- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

নতুন বছর সকলের জন্য শুভ হোক

হাওরপাড়ে এবারের বাংলা নববর্ষ কোনো আনন্দের বার্তা বয়ে আনতে পারেনি। নতুন বছর কেবল হিসাব-নিকাশের ব্যাপার। যাপিত জীবনে মূলত বর্ষনির্ভর হয়ে কীছুই ঘটে না। কেবল হাওরের ফসলচিত্রের প্রেক্ষাপটে ১৪২৮ বঙ্গাব্দের শেষ দুই সপ্তাহের জেরই একইভাবে প্রবেশ করেছে নতুন বছরে। হাওড়ের পাড়ে পাড়ে এখন উৎকণ্ঠিত কৃষকদের বিষন্নতায় ভরা মুখ। তাঁরা কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করছেন, যেন আর কয়েকটা দিন দুর্যোগের হাত থেকে হাওরের ফসল সুরক্ষিত থাকে। তাহলেই এই কৃষকরা গোলায় তুলতে পারবেন কষ্টে বোনা ও ফলানো বোরো ধান। হাওরের যাবতীয় হাসি কান্না, আনন্দ-বিষাদ, আশা-নিরাশা, প্রাপ্তি-বঞ্চনা; সবকিছুই বোরো ফসলকেন্দ্রিক। বোরো ধান গোলায় উঠলে সুখ নতুবা দুঃখের শেষ নেই। সদ্য শেষ হওয়া বাংলা বছরে হাওড়ের বেশ কয়েকটি ছোট-বড় হাওর তলিয়ে কিছু কৃষকের মুখের স্বস্তি কেড়ে নিয়েছে। প্রকৃতির বদান্যতায় এখনও অধিকাংশ হাওর টিকে আছে। শেষ পর্যন্ত যদি এগুলো টিকে থাকে তাহলেই কৃষকরা নতুন বছরটিকে নিজেদের জন্য শুভ ভাবতে পারবেন। এমন পরিস্থিতিতে আমরা ১৪২৮ বঙ্গাব্দ পেরিয়ে ১৪২৯ বঙ্গাব্দে পদার্পন করছি আজ। সবাইকে আমাদের পক্ষ থেকে শুভ নববর্ষ।
বাংলা নববর্ষ কখনও নাগরিক বা শহুরে সমাজের সাথে তেমনভাবে সম্পর্কিত ছিল না। সুদূর অতীত থেকে এই বাংলা বর্ষ কেবল গ্রামীণ সমাজেই আলোড়ন তৈরি করত। শহুরে উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের জীবনে বাংলা বর্ষপঞ্জির তেমন কোন ভূমিকা ছিল না কখনও, এখনও নেই। তবে সম্প্রতি শহুরে সমাজে বাংলা নববর্ষের কদর বেড়েছে। বিশেষ করে সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের অন্যতম এক অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই বাংলা নববর্ষ। বাঙালি জাতি মাত্রই উৎসবপ্রিয় জাতি। যেকোনো উপলক্ষকে রাঙিয়ে দিয়ে সাড়ম্বরে উদযাপনে বাঙালির জুরি মেলা ভার। পাকিস্তান নামক অদ্ভুত রাষ্ট্র তৈরির পর বাঙালি জাতিসত্ত¦াকে চরমভাবে অস্বীকারের মধ্য দিয়ে একটি ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের আমদানি করা হয় সুপরিকল্পিতভাবে। এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় বৃহত্তর বাঙালি সমাজ। রুখে দেয়ার অস্ত্র ছিলো ঐতিহ্যম-িত বহু বর্ণিল বাঙালি সংস্কৃতি। বাংলায় ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরে উৎসব-অনুষ্ঠানের অভাব নেই। বিভিন্ন ঋতুকেন্দ্রিক উৎসব থেকে শুরু করে নববর্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত এই উৎসবগুলোই হয়ে উঠে বাঙালি জাতিসত্ত্বা রক্ষার হাতিয়ার। ফলে এইসব অসাম্প্রদায়িক জাতীয় উৎসবগুলো হয়ে উঠে আমাদের প্রাণবায়ু। সেই নির্মল বায়ুতে অবগাহন করতেই বাঙালি, শহুরে-গ্রামীণ নির্বিশেষে, সকলেই বাংলা নববর্ষকে প্রাণের অনুষ্ঠানে পরিণত করেন। বাঙালির নববর্ষের বৈশাখি শোভাযাত্রা হয়ে উঠে আন্তর্জাতিক ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু ইদানীং আবার বাঙালি সংস্কৃতির উপর কালো শকুনের দৃষ্টি পড়েছে। বিশেষ করে রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলার পর থেকে এই উৎসবকে ঘিরে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা শুরু হয়। মৌলবাদীরা মাঝে-মধ্যেই হুঙ্কার ছাড়ে, তাদের বিবেচনায় অগ্রহণযোগ্য বাঙালির সার্বজনীন উৎসব আয়োজনের বিরুদ্ধে। এর লক্ষণ দেখি আমরা এবারও। বর্ষবরণের আয়োজনকে নানা শর্তের আওতায় এনে কেটে ছেটে একেবারে বামন করে ফেলা হয়েছে। নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে কোনো সংস্কৃতিকেই আটকে রাখা যায় না। সাময়িক বাধাগ্রস্ত করা যায় কিন্তু চিরদিনের জন্য নির্মূল করে ফেলা সম্ভব নয়। সংস্কৃতি তার আপন জীবনশক্তি দিয়েই রক্ষা পায়। তাই যত নিয়ন্ত্রণই আরোপ করা হোক না কেন বর্ষবরণের যে প্রাণের আবেগ সেখানে কোনো নিয়ন্ত্রণ বা বাধাই শেষ পর্যন্ত কাজে আসবে না।
আমাদের কৃষক থেকে শুরু করে প্রান্তিক পর্যায়ের লোকজন নিজস্ব প্রয়োজনেই বাংলা বছরকে লালন করেন। বাংলা নববর্ষ তাদের জীবনাচরণের অলঙ্ঘনীয় অংশ। এই মানুষরা জাতীয় সংস্কৃতির মূল চালিকাশক্তি। এদের মাধ্যমে টিকে থাকবে হাজার বছরের সমৃদ্ধ বাঙালির অবিনাশী চেতনা।
নতুন বছর সকলের জন্য শুভ হোক।

  • [১]