- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

ধোপাজান মহালে এখনও কারা চাঁদাবাজি করছে?

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জ সদর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সীমান্তে সবচেয়ে বড় বালু পাথর মহাল ধোপাজানে এখনও টোল আদায়ের নামে লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজি করছে কারা? সাবেক ইজরাদার সংশ্লিষ্টদের দাবি তারা টোল ট্যাক্স অফিসই বন্ধ করে দিয়েছে। তাদের পক্ষে কেউ ইজারা আদায় করছে না। জেলা প্রশাসনের দায়িত্বশীলরা বলেছেন, ওখানে কোন ইজারাদার নেই। কেউ টোল ট্যাক্স্রের নামে টাকা আদায় করলে, এটি হবে চাঁদাবাজি। এদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেবার কথা পুলিশ প্রশাসনকে বলা হয়েছে। অথচ. একাধিক বালু পাথর ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবারও তাদের কাছ থেকে টোলট্যাক্স আদায় করা হয়েছে।
সুনামগঞ্জের বৃহৎ বালু পাথর মহালগুলোর অন্যতম ধোপাজান বালু পাথর মহাল। গত প্রায় ২০ বছর ধরে এখানে কোন সময় বৈধ কাগজপত্রে টোল আদায় হয়েছে, আবার কখনো অন্যায় বা অবৈধভাবে টোল আদায়ের নামে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার চাঁদাবাজি হয়েছে। সর্বশেষ খণিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে ১৪২৩-২৪ বা ২০১৬-১৭ অর্থ বছরের জন্য ১৮২ হেক্টর বালু মহাল এলাকা ইজারা দেওয়া হয়। খণিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ৬ ইজারাদার আতর আলী, ফারুক আহমদ লিলু, আলাউর রহমান, শংকর চন্দ্র দাস, আজাদ মিয়া ও আরশাদ আলীর নামে এই ইজারা দেওয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী প্রত্যেক লাইসেন্সধারীর নামে ৩০ হেক্টর ইজারা হয়।
২০১৮-১৯ অর্থবছরে খণিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে এই মহাল ইজারা হয় নি। আগের বছরের একজন ইজারাদার আজাদ মিয়া উচ্চ আদালতে রীট দায়ের করে আবদার করেন, তিনি এই মহাল ইজারা নিয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পরের বছর ২০১৭-১৮ সালে উচ্চ আদালতের আদেশে আজাদ মিয়া ও তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও কিছু প্রভাবশালীকে সঙ্গে নিয়ে পুরো ১৮২ হেক্টর বালু-পাথর মহালই ভোগদখল করে ইজারাদার হিসাবে টোলট্যাক্স আদায় করেন।
জেলা প্রশাসনের রাজস্ব শাখার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, আজাদ মিয়ার ১৮২ হেক্টর জমিতে টোল ট্যাক্স আদায় ছিল বেআইনী। একজন লাইসেন্সধারী কোনভাবেই ৩০ হেক্টরের বেশি মহাল ইজারা নিতে পারেন না।
পরে অন্যান্য লাইসেন্সধারীদের পক্ষে উচ্চ আদালতে পাল্টা রীট দায়ের করেন শহরতলির সুরমা ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য আলাউর রহমান। একই বিষয়ে উচ্চ আদালতে রাষ্ট্রের পক্ষে নাগরিক হিসাবে রীট দায়ের করেন শহরের আরপিন নগরের বাসিন্দা জাকির হোসেন দীপু।
উচ্চ আদালত আজাদ মিয়ার পক্ষে দেওয়া পূর্বের আদেশ ২০১৯ ইংরেজি সনে খারিজ করেন। উচ্চ আদালতের এই আদেশের পর ইজারাদার আজাদ মিয়ার পক্ষের লোকজন সবকিছু গুটিয়ে মহালে টোল আদায় ২-৩ দিন বন্ধ রাখে। ক’দিন পর আবার আগের মতোই টোল ট্যাক্স আদায় শুরু করে আজাদ মিয়ার লোকজন। গত ৮ জুন পর্যন্ত তারা বহাল তবিয়তে প্রতিদিন টোল ট্যাক্স করেছে।
গত ৯ জুন বিপূল সংখ্যক পুলিশ নিয়ে সুনামগঞ্জ সদর ও বিশ^ম্ভরপুর উপজেলা প্রশাসনের একাধিক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নদীতে চাঁদাবাজি এবং বোমা মেশিনের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন।
ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় থাকা একজন কর্মকর্তা জানান, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সময় ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনকারী ৩ টি বাল্কহেডকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং অবৈধভাবে উত্তোলন করা ৪৫ হাজার টাকার বালু বিক্রি করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়। এসময় টোল ট্যাক্স আদায়কারী কাউকে না পাওয়ায় কোন ব্যবস্থা নেওয়া যায় নি বলে জানান ওই কর্মকর্তা।
এই অভিযানের পর গোঁপনে গোঁপনে নানা কায়দায় টোল ট্যাক্সের নামে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় অব্যাহত রয়। বৃহস্পতিবারও একই কায়দায় ইজারাদার সেজে টোল ট্যাক্স আদায় হয়েছে।
মহাল এলাকার ডলুরার একজন ব্যবসায়ী বললেন, নাম প্রকাশ করলে এই মহালে ব্যবসা করা কঠিন হবে। নাম না প্রকাশ করলেও হয়তো খুঁজে বের করা হবে, কে এই তথ্য দিলো। পরে ব্যবসা করতে সমস্যা হবে।
তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার আমার ১৫ হাজার ফুটের বাল্কহেড লোড দেবার পরপরই কয়েকজন এসে মালামাল অর্থাৎ বডি মাপযোগ করে। পরে শহরে গিয়ে আমার ম্যানেজার প্রতিফুটে এক টাকা পঞ্চাশ পয়সা হিসাবে টোল-ট্যাক্স দেবার পর বাল্কহেড ছাড়া হয়। এভাবে প্রত্যেক ব্যবসায়ীর কাছ থেকেই টোলট্যাক্স এখনও নেওয়া হচ্ছে বলে জানান, ওই বালু পাথর ব্যবসায়ী।
ধোপাজানের সাবেক ইজারাদার আজাদ মিয়া তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রসঙ্গে বলেন, আমি বা আমার পক্ষে এখন কেউ টোল ট্যাক্স আদায় করার প্রশ্নই ওঠে না। আমি ৮ জুন সুনামগঞ্জ সদর থানায় সাধারণ ডায়রি করেছি। সাধারণ ডায়েরিতে আমি উল্লেখ করেছি, আমার টোল ট্যাক্স আদায়ের অফিস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমার নাম ও রশিদ ব্যবহার করে কেউ টোল আদায় করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারেন। আমি অন্যায়ভাবে কোন সময়ই টোল আদায়ের প্রশ্নই ওঠে না। আমাকে আদালত ক্ষতিগ্রস্ত হিসাবে ২ বছরের জন্য টোল আদায়ের ব্যবস্থা করে দেবার জন্য আদেশ দিয়েছিলেন। সেই আদেশ অনুযায়ী দুই বছরের জন্য খণিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় ইজারা দেয়। এক বছর পর এই আদেশ আদালত আবার বাতিল করলেও আমিও রিভিউ করেছি। রিভিউয়ের আদেশে আমার এক বছরের রাজস্ব ফেরৎ দেবার কথা বলা হয়েছে।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. রাশেদ ইকবাল চৌধুরী বললেন, ধোপাজান বালু পাথর মহাল ১৪২৫ বাংলার পর আর ইজারা হয় নি। ইজরাদার হিসাবে কেউ অর্থ আদায় করলে বেআইনী হবে। ওখানে একটি পক্ষ অর্থ আদায় করছে জেনে গত ৯ জুন মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। কিন্তু ওই সময় চাঁদা আদায়কারী কাউকে মহাল এলাকায় পাওয়া যায় নি। পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতো। ওখানে কেউ ইজারাদার সেজে ট্যাক্স এখন নিয়ে থাকলে, সেটি অবৈধ হবে, অর্থাৎ চাঁদাবাজি ছাড়া আর কিছুই নয়। এদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেবার জন্য সুনামগঞ্জ ও বিশ^ম্ভরপুর থানা পুলিশকে বলে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, ধোপাজান মহাল থেকে বাল্কহেড নিয়ে বের হয়ে উজানে ও ভাটিতে সুরমা নদীতে আরও কয়েকটি স্থানে বালু-পাথরবাহী কার্গো, বাল্কহেড থেকে টাকা আদায় করা হচ্ছে।
বরিশালের বরগুণার বাল্কহেড চালক জসিম উদ্দিন বলেন, আমার নাম পরিচয় দিয়েই লিখুন, সুনামগঞ্জের মহালে যেতে যে পরিমাণে পথে পথে চাঁদা দিতে হয়, আর আমি ওখানে যাব না, আমাকে তারা পাবে না। ধোপাজানের উজান-ভাটি দুই স্থানেই নৌ-পুলিশের নামেও টাকা আদায় হয়।
সুনামগঞ্জের টুকেরঘাট নৌফাঁড়ির ইনচার্জ এস আই মো. রকিবুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, আমরা কোন টাকা আদায় করছি না। হালুয়ারঘাট থেকে আমবাড়ি পর্যন্ত আমাদের একটি টহল নৌকা সব সময় টহল দিতো। থানা পুলিশের সঙ্গে কিছু সমস্যা হওয়ায় আমরা ৩ দিন হয় ওদিকে নৌকা পাঠাচ্ছি না। টুকেরঘাটের ওখান থেকে একটি টহল নৌকা উজান দিকে চাঁদাবাজি ঠেকাতে টহল দেয়। গত বুধবারও ধোপাজানের মুখে একটি বালু বোঝাই নৌকায় চাঁদাবাজি করার সময় চাঁদাবাজদেরকে তাদের নৌকাসহ আমরা আটক করি। পরে আর কোনদিন এই কাজ করবে না বলায়, স্থানীয় লোকজনের অনুরোধে নৌকাটি ছাড়া হয়। ইব্রাহিমপুরের পাশের জগন্নাথপুর এলাকায় ঈদের আগের দিন এভাবে আরেক চাঁদাবাজ পার্টির নৌকা আটক করি। শেষে একজন সাংবাদিকের অনুরোধে নৌকাটি ছাড়া হয়।
সুনামগঞ্জ সদর থানার ওসি শহীদুর রহমান বলেন, ধোপাজান মহালসহ কিছু এলাকায় নানাভাবে এখনো টাকা আদায়ের কথা আমরাও শুনেছি। এসব ঠেকানোর জন্য পুলিশ সুপার মহোদয় কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। থানা পুলিশের সঙ্গে টাকা আদায়কারীদের কোন সম্পৃক্ততা নেই। পুলিশ গত তিন ধরে নদী ও মহাল এলাকায় টহল জোরদার করেছে। অবৈধ টাকা আদায়কারী কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

  • [১]