসার সম্ভাবনা নেই।’ খুব হতাশা প্রকাশ করে এই আড়ৎ মালিক বলেন, ‘ব্যবসার জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলাম। এখন সেই ঋণের টাকা পরিশোধ করাও বেশ কষ্টসাধ্য। আমরা নিঃস্ব হয়ে গেছি।’
এই মৌসুমে আড়ৎগুলোতে কাজ করেন স্থানীয় কয়েক হাজার শ্রমিক। কাজ শুরু হওয়ার আগেই চুক্তি অনুযায়ী আড়ৎ মালিকদের কাছ থেকে অগ্রীম টাকা নিয়ে থাকেন তাঁরা। এবার আড়তে কোনো কাজ নেই। যেখানে সংসার চালানোই দায় সেখানে আড়ৎ মালিকদের টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়টি আকাশ-কুসুম চিন্তা ছাড়া কিছুই নয়। নতুন কাজের সন্ধানে এলাকা ছেড়েছেন অনেক শ্রমিক। শ্রমিকদের সাথে সাথে তাদের ছেলে মেয়েরাও এলাকা ছাড়ার ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী সংকট দেখা দিচ্ছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রথম সাময়িক পরীক্ষা শুরু হলেও ৩৩ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে সাড়ে তিন হাজার শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেনি।
আব্দুল জলিলের বাড়ি মধ্যনগরের তেলিপাড়া গ্রামে। তিনি এখানকার শ্রমিকদের সভাপতি। তাঁর পরিবারের সদস্য সংখ্যা পাঁচজন। তিনি বলেন, ‘আমরার কি অইবো আল্লাই জানে! এইবার আড়দে (আড়ৎ) কাম (কাজ) করার সুযোগ নাই। আমার সাথে যারা কাম করতো হেরার (তারা) মাইধ্যে অনেকেই এলাকা ছাইড়া গেছেগা। সব গোছাইয়া উঠতা হারলে (পারলে) আমিও যাইয়ামগা।’
মধ্যনগর বাজার বণিক সমিতির সদস্য আলাউদ্দিন বলেন, ‘ধানের উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠা মধ্যনগর বাজার অর্থনীতির এক ছোট্ট অংশ হলেও ধরে রেখেছে আমাদের হাওরের দেশীয় ধান। তবে এবারের ফসলহানির ফলে দেশীয় ধান সংরক্ষণের বিষয়টিও হুমকির মুখে। মধ্যনগরসহ পুরো হাওরাঞ্চলে এখন ধনী গরিব সবাই সমান।’
গত ১৫ বছর ধরে মধ্যনগর থেকে ধান সংগ্রহ করছেন চাঁদপুর সদরের চাতাল ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক রিপন। তিনি বলেন, ‘হাওরাঞ্চলে এবার ফসল তলিয়ে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতি আমার ব্যবসায় প্রভাব ফেলেছে। দেশের অন্য জায়গা থেকে ধান কিনতে হবে এবার। তবে সে ক্ষেত্রে পরিবহন খরচ বেশি পড়বে। নৌপথে পরিবহন খরচ কম। মধ্যনগর থেকে নৌপথে ধান সংগ্রহ করতে পরিবহন খরচ কম পড়ত। দেশের আর কোনো বাজার থেকে এত বিপুল ধানের চালান হয় কিনা সন্দেহ আছে।’

  • [১]