রণেন্দ্র তালুকদার পিংকু
দাদু যদি হন পন্ডিত রামকানাই দাশ, মামা যদি হন পিনুসেন দাশ আর মা যদি হন কাবেরী দাশ হন, তাহলে এই কন্যাটি কেমন হতে পারে তা নিশ্চয়ই অনুমান করা কঠিন নয়। বাংলা লোকসঙ্গীত, কীর্ত্তন ও উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের প্রবাদ পুরুষ রামকানাই দাশ তার এই দৌহিত্রী পারমিতা মুমুকে বাংলা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের শিখরে নিয়ে যাবেন এমন স্বপ্ন থেকেই শৈশব থেকে তাকে নিজে হাতে গান শেখাতে শুরু করেন। সারেগামা দিয়ে শুরু, তারপর বিভিন্ন রাগ, শেখালেন বাদনও এবং মামা পিনুসেন শেখালেন তবলা। পারমিতা সেই শৈশবে কোন তবলা প্রতিযোগিতায় সেকেন্ড হয়নি। ১৯৯৭ সালে আকস্মিক ছেদ পড়ল। বাবা নিরঞ্জন দাশ ও মা কাবেরী দাশ ইমিগ্রান্ট হয়ে চলে এলো আমেরিকায়। মা-বাবা থিতু হওয়ার পর কাবেরী দাশ খুললেন বাংলাদেশে তার বাবার সঙ্গীত পরিষদের শাখা নিউইয়র্কে। আবার শুরু হলো পারমিতা-মুমুর চর্চা। প্রতিদিন স্কুলের পড়াশোনা এবং গানের চর্চা, গলা সাধা সব একসাথে চলতে লাগলো। কাবেরী দাশ মেয়েকে গান শেখান। এরই মাঝে ২০০৫ সালে পন্ডিত রামকানাই দাশ চলে এলেন নিউইয়র্কে। তার আসার উদ্দেশ্য বড় মেয়ে পারমিতার গানের চর্চাকে এগিয়ে নেওয়া এবং ছোট মেয়ে শ্রুতিকণাকে হাতে খড়ি দেয়া। বাংলাদেশে থাকতে রামকানাই দাশ নিয়মিত চিঠি লিখে মুমুকে ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতের ইতিহাস শিক্ষা দিতেন। নিউইয়র্কে এসে শ্রুতিকণাকে গান শেখাতে গিয়ে চমকে উঠলেন পন্ডিত রামকানাই। তিনি বললেন,‘সারাজীবনে কতজনকে গান শিখিয়েছি কিন্তু শ্রুতির মতো এত মেধাবী এত প্রতিভাদৃপ্ত ছাত্রী পাইনি।’ ভোকাল শিখলো শ্রুতিকণা দাদুর কাছে, দাদু তাকে ভর্তি করিয়ে দিলেন ভায়োলিন শেখার জন্য নিসমাতে। নিসমা অর্থাৎ নিউইয়র্ক ষ্টেট স্কুল মিউজিক এসোসিয়েশনে। একটানা ছয়বছর কোর্স সম্পন্ন করে গ্রাজুয়েশন করলো শ্রুতি, পেল শতকরা ১০০ ভাগ নম্বর। আর পারমিতা মুমু পেল শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রবাদ প্রতীম শিল্পী পন্ডিত অজয় চক্রবর্তীর স্কুলে প্রশিক্ষণের স্কলারশিপ। নিউইয়র্ক থেকে মুমু চলে গেল কলকাতায় ২০০৯ সালে। ম্যানহ্যাটনভিত্তিক সঙ্গীত ইন্সটিটিউট ছন্দায়নের বৃত্তিতে ৬ মাস করে দুই দফায় এক বছরের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরে এলেন নিউইয়র্কে। সাথে নিয়ে এলেন সঙ্গীত বিষয়ে পরিণতিবোধ।
সঙ্গীতে পারমিতা মুমুর দুই ক্ষেত্র উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ও রবীন্দ্র সঙ্গীত। দুই ক্ষেত্রেই সে সমান পরদর্শী। নিউইয়র্কে যে কোন অনুষ্ঠানে যখন কাবেরী দাশ তার দুই মেয়েকে নিয়ে মঞ্চে বসেন, মঞ্চ আলোকিত হয়ে উঠে। আর যখন হারমোনিয়ামের রিডে চাপ দেন কাবেরী দাশ, শ্রুতিকণা ভায়োলিনের ক্রিজে
বো দিয়ে টান দেয় আর পারমিতা কন্ঠে সুর তোলেন, তখন দর্শক-শ্রোতারা পিনপতন নৈ:শব্দে প্রাণভরে ত্রিবেনী সংগমের এই যৌথ পরিবেশনা উপভোগ করেন। যে কারো জন্য এই উপভোগ বিরল বললেও মোটেও অত্যুক্তি হবে না।
পারমিতা মুমুর একটি রবীন্দ্র সঙ্গীতের সিডি ‘একদা তুমি প্রিয়ে’ প্রকাশিত হয়েছে। ২০০৯ সালে রেকর্ড করা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের একটি সিডি প্রকাশিত হবে শিগগিরই। আর এরই মধ্যে মুমু মাস্টার্স সম্পন্ন করবে স্পেশাল এডুকেশনে। এদিকে শ্রুতিকণা হাইস্কুল গ্রাজুয়েশন করে ভর্তি হয়েছে বিশ্ববিখ্যাত ওয়েলেসলি কলেজে।
পারমিতা মুমুর চারটি একক অনুষ্ঠিত হয়েছে নিউইয়র্কে। একটি অনুষ্ঠানের আয়োজক ছিল অপটিসিষ্টস। অপর অনুষ্ঠানটির আয়োজক কালচার কো-অপারেটিভ। তার সাথে সরোদ বাজান পন্ডিত রমেশ মিশ্র (পরলোকগত), তৃতীয় অনুষ্ঠানের আয়োজক ছিল ছন্দায়ন আর চতুর্থটি আয়োজিত হয় জ্যামাইকায়। শেষের দুটি অনুষ্ঠানের তবলায় সঙ্গত করেন বিখ্যাত তবলিয়া সময় সাহা।
মুমু জানে, সে যে উচ্চাঙ্গসঙ্গীত এবং রবীন্দ্র সঙ্গীত শিখেছে তার কদর হয়তো এ দেশে সে অর্থে পাবে না, সে জানে এ দেশে এ ধরনের গান গেয়ে খুব উপরে উঠা সম্ভব নয়, তবু সে প্রতিদিন গানের চর্চা করে, গান নিয়ে চিন্তা করে। মুমুর ভাষায়, আমার দাদু, আমার মা আমার হৃদয়ে গানের যে বীজ বুনে দিয়েছেন, তার থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। গান তার প্যাশন, গান তার ভালবাসা, গান তার জীবনযাপনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
সেই কমিটমেন্ট থেকে পারমিতা মুমু ইংরেজীতে ‘আরোহন-এ্যান ইনিশিয়েশন টু ইন্ডিয়ান ক্লাসিক্যাল মিউজিক পারফর্মেন্স’ নামে একটি চমৎকার বই লিখেছেন। অত্যন্ত সহজ ভাষায় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের রাগ, ঠাট, তাল নিয়ে আলোচনা করেছেন। পারমিতা মুমু জানান যুক্তরাষ্ট্রে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা যারা গান শিখতে চান, বিশেষ করে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে, তাদের জন্য থিয়োরেটিক্যাল বই হিসেবে আরোহন অত্যন্ত সহায়ক গ্রন্থ হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। পন্ডিত রামকানাই দাশের উত্তরসূরী হিসাবে কাবেরী দাশ, পিনুসেন দাশ যে দায়িত্ব পালন করেছেন বাংলা শুদ্ধসঙ্গীতকে এগিয়ে নিতে, ঠিক একইভাবে, কিংবা আরো আন্তরিকতার সাথে দুই মেয়ে তাকে সম্প্রসারিত করতে, বিস্তৃত করতে এবং ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে। বিশেষ করে আমেরিকার মতো দেশে।
প্রকৃতপক্ষে পারমিতা মুমু এবং শ্রুতিকণা দাশ দুজনই প্রবাসী বাঙালির নতুন প্রজন্মের সামনে বিশাল দৃষ্টান্ত, বিপুল সাহস হয়ে রয়েছেন। এটাই প্রবাসীদের জন্য সবচেয়ে বড় পাওয়া।
লেখক: আমেরিকা প্রবাসী লেখক ও সংবাদকর্মী।