নদীমাতৃক বাংলাদেশে মাঝে মধ্যে নদীই বিপত্তি বাধায়। খামখেয়ালী আচরণের জন্য নদীর খ্যাতি বিশেষ ভাবে খ্যাত। নদী শৃঙ্খলহীন বাধাহীনভাবে চলতে ভালবাসে। তাই মাতৃস্বরূপা নদী আজলা ভরে জনপদকে সুজলা সুফলা ও পলিসমৃদ্ধ করে তুলে যেমন, তেমনি এই নদীই কখনও সখনও দু’কুল চাপিয়ে প্লাবনে ভাসায় ফসলি মাঠ, পাড় ভেঙে ধ্বংস করে জনপদ, হাটবাজার, স্থাপনা। নদীর এই সর্বনাশা রূপটি মায়ের চণ্ডাল রূপের শামিল। পদ্মা-যমুনা পাড়ের বাসিন্দারা নদীর এই চণ্ডাল রূপের সাথে ভালভাবে পরিচিত। অল্পস্বল্প হলেও সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা নদীর এই সর্বনাশা স্বভাবের সাথে পরিচিত। সুরমা, কুশিয়ারার ভাঙনে জগন্নাথপুর, দিরাই, জামালগঞ্জ, সদর ও দোয়ারাবাজারের বিভিন্ন জায়গায় নদী ভাঙনের দেখা মিলে। জেলার প্রসিদ্ধ বাজার রানীগঞ্জ ও আকিলশাহ বাজার আজ নিজ অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। জেলার আরেক বিখ্যাত বাজার সাচনাবাজার সুরমার আঘাতে খণ্ডিত আকার ধারণ করেছে। জেলা সদরের লঞ্চঘাট, দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিষদের সন্মুখভাগ সুরমার ভাঙনে নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে। আরও বহু জায়গা সর্বনাশা নদী ভাঙন কবলিত হয়ে মানুষের দীর্ঘশ্বাসের উপলক্ষ হয়ে উঠেছে। নদী ভাঙনের এই ভয়াবহতা নিয়ে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের প্রধান সংবাদ আয়োজনটি পরিবেশন করা হয়। প্রতিবেদনে সদর উপজেলার বিভিন্ন জায়গার নদী ভাঙনের অবস্থা তুলে ধরার পাশাপাশি এই ভাঙন রোধে যে কোথাও কোন কার্যকরী প্রচেষ্টা নেই তার বিবরণ দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। একইসাথে নদীভাঙন কবলিত এলাকার সাধারণ মানুষের ক্ষোভের কথাও উঠে এসেছে এতে। সংবাদপত্রে জনগণের দৈনন্দিন জীবন যাপনের সাথে সম্পর্কিত এইসব সমস্যার কথা সংবাদপত্রের পাতায় তুলে ধরার কারণ হলো কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। এবং এর মধ্য দিয়ে সমাধানের দ্রুততম উপায় বের করাও সংবাদ পরিবেশনের অন্য আরেকটি উদ্দেশ্য বটে। তো দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে মাঝে মধ্যেই যে বিভিন্ন এলাকার নদী ভাঙনের খবরাখবর প্রকাশিত হয় তা কি কোন কর্তৃপক্ষের নজর কাড়তে সক্ষম হয় আদৌ? সম্ভবত সমানভাবে বিষয়গুলো কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয় না। বিষয়টি এমনও নয় যে, সকল ভাঙন কবলিত এলাকার সমস্যা একদিনে সমাধান হয়ে যাবে। সেটি কেউ প্রত্যাশাও করেন না। আসলে সমস্যার বিষয়গুলো আমলে নেয়ার অভ্যাসই রপ্ত হয়নি আমাদের সরকারি বিভাগগুলোর। তারা নিজেদের উদ্যোগে জনগণের সমস্যার তীব্রতা অনুসারে প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রাধিকার তৈরির বিষয়টি কখনও চিন্তা করেন না। এজন্য এদেশে কাগজেপত্রে কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও মানুষের তীব্র সমস্যাগুলোর অনেকগুলোই একইরকম রয়ে যায়।
নদী ভাঙন রোধ করা একটি বিশাল ও বহুমুখী কর্মযজ্ঞ। এখানে নদী খনন, পাড় সংরক্ষণ থেকে শুরু করে নদীর গতিপথ পরিবর্তনেরও প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এজন্য দরকার সমন্বিত পরিকল্পনা যা দীর্ঘমেয়াদে ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে। কিন্তু আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনায় এমন দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পের অভাব প্রকট। এখানে খণ্ডিতভাবে কাজ করা হয় যা আদৌ কোন স্থায়িত্বশীল উপকারে আসে না সরকারি টাকার শ্রাদ্ধ করা ছাড়া। যতক্ষণ পর্যন্ত সরকারি উন্নয়ন পরিকল্পনায় এমন অদূরদর্শিতা পরিহার করা না হবে ততক্ষণ জেলার নদী ভাঙনের সার্বিক সমস্যাটিও সমাধানের বাইরেই থাকবে। আমরা জনপ্রতিনিধিগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আহ্বান জানাই, আপনারা সরকারের পঞ্চবার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় জেলার নদী ভাঙন ও হাওর রক্ষার বিষয়টি অন্তর্ভূক্ত করুন। এর স্থায়ী সমাধান বিষয়ে আগেভাগে বিশেষজ্ঞদের সাথে বিস্তারিত পরামর্শ করে উপযুক্ত প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করে সরকারের কাছে দাখিল করুন। নতুবা নদী ভাঙনের ফলে বাজারের পর বাজার এলাকার পর এলাকা ধ্বংস হবে আর আমরা সেই পতন চেয়ে চেয়ে দেখব।