- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

ধান ও চালের দামে অসামঞ্জস্য/ বাজার ব্যবস্থার সামগ্রিক পরিবর্তনের মাঝেই সমাধান নিহিত

ভরা আমন মৌসুমে বাজারে চালের দাম কমার তেমন কোনো লক্ষণ নেই। উপরন্তু আমন মৌসুমে যে দামে কৃষকরা নতুন ধান বিক্রি করছেন চালের বাজারদর তার সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সুনামগঞ্জের প্রেক্ষিতে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে এরকম একটি খবর গতকাল প্রকশিত হয়েছে। ধানের দাম এখন মাঠ পর্যায়ে এক হাজার থেকে ১ হাজার ১ শ’ টাকা। প্রতি দেড় মণ ধানে এক মণ চাল হয়। ধানের ক্রয়মূল্য হিসাবে এক মণ চালের দাম হয় ১ হাজার ৬ শত পঞ্চাশ টাকা। চাল তৈরির খরচ, পরিবহণ. মধ্যসত্ত্বভোগীসহ খুচরা ব্যবসায়ীদের মুনাফা যুক্তিসঙ্গতভাবে যোগ করলে প্রতি কেজি চাল ভোক্তা পর্যায়ে ৫০ টাকার বেশি থাকার কথা নয়। কিন্তু বাজারে কোনো চালই ৫৫ টাকার কম বিক্রি হতে দেখা যায় না। চালের মতো একটি অপরিহার্য ও বহুল বিক্রিত খাদ্যপণ্যে লাগামছাড়া মুনাফা করার অবকাশ নেই। তবুও ধান ও চালের দামের মধ্যে একটি বড় ফারাক সবসময়ই লক্ষ্য করা যায়। অর্থাৎ ধান থেকে চাল তৈরি হয়ে ভোক্তাপর্যায়ে আসার পর যে দাম হয় তার একটি বড় অংশ ব্যবসায়ীদের পকেটে মুনাফারূপে ঢুকে পড়ে। দেশের খাদ্যমূল্য নিয়ে এমন অবস্থা গ্রহণযোগ্য নয়। খাদ্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য দেশে বহু প্রতিষ্ঠান ও আইন-বিধি রয়েছে। বাস্তবে এগুলোর প্রয়োগ খুব কম দেখা যায়। বরঞ্চ চালের বাজার সর্বদাই কিছু বড় ব্যবসায়ী যারা মিল মালিক, আমদানিকারক, আড়ৎদার প্রভৃতি নামে পরিচিত; তারাই নিয়ন্ত্রণ করেন। এসব বিষয় নিয়ে সংবাদপত্রে নিয়মিতই আলোচনার ঝড় উঠে কিন্তু কার্যত এই ঝড় বাজার নিয়ন্ত্রণে কোনো ধরনের ভূমিকা রাখে না।
আমাদের কৃষিজ উৎপাদন ব্যবস্থায় উৎপাদনকারী কৃষকদের অধিকাংশ সময়েই ন্যায্যমূল্য পেতে দেখা যায় না। সেটি ধান হোক, সবজি হোক বা অন্যকিছু। উৎপাদনকারীরা যে দামে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করেন ভোক্তা পর্যায়ে সেটি কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি হয়। এখন মুক্তবাজারের যুগ। মুক্তবাজারের দোহাই দিয়ে সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে তেমন কার্যকর ভূমিকা রাখা থেকে বিরত থাকেন। সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে বিভিন্ন দ্রব্যের যে উর্দ্ধগতি চলছে তাতে কতটা যৌক্তিক আর কতটা অযৌক্তিক দাম বাড়ানো হয়েছে তা তদারক করার সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্তবাজার অর্থনীতির গণবিমুখ ভূমিকা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। ভোগ্যপণ্যের বাজারে মুক্তবাজারের স্বেচ্ছাচারিতা গ্রহণযোগ্য কিনা সে নিয়ে দেশে তেমন করে আলোচনাও নেই। এই ধরনের আলোচনার অনুপস্থিতিতে দাম বাড়া নিয়ে মাঝে মধ্যে কিছু হায় হুতাশ করা গেলেও কাজের কাজ কিছুই হয় না। তাই সর্বাগ্রে সরকারকে অতিপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের বাজারজাতকরণ নীতিমালা নিয়ে নতুন করে চিন্তা করতে হবে। নতুবা উৎপাদনকারীর কম দাম প্রাপ্তি আর ভোক্তাদের অতিরিক্ত দামে কেনার অসহনীয় অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো সহজ পথ নেই। দেশের অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিক ও নীতিনির্ধারকরা কবে সাধারণ মানুষের উপযোগী বাজার ব্যবস্থা প্রচলনের চিন্তা শুরু করবেন আমরা জানি না। তবে এই চিন্তা শুরু করতে যত দেরি করা হবে তত দুর্ভোগ বাড়বে উৎপাদক ও ভোক্তাদের এ কথা বলা যায় নির্দ্ধিধায়।
ধান ও চালের দামের মধ্যে যে অসামঞ্জস্যতা বিরাজমান তাও প্রচলিত বাজার ব্যবস্থারই তৈরি। বিচ্ছিন্নভাবে শুধু ধান ও চাল নিয়ে আলোচনার মাঝে এ সমস্যার সমাধান নেই। সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে এবং সমাধানের সামগ্রিক রূপটিই সামনে আনতে হবে। এর আগে সাময়িক ব্যবস্থা হিসাবে বাজার নিয়ন্ত্রণের যেসব আইন ও নিয়ম রয়েছে সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগ ঘটানো গেলেও সাময়িক কিছুটা সুফল পাওয়া যেতে পারে।

  • [১]