- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

ধ্রুব এষ : দু’বাংলার সালভাদর দালি

অদ্রীশ বিশ্বাস
বাংলা প্রচ্ছদে সুররিয়ালিজমের প্রবর্তক ধ্রুব এষ। যদিও অনেক দেরি হল এই লক্ষণ আসতে কিন্তু দেরিতে হলেও যা ঘটেছে তার মূল্য অসীম। কারণ, নামি থেকে আমজনতার প্রচ্ছদে এই ফরাসি চিত্রকলার ধর্মটা, আন্দোলনের প্রভাবটা ধরা পড়েছে। উনিই সম্ভবত দুই বাংলার সবচেয়ে বেশি প্রচ্ছদ শিল্পীর রেকর্ডের অধিকারী। একটা সাক্ষাৎকারে বলেছেন শুধু একুশে বইমেলা উপলক্ষে যে বই বের হয় বাংলাদেশে তাতে প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ প্রচ্ছদ উনি বানান। এটা আর কেউ কখনও মানসিক ও শারীরিকভাবে করতে পারেননি। এই অসম্ভব ঘটনাটা প্রত্যেক বছর তিনি ঘটান। আর তার সঙ্গে ওর কাজে একটা মান থাকে, একটা বুড়ো আঙুলের ছাপ থাকে, নিজস্বতা, আইডেনটিটি, যেটা উনি ধারাবাহিকভাবে মেনটেন করেন। তো, সেই আইডেনটিটি বা সুররিয়ালিজম ধর্মটা সমস্ত পাঠকের মধ্যে সঞ্চারিত হয়। তিনি সেই ধারাটা সম্পর্কে জানুন বা না জানুন। এর ফলে এক ধরনের শিল্প-শিক্ষায় শিক্ষিত করেন ওর  প্রচ্ছদের মধ্যে দিয়ে।     
 উনি দেখান কীভাবে একটা ফরাসি চিত্রকলা চর্চার ছবিগুলো বাংলার বইতে বাংলাদেশের হয়ে গেছে। তাই ওর ছবির প্রতি মানুষের এত ভালবাসা বা টান। এবার আমরা আলোচনা করব এঠা কীভাবে ঘটল।
সালভাদর দালির চিত্রকলা ও ফটোগ্রাফিতে টান ছিল। যাঁরা ছবির চর্চা করেন, তাঁরা জানেন কীভাবে এই মহান শিল্পী এই দুর্দান্ত সব ফটোগ্রাফির খেলায় মেতে সুররিয়ালিস্ট ফটোগ্রাফের জন্ম দিয়েছেন। অনেকে ভাবেন ফরাসি ফটোগ্রাফির মন রে সুররিয়াল ছবি তুলেছেন একমাত্র। তা নয়। অন্তত সালভাদর দালির ক্ষেত্রে নয়। তিনি এমন কিছু ছবি তুলেছেন যেমন- এক বালতি জল ছোড়া হচ্ছে, সঙ্গে উল্টোদিক থেকে একটা বেড়ালকে শূন্যে ছোড়া হচ্ছে। কিংবা একটা বেড়ালকে বাঘের মতো ডোরা কেটে তিনি মেরে দিয়েছেন বাস্তবে ওইদিন কোনও পার্টিতে গিয়ে। এই ছবিটাও দেখা যায়। আর তার নানা মুখের ভঙ্গির ফটোগ্রাফ বিখ্যাত সুররিয়াল ফটোগ্রাফ হিসাবে। এই ফটোগ্রাফ চর্চা নিয়ে অবতারণার কারণ সুররিয়ালিজমের সঙ্গে টেকনোলজির যোগ আছে। এটা শুরু হয়, তার আগের ডাডা ইমেজের মধ্যে দিয়ে। তার পর ওরাই কনভার্ট করেন সুররিয়ালিজমে। কারণ, এর আগে যখন শুধু চিত্রকলার যুগ ছিল তখন তারা ছবি এঁকেছেন। তার পর যখন ক্যামেরা এল, তখন বহুদিন দর্শনটাই ছিল ফটোগ্রাফ এত বাস্তবতাকে ধরতে পরে যে তার দরকার নেই বাস্তবধর্মী চিত্রকলার। ফলে, চিত্রকররা অন্য বাস্তবতার খোঁজে ব্যস্ত হলেন। শুরু হল আধুনিক চিত্রকলার কাল, যেখানে ফটোগ্রাফ নেই, দর্শন নেই, সে বরং ক্যামেরাকে ক্রিটিক করে নিজের ভাষ্য গড়ে তুলতে লাগল। এই বিশ্বাসটা চ্যালেঞ্জ হল ডাডাইজমে প্রথম, তারপর আরও বড় করে সুররিয়ালিজমে। ফলে সুররিয়াল ছবিতে এমন সব উপাদান থাকে যা অনেকটা বাস্তব, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরাবাস্তবতার দর্শনে রিচ করে। একটা ঘড়ি গলে পড়েছে। ঘড়িটা আঁকা একদম বাস্তবভাবে, কিন্তু সময় গলন্ত। জ্বলন্ত জিরাফ। জিরাফ আঁকা হুবহু জিরাফের মতো। কিন্তু তার অবস্থা পরাবাস্তব জ্বলে যাওয়া। এই দুটো দালির ছবির নিদর্শন। ওঁদের বন্ধু পরিচালক লুই বুনুয়েল সুররিয়াল সিনেমাও বানান। সবাই মিলে বের করতেন সুররিয়াল পত্রিকা, ম্যানিফেস্টো ছাপা হত। আর এই সব কাজের নমুনা। এখন এই টেকনোলজি কেন্দ্রিক শিল্পচর্চা, যে ধারা, তার প্রধান পুরুষ দালি, যাঁর ছবির সার্থক প্রভাব আছে ধ্রুব এষের কাজে।
ধ্রুব এষ কি তার তাঁর অসাধারণ মেধার একটা খোলা দরজার বাইরে বাংলাদেশের গাছ, নদী, মেঘ, চাঁদ, পাখি, সূর্য, ঢুকিয়ে দিচ্ছেন? এতদিন এতগুলো ব্যবহার হয়েছে বাস্তবতায় ধ্রুব যখন আঁকছেন তখন তা অসম কিছুর সঙ্গে বসে একটা আলাদা পরাবাস্তব মাত্রা এনে দিল। ফলে, ওঁর ছবি বাংলার চেনা প্রকৃতিকে ধারণ করে দর্শকপ্রিয় হল। হাওয়াতেই হবে, যদি সেটা বিদেশিই থেকে যায় তাহলে শিল্পী ব্যর্থ। ধ্রুব এষ তা নন। তিনি মস্তিষ্ক খাটিয়ে এই পরাবাস্তবতায় বাংলাদেশে বসান। এখানে বাংলাদেশ শব্দটা দুই বাংলা অর্থে, যেহেতু এই উপাদানগুলোর মধ্যে কোনও তফাৎ নেই। অনেক সময় এই বিদেশি চিহ্নটা থেকে যায়। তার দাম থাকে না। যদি বাংলাদেশের প্রচ্ছদের ইতিহাস দেখা যায়, তাহলে কিন্তু তাতে এই বিদেশি চিহ্ন বা শেকলটা ছিল। ধ্রুব এষ এসে এটা বিশাল ভাবে ভেঙে দেবে। তিনি বাংলার উপাদান ঢোকান, বাংলার রেখা তার ছবিকে অন্য মাত্রা দিল। রেখা কীভাবে? তাঁর ছোটদের বইতে আঁকা ছবিতে যে রেখা ব্যবহার হয় সেটা কোনও বিদেশি শিল্পীর নকল নয়, সেখানে এমন কি জয়নাল আবেদিনও নেই, কাইয়ুম চৌধুরীও না। এটা একদম নিজের কাজ। সেখানে, অনেক সময় তিনি সুররিয়াল নন, হয়তো তখনও কার্টুনের প্রভাব তাতে আছে কিন্তু কোনওভাবেই তার বাবা ঠাকুরদার নাম বলা যাবে না।
সেটা একটা আলাদা আলোচনা দাবি করে।  এখানে সেটা ছুঁয়ে যাওয়া হল কেবলমাত্র। আমরা যেহেতু ওঁর প্রধান লক্ষণগুলো নিয়ে আলোচনা করছি, তাই এই দালিময়তা নিয়ে আমাদের কথাবার্তা।
তিনি বাংলা বইয়ের প্রচ্ছদে আরও একটা বৈপ্লবিক ঘটনা ঘটিয়েছেন। সেটা হল, এতদিন ছিল বইয়ের যে বিষয়বস্তু সেই অনুসারে প্রচ্ছদ নির্মাণ। উনি এটা ভেঙ্গে দিয়েছেন। এটা সবচেয়ে বেশি করার সুযোগ পেয়েছেন হুমায়ুন আহমেদের বইয়ের প্রচ্ছদে। যে সুররিয়াল ছবির কথা বললাম, একটা দরজা, বাইরে ঘড়া, এরকম অসংখ্য পরাবাস্তব অনুসঙ্গের সঙ্গে উপন্যাসের কাহিনীর কোন মিল নেই। হয়তো কাহিনিটা  পাশপোর্ট করানো নিয়ে অথবা ভিখারির জীবন নিয়ে। এই যে কাহিনী বা বিষয়বস্তু তা থেকে মুক্তি এটা কিন্তু বাংলা প্রচ্ছদে প্রথম ধ্রুব এষ করেন। অর্থাৎ প্রচ্ছদ মুক্ত হল। তাতে কী হল ? তাতে প্রচ্ছদ আলাদাভাবে শিল্প হয়ে উঠতে অনেক বেশি জোর পেল। এর আগে শিল্পী তার ভাবনাকে বাঁধতেন বইয়ের কাহিনিতে। এবার ধ্রুব এসে সেটা উল্টে দিলেন। তাঁর প্রচ্ছদ স্বাধীন, বইয়ের বিষয়ও স্বাধীন। এতে তিনি প্রচুর নিজের পছন্দ মতো প্রচ্ছদ করার সুযোগ পেলেন। এই পছন্দটা প্রধানত পরাবাস্তব ছবির চর্চা। ফলে, পাঠক আগে ধ্রুব এষের প্রচ্ছদ দেখে তার মনে একটা প্রতিক্রিয়া হল, যা স্বাধীন, তার পর বইয়ে ঢুকেছেন, বইটা পরে আসছে তার ভাষ্য নিয়ে বা বয়ান নিয়ে, সেটাও স্বাধীন। এবার দুটো ভাষা মিলে একটা তৃতীয় ভাষ্য বা ‘টেক্সট’ তৈরি হল, যার অর্থ আলাদা। এমনটা এর আগে বেশি হয়নি। আর এটা ধ্রুব এষ এসে এত অজ¯্র প্রচ্ছদের মধ্যে দিয়ে এই নতুন ভাষ্য রচনার ঘটনা মুহূর্হুহূ ঘটালেন। এটা সবচেয়ে বেশি পাওয়া যাবে হুমায়ুন আহমদের বইতে। কেন এটা হল ? কারণ হুমায়ুন আহমেদের একটা ভরসার জায়গা ছিল ধ্রুব’র কাজ। আর তিনি নিজে যেহেতু একটা সময় বিদেশে থেকেছেন তাই তিনি জানেন এই সব শিল্পচর্চার ধারাগুলো সম্পর্কে। নিজে সেই জন্য মুক্তমনা হতে পেরেছেন। এটা খুব জরুরী। সঙ্গে তার লেখা উপন্যাস গুলোর কয়েক লক্ষ পাঠক। যাদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে ধ্রুব এষের কাজ। পরাবাস্তবতার ছবিগুলো, যা স্বাধীন করল বাংলা প্রচ্ছদকে। এটা একটা বড় ঘটনা। যদি হুমায়ুন আহমেদের মতো লেখক না থাকতেন, তাহলে এত জনপ্রিয় হতেন না ধ্রুব এষ। এটাই একটা মানুষ তার প্রচ্ছদ দেখেছে প্রিয় লেখকের বইতে। আর সেই বইয়ের সংখ্যাও প্রচুর। এটাও একটা বড় ব্যাপার। যদি হুমায়ুন আহমেদ অত না লিখতেন, তাহলে তাঁর অল্প বইয়ের মধ্যে দিয়ে এতটা সাফল্য পেতেন না ধ্রুব। হুমায়ুন আহমেদ নিজেই বলেছেন, আমি আমার পাঠক সংখ্যা বাড়িয়েছি। সঙ্গে একাধিক উপন্যাস বা বই একই মেলায় বের হল ধ্রুবর প্রচ্ছদসহ। এই সংখ্যা বৃদ্ধি অনেক সময় প্রচ্ছদের মান নষ্ট করে। এখানে উল্টো হয়েছে। কারণ, ধ্রুবর করা প্রচ্ছদগুলোর জন্য উপন্যাস বা গল্পগুলো পড়তে হয়নি। সেটা একটা অসম্ভব ব্যাপার, যদি একই মেলায় বছরের ছয়শো-সাতশো প্রচ্ছদ বানাচ্ছেন তিনি। ফলে এই স্বাধীনতা নেওয়াটা, না পড়ে প্রচ্ছদ বানানো ছাড়া উপায় নেই। তিনি তার ফলে আরেকটা বিপ্লব ঘটালেন বাংলা প্রচ্ছদে। কম্পিউটারে প্রচ্ছদ বা ছবি এখন সবাই করে। কিন্তু ধ্রুব এষ পরাবাস্তব ছবিগুলোকে কম্পিউটারে করলেন। এটা নতুন। যে জন্য আমরা সুররিয়ালিজমে টেকনোলজি ছিল এটা বলতে চেয়েছি। তো সেই টেকনোলজিকে সরাসরি পেইন্টিং হিসাবে ব্যবহার করলেন তিনি। যে ঘুড়ি জিরাফ, মেঘ, জানালা বাস্তবের মত এঁকেছিলেন দালি; সেই উপাদানগুলোর আর প্রায় না এঁকে ধ্রুব ওগুলোকে বাস্তব ফটোগ্রাফ থেকে নিলেন, তারপর ফটোশপে বসিয়ে এডিট করে একদম টেকনোলজি নির্ভর প্রচ্ছদ তৈরি করলেন। ফলে, পরাবাস্তবতাকে ধ্রুব টেকনোলজির মধ্যে দিয়ে আনলেন। আর এটা করার কারণ, প্রচুর পরিমাণ প্রচ্ছদ করার চাপ, বাধ্যতা ও রুটিরুজি। এছাড়া তাঁর অন্য কোন উপায় নেই। কিন্তু শিল্পী যদি মধ্য মেধার হতেন তাহলে হেরে যেতেন। ব্যর্থ হত তার কাজ, বা রিপিটেটিভ হত। যেহেতু ধ্রুব মেধাবী, ওঁর লেখা পড়লে যেটা আর এক ভাবে টের পাওয়া যায়, তাই ধ্রুব এই বিশেষ ঘটনাটায় সাফল্য পেলেন।
পরাবাস্তবতায় স্বপ্নর একটা বড় ভূমিকা আছে। ধ্রুবর ছবিতে সেই স্বপ্নময়তা আছে। যাকে অনেকে কবিতার মত ছবি বলেন। এটা ধ্রুবর ছবির ভেতরে আছে। কিন্তু কবিতা কেন্দ্রিক ছবি অনেক প্রচ্ছদশিল্পীর কাজেই থাকে। যদি সেই শিল্পী নিজে কবি হন, তাহলে তার কাজে সেই ছাপ থাকে। যেমন পূর্ণেন্দু পত্রীর নানা প্রচ্ছদ। হয়তো সত্যজিৎ রায়ের ছবিতেও এই লক্ষণ অনেক সময় দেখা যায়। তাই সেটা কোনো বৈপ্লবিক ঘটনা নয়। ধ্রুব এষ যা করেছেন, সেটা বৈপ্লবিক। পরাবাস্তবতায় কাব্যিকতা এনেছেন। ফলে ওঁর কাজ অন্যদের চেয়ে পৃথক হয়ে গেছে। ওঁর পরাবাস্তবতা ওঁকে পৃথক করেছে।
বই বিষয়টা হয়তো আগামী কুড়ি-পঁচিশ বছরের মধ্যে একটা চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে। বাংলাদেশে হুমায়ুন আহমেদের মৃত্যু একটা বড় বাজার নষ্ট করলো। হুমায়ুন আহমেদ, হুমায়ুন আহমেদ করছি বলে আমি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের পাঠক নই, তা নয়। আমার গবেষণার বিষয় ছিল জনপ্রিয় সংস্কৃতি-জনপ্রিয় সাহিত্য, তাই তার পর্যবেক্ষণটা সব সময় কাজ করে, কীভাবে জনসাধারণের চাহিদা ও রুচি পরিবর্তিত হয়, নিয়ন্ত্রিত হয় বাজার দ্বারা। অথবা ‘বাজার’ বলতে আমরা এখন বইয়ের দোকানের বাইরে আর কি কি বুঝব। যা আমাদের নিয়ন্ত্রিত করেছে। তাহলে, যদি বাংলা বইয়ের বাজারের একটা অংশ হুমায়ুন আহমেদের মৃত্যুতে শেষ হয়, তাহলে ধ্রুব এষের কাজের যে বিশাল বড় ভাবে ছড়িয়ে পড়া ও জনপ্রিয় হওয়া সেটা এখন প্রশ্নচিহ্নের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। এবার সেই বুমটা হয়ে গেছে। এখন বই যদি না থাকে, তাহলে ক্রমশ অন্য কোনও ভাবে ধ্রুবর কাজ, তাঁর বাজারকে বিকল্প রূপদানের দিকে নিয়ে যেতে হবে। কারণ, তিনি একজন শিল্পী, যিনি আর এক ভাবে ইন্ডাষ্ট্রিও। তাহলে মেধাবী এষকে ভাবতে হবে কীভাবে তিনি দুই বাংলার সালভাদর দালি হয়ে জ্বলন্ত জিরাফের ঘাড়ে চড়ে উঠতে পারেন, নতুন কোনও শিল্পী বিপ্লবের আশায়।  
লেখক: কলকাতার বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও গবেষক।

  • [১]