হাওরের বিকল্প কর্মসংস্থান বিষয়ে বেশ জোরেশোরেই আলোচনা চলছে। সনাতনী কৃষি আর মাছ চাষ দিয়ে হাওরবাসীর জীবন আর চলছে না। ধানের দর পতনের নতুন অভিঘাতে ধান চাষাবাদের বিষয়টি চরম হুমকির সামনে পড়েছে। ধানের দর পতনের বিষয়টিকে হালকা করে দেখার উপায় নেই। বিশ্বব্যাপী শোষণবাদী অর্থনীতির যে রাজত্ব তারই অংশ এই দরপতন। ধান চাষের উপর আমাদের নিজেদের সক্ষমতা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। এখন দেশি জাতের বীজ নেই। বীজের জন্য কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তারা যে বীজ ছাড়ে তা থেকে বীজের পুনরুৎপাদন হয় না। অর্থাৎ বছর বছর তার থেকেই বীজ কিনতে হবে। এছাড়া সার, কীটনাশক, সেচ সবকিছুই কর্পোরেট দখলদারিত্বের শিকার। গত কয়েক বছর ধরে নতুন উপদ্রব হয়ে এসেছে ধানের দরপতন। এতকিছু সামাল দেয়ার ক্ষমতা নেই আমাদের কৃষক সমাজের। বছর বছর কৃষি খাত থেকে সরে পড়া কৃষকের সংখ্যা বাড়ছে। জমির মালিক কৃষকরা এখন নিজেরা ধান চাষের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। গণমাধ্যমের সংবাদ থেকে জানা যায়, এই বছর জমির মালিকরা রঙজমা বা বর্গা দিতে উপযুক্ত মূল্য পাচ্ছেন না। এই অবস্থা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও উৎপাদনের মেরুদ- কৃষি খাতের জন্য অশনিসংকেত। এভাবে কৃষকরা যখন কৃষি খাত থেকে সম্পূর্ণরূপে মুখ ফিরিয়ে নিবে তখন এই জমিই আবার চলে যাবে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে। এতে কৃষির উপর কর্পোরেট অর্থনীতির নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা পাবে। আর তখন আকর্ষণীয় প্যাকেটের ভিতর ঢুকিয়ে সুন্দর সুন্দর নাম দিয়ে সেই চাল বিক্রি করা হবে উচ্চমূল্যে। কৃষির উপর কৃষকের এই অধিকার খর্ব করার যে আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে এখনই একে মোকাবিলা করা সম্ভব না হলে জাতীয় বিপর্যয় ঘনিয়ে আসার খুব বেশি দেরি নেই। এখন আসা যাক মাছের বিষয়ে। নদী নালা খাল বিল পরিবেষ্টিত বাংলাদেশ হল মাছ চাষের উপযুক্ত অঞ্চল। একটুখানি যতœ নিলে এই দেশের মাছ কখনও শেষ হওয়ার নয়। মিঠা পানির সুস্বাদু মাছের জন্য মানুষ এখন যেরকম হাপিত্যেশ করে তা কখনও ঘটত না। কিন্তু আমরাই আমাদের সমৃদ্ধশালী মিঠা পানির মাছের ক্ষেত্রগুলোকে ধ্বংস করে দিচ্ছি। মাছের প্রজনন করতে দিচ্ছি না, মাছকে বড় হওয়ার সুযোগ দিচ্ছি না, মাছকে ডিম ছাড়ার সুযোগ দিচ্ছি না। জলাশয় শুকিয়ে, জলাশয়ে বিষ প্রয়োগ করে, ফাঁস জাল দিয়ে একসাথে সকল মাছ আহরণ করার এক উন্মত্ত উন্মাদনায় মেতেছি আমরা। এর প্রতিফল এখন ভালভাবেই টের পাচ্ছি আমরা। দেশে বছরের বেশির ভাগ সময় মিঠা পানির মাছ পাওয়া যায় না। এখন বাংলাদেশের মাছের চাহিদার সিংহভাগ পূরণ করা হচ্ছে চাষকৃত মাছ দিয়ে। নানাভাবে এই মাছও এখন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের মুনাফার জালে আটকা পড়েছে। এরকম অবস্থায় হাওরের বিকল্প কর্মসংস্থানের আলোচনাটি বিশেষভাবে গুরুত্বের দাবি রাখে।
প্রথম ও স্পষ্ট কথা হল, ধান ও মাছ বাদ দিয়ে হাওরের বিকল্প কর্মসংস্থানের যেকোনো চিন্তা-ভাবনা হবে আত্তঘাতী। ধান ও মাছের বাইরে কর্মসংস্থান তৈরির যেকোনো চিন্তা-ভাবনা আমাদেরকে খাদ্য ও পুষ্টির সংকটের দিকে ঠেলে দিবে। জাতীয় নীতি নির্ধারকদের বিষয়টি বুঝতে হবে। আমাদের প্রতি প্রকৃতির যে আশীর্বাদ তাকে হৃদয় দিয়ে ধারণ করতে হবে। এই জলজ প্রকৃতির উদার সম্ভার মাছ ও ধানকে টিকিয়ে রেখে একে আরও কীভাবে সমৃদ্ধ করা যায় তাই হওয়া উচিত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। এবং অবশ্যই ধান ও মাছের উপর কৃষক ও জেলে সম্প্রদায়ের জন্মগত অধিকারকে টিকিয়ে রাখতে হবে। কৃষককে অকৃষক আর জেলেকে মজুর বানিয়ে দিলে বাংলাদেশের মূল স্তম্ভ দুর্বল হবে। এই দুর্বলতা রাষ্ট্রকেই সংকটের মুখে ঠেলে দিবে।