- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

ধারদেনায় ধুঁকছে খেটে খাওয়া মানুষ

বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
জামালগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক চিত্ত রঞ্জন দাস। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ৪-৫ জনের পরিবার চালাতে বেগ পেতে হচ্ছে তাকে। মাস শেষে যে বেতন পান, তা দিয়ে কোনরকম পরিবার চালাতে পারলেও আয়ের কোন সুযোগ নেই। হঠাৎ করে যদি অসুখ-বিসুখ কিংবা অন্য কোন সমস্যায় পড়েন তাহলে ঋণ করা ছাড়া কোন উপায় নেই তার।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ সবকিছুর দাম ক্রয়-ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ার অস্বস্তি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘খাওয়া-খাদ্যের খরচ বাদে বাসা ভাড়া, গ্যাস-কারেন্ট বিল ও বাসার ছোটখাটো অন্যসব খরচায় বেতনের প্রায় অর্ধেকের বেশি চলে যায়। বাকি টাকায় চাল-ডাল, মাছ-সব্জি ও আনুষাঙ্গিক খরচাপাতি চালানো অনেকটা কঠিন হয়ে পড়ে। জিনিসপত্রের দাম যে হারে বাড়ছে, সে হারে তো বেতন বাড়ছে না। পরিবার নিয়ে খেয়েপড়ে বেঁচে থাকাটাই এখন চ্যালেঞ্জের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
শেরমস্তপুর গ্রামের মোটরসাইকেল চালক জুয়েল আখঞ্জি ও সাদ্দাম আখঞ্জি বলেন, দৈনিক ৫০০ টাকার রোজগারের বিপরীতে চাল, ডাল আর তেল কিনতেই সব শেষ হয়ে যায়। এরপর মাছ-মাংস কেনার ইচ্ছা থাকলেও আর কেনা হয় না। এভাবে ৪-৫ জনের একটি পরিবার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। এর মাঝে ওষুধ-পথ্য লাগলে ঋণ করা ছাড়া উপায় নেই।
প্রতিটি পরিবারেরই প্রায় একই রকম অবস্থা। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার চড়া হওয়ায় সর্বস্তরের মানুষের মাঝে চরম অস্বস্তি কাজ করছে। এতে মারাত্বক বেকায়দায় পড়ছেন খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত ও নি¤œ মধ্যবিত্তরা। প্রতিদিনকার আয়ের সাথে ব্যয়ের বিশাল ফারাক থাকায় নাকানি-চুবানি অবস্থা সাধারণ মানুষের।
শুক্রবার সুনামগঞ্জের নদী বন্দর খ্যাত সাচনা বাজারের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের খুচরা বাজার ঘুরে জানা যায়, মোটা চাল (সিদ্ধ) প্রতি কেজি ৪৫ টাকা, আতব চাল ৫৫ টাকা, মোটা মসুর ডাল ১১০ টাকা, ছোট মসুর ডাল ১৫০ টাকা, ভোটের ডাল ৭০ টাকা, চিনি ১১৫ টাকা, ছোলা ৯০ টাকা, লবণ (প্যাকেট) ৪৫ টাকা, মোটা লবণ ২৫ টাকা কেজি, সয়াবিন তেল (রূপচাঁদা) প্রতি লিটার ১৯০ টাকা, সয়াবিন (কোয়ালিটি) ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া হাঁস ও মুরগীর ডিম প্রতি হালি ৫০ টাকা এবং ব্রয়লার মুরগী ১৮০ টাকা ও লাল মুরগী (কক) বিক্রি হচ্ছে ৪০০ টাকা কেজিতে। অপরদিকে, কাঁচা বাজারে প্রতি কেজি বেগুন ৪০ টাকা, শসা ৩০ টাকা, মরিচ ৬০ টাকা, গাঁজর ৮০ টাকা এবং প্রতি হালি লেবু ৪০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
বাজারের দরদামে অদ্ভূত পরিস্থিতি বিরাজ করায় সঞ্চয়ের বদলে জমানো টাকায় টান পড়েছে অনেকের। পাশাপাশি খরচ সামলাতে ধারদেনা করতে বাধ্য হচ্ছেন নি¤œ আয়ের মানুষেরা। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজারে এমনটা চলতে থাকলে অর্ধাহার ও অনাহারে থাকার কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে বলে জানিয়েছেন কেউ কেউ।
সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, দৈনিক ৩ থেকে ৪০০ টাকা রোজগারের বিপরীতে চাল, ডাল ও সব্জি কিনতেই পকেট ফাঁকা হচ্ছে একজন দিনমজুরের। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যেখানে ৩ থেকে ৪০০ টাকা রোজগার করছেন, সেখানে মাছ-সব্জির দরদামের খপ্পরে পড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যকিছু না কিনেই বাড়ি ফিরতে হচ্ছে তাকে। কোন সরকারি চাকুরিজীবী তার প্রাপ্ত বেতনের সাথে দৈনন্দিন খরচের হিসাব মেলাতে প্রতিনিয়তই হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন। এর মাঝে যার পরিবারের সদস্য সংখ্যা একটু বেশি তার অনেকটা লেজে গোবরে অবস্থা হচ্ছে। নিত্যপণ্যের বাজার অস্বাভাবিক হওয়ায় দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে সাধারণ মানুষের। দিনের পর দিন নিত্যপণ্যের দরদাম এভাবে লাগামহীন গতিতে বাড়তে থাকলে খেয়ে না খেয়ে দিনাতিপাত করতে হবে অনেককে। এ অবস্থায় বাজার দর ক্রয়-ক্ষমতার মধ্যে রাখার আরজি জানাচ্ছেন খেটে খাওয়া মানুষেরা।
সাচনা বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আকবর হোসেন জানান, রোজার প্রায় তেরো-চৌদ্দ দিন চলে গেলেও এখন পর্যন্ত গরু কিংবা মুরগীর মাংস ঘরে নিতে পারেননি তিনি। কারণ প্রতিদিনের রুজি যেখানে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা সেখানে ৮০০ টাকা কেজির গরুর মাংস কিভাবে নেবেন। দেশীয় প্রজাতির ভালো মাছের বিপরীতে ১৭০ টাকার পাঙ্গাস নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাকে। মাছ-মাংস দূরের কথা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতেই টাকা ফুরিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন এই ব্যবসায়ী।
সব্জি বিক্রেতা অরুণ দাস জানিয়েছেন, এখন সব্জি উৎপাদন কম, চাহিদা বেশি। রমজানের কারণে সব্জি বাজারে একটু বাড়তি দর। তারপরও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজারের তুলনায় সব্জি বাজার অনেকটা স্থিতিশীলই আছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এ ব্যাপারে সাচনা বাজার বনিক কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক আসাদ আল আজাদ বলেন, হ্যাঁ, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি মানুষকে একেবারে নাজেহাল করে তুলছে। বিশেষ করে রমজান মাসে এসেও বাজার দর ঊর্ধ্বমুখী। এতে সাধারণ মানুষ চরম কষ্টে আছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্বাভাবিক না হলে মানুষের দুঃখ-কষ্ট আরও বাড়বে। এদিকে দ্রুত নজর দিতে হবে।

  • [১]