বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জ খাদ্য বিভাগ ধান-চাল ক্রয়ের সময় সীমার শেষ পর্যায়েও লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক ধানও সংগ্রহ করতে পারে নি। আতব চাল লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক পরিমানে সংগ্রহ করলেও সিদ্ধ চালের সংগ্রহের পরিমান একেবারেই কম। হাওরপাড়ের গ্রামগুলেলার কৃষক ও কৃষক সংগঠকরা বলেছেন, সুনামগঞ্জ থেকে সরকার ধান চাল সংগ্রহ করতে পারে নি। এটি হাস্যকর কথা। তারা এই বিষয়ে সরকারের নীতি নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গাফিলতিই এজন্য দায়ী মনে করেছেন। সুনামগঞ্জে সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে ধান চাল কেনা শুরু হয়েছে ২৯ এপ্রিল থেকে আর ১০ দিন পর ধান-চাল কেনার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এই ১০ দিনে আতব চাল হয়তো কিছু কেনা হবে, অন্য কোন কিছুই আর কেনা যাবে না বলে মন্তব্য সংশ্লিষ্ট একাধিক খাদ্য কর্মকর্তা-কর্মচারী’র।
সুনামগঞ্জে এবার প্রায় ১৩ লাখ টন বোরো ধান হয়েছে। সরকার ধান কিনবে ৩২ হাজার ৬৬৪ টন। চাল আতব ১৪ হাজার ২৮ এবং সিদ্ধ ১৪ হাজার ৬৮৭ টন কিনবে।
জেলায় এমন বাম্পার উৎপাদনের পরও খাদ্য বিভাগ ২৯ এপ্রিল থেকে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত ১৫ হাজার ৩৯৬ টন ধান এবং চাল সিদ্ধ ৩৫১৬ এবং আতব ৫৭০৩ টন কিনেছে।
হাওরের জেলা সুনামগঞ্জে ধান চাল কেনার এই করুণ অবস্থায় কৃষক নেতারা বলেছেন, সরকার যেভাবে, বা যে নীতিমালা মোতাবেক ধান কিনছে, ধান-চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবার কথা নয়। এছাড়া ক্রয়কেন্দ্রের দায়িত্বশীলদের প্রতিও আস্থা কম কৃষকদের, আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে, না হয় ধান কেনা সম্ভব হবে না কৃষকদের কাছ থেকে।
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশার কৃষক নেতা খায়রুল বাশার ঠাকুর খান বললেন, সুনামগঞ্জ থেকে ৩২ হাজার টন ধান ১০৪০ টাকা মনেও কেনা যায় নি। এটি হাস্যকর কথা। আসলে এটি সরকারের নীতি নির্ধারকদের ব্যর্থতা। স্থানীয় দায়িত্বে যারা ছিলেন, তাদেরও ব্যর্থতা। মৌসুমের প্রথম দিকে সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে নানা অজুহাতে কৃষকদের ধান কেনা হয় নি। রাজনৈতিক ফড়িয়া, দুর্বৃত্তদের সঙ্গেও কোন কোন ক্রয় কেন্দ্রের দায়িত্বশীলদের গোঁপন যোগযোগ ছিল। দুর্বৃত্তরা কিছু কৃষকের কার্ড সংগ্রহ করেছিল। ওই কৃষকদের কাছে ধান নেই। ধান যাদের আছে, তারা ফড়িয়া নামের দুর্বৃত্তদের ধান দেয় নি। সরকারি ক্রয়কেন্দ্র না দিয়ে ধান বাড়ি থেকেই ভাল দামে বিক্রি করেছে কৃষকরা। এজন্য সরকারি ক্রয়কেন্দ্রের দায়িত্বশীলরা ধান কিনতে পারে নি।
দিরাইয়ের রাজানগরের বড় কৃষক সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুস ছাত্তার বলেন, দলের দুর্বৃত্তরা যাদের জমি-জমা নেই তাদের কৃষি কার্ড করিয়ে দিয়েছি। এই কার্ডগুলো ধান বিক্রির মৌসুমে তারা নিয়ে নেয়। কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে ধান কিনে এসব কার্ড দেখিয়ে গোদামে ধান বিক্রি করে তারা। এবার ওই ফড়িয়াদের কাছে কৃষকরা ধান বিক্রি করে নি। বড় বড় ট্রলার নিয়ে গ্রামের ঘাটে অর্থাৎ বাড়ির ঘাটে এসে সাড়ে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা মণ দরে ধান কিনে নিয়েছে ভৈরব, আশুগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার আড়ৎদাররা। আমাকে দলের এক নেতা বলেছিলেন, কয়েক টন ধান দিয়ে দিতে, আমি বলেছি আমি এভাবে ধান দেব না। নিয়ম মোতাবেক কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনতে হবে।
জেলা সিপিবি’র সভাপতি চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, মৌসুমের শুরুতেই কৃষকদের খলা থেকে ধান কিনতে হবে। কৃষক সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী পানি হলে ট্রলার চললে ধান গোদামে পৌঁছে দেবে এমন চুক্তিও করা যেতে পারে। তাহলে ধান কেনা সহজ হবে, কৃষকরা ধানের ন্যায্য দামও পাবে। ফড়িয়াদেও ঠকানোর পথ বন্ধ হয়ে যাবে।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. জাকারিয়া মোস্তফা বললেন, ১৮ আগস্ট পর্যন্ত জেলায় ১৫ হাজার ৩৯৬ টন ধান কেনা হয়েছে। ২৯২ টি আতব মিলকে ১৪ হাজার ২৮ টন আতব চাল সরবরাহের জন্য চুক্তি করা হয়েছিল। তারা ৫ হাজার ৭০৩ টন চাল সরবরাহ করেছেন। আমরা আশা করছি বাকী ১০ দিনে আরও আতব চাল সংগ্রহ হবে। ৮ টি মিলকে ১৪ হাজার ৬৮৭ টন সিদ্ধ চাল সরবরাহের জন্য চুক্তি করা হয়েছিল, তারা ৩ হাজার ৫১৬ টন চাল দিয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী বাকী চাল কেন তারা দিচ্ছে না, এজন্য ৫ টি মিলকে কারণ দর্শানোর চিঠি দেওয়া হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী চাল সরবরাহ না করলে বিধি অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি ক্রয়কেন্দ্র ও বাজারে ধানের দাম প্রায় সমান সমান। বাড়িতে বসে বিক্রি করলে বরঞ্চ পরিবহন খরচ কম লাগবে। এজন্য মানুষ এবার সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে ধান দিতে আসছে না। ধান কিনতে কোন অনিয়ম বা হয়রানি কাউকে করা হয় নি বলে দাবি করেন তিনি।