মাত্র কয়েকদিন আগে বৌলাই নদীতে চর পরে শতাধিক বালু-পাথর-কয়লা বোঝাই বাল্ক হেড ও বড় নৌকা আটকে পড়ার খবর পরিবেশনের পর আমরা দ্রুত নদী খননের উপর গুরুত্ব দিয়ে সম্পাদকীয় মন্তব্য প্রকাশ করেছিলাম। এখন সেই প্রত্যাশা পূরণ হতে যাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বরাত দিয়ে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা গেল, জাদুকাটা, বৌলাই ও সুরমা নদীর নির্দিষ্ট অংশে ১৪৬ কোটি টাকার নদী খনন প্রকল্পের কাজ এখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। কাজটির টেন্ডার আহ্বান প্রক্রিয়া শেষ। জানুয়ারি মাসেই ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়ে যাবে বলে পাউবো জানিয়েছে। এই নদী খননের ফলে বালু, পাথর ও কয়লাবাহী বড় নৌকাগুলো সারা বছরই জাদুকাটা ও বৌলাই নদী দিয়ে চলাচল করতে পারবে এবং এর ফলে নদীর পানি ধারণ ক্ষমতা বেড়ে গিয়ে বোরো ফসলের হাওরকে অকাল বন্যা থেকে রক্ষা করবে বলে পাউবো প্রকৌশলীরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। এরকম একটি সুখবরে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মানুষ ও জড়িত বিভিন্ন পেশাজীবীদের সাথে আমরাও আনন্দিত।
নদী খননের কাজটিকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে বিশিষ্ট জনেরা পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁদের অভিমত পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে কোন প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা শুরু হলেই সেখানে ব্যাপক দুর্নীতির গন্ধ পাওয়া যায়। বলা বাহুল্য ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ নিয়ে পাউবোর সীমাহীন দুর্নীতিই এই ধারণার অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। তবে এখানে আরেকটি জিনিস সকলকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। কোন কাজই যেমন একটি পক্ষের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হয় না তেমনি একক কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে অবাধে নির্বিঘœভাবে এই দুর্নীতি চালিয়ে যাওয়াও সম্ভব হবে না। বাঁধ নির্মাণে পিআইসি নামক একটি ক্ষুদ্র কমিটির অস্তিত্ব রয়েছে যেগুলো জনপ্রতিনিধিদের পরামর্শক্রমেই গঠন করা হয়। এই পিআইসিতে যারা থাকেন দুর্নীতিতে তাদের স্বেচ্ছাচারও কম যায় না। সুতরাং দুর্নীতি বন্ধের প্রশ্ন যখন আসে তখন সবগুলো পথই বন্ধ করতে হবে।
তবে আলোচ্য নদী খননটিকে সব ধরনের বিতর্কের উর্দ্ধে রাখতে হবে আমাদের স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য। এখানে কেউ লোভের থাবা বসালে তা হবে এলাকার কৃষক, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের মাথায় কাঠাল ভেঙে নিজের উদর পূর্তির শামিল। নদী খননের কাজটি একটি বিশেষায়িত কাজ। এটি সঠিকভাবে না হলে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। প্রযোজ্য জায়গার পরিবর্তে অপ্রয়োজনীয় স্থানে খনন করা হলে নদী তীরবর্তী অঞ্চল অকাল ভাঙনের শিকার হতে পারে। সুতরাং কাজটি করতে হবে বিশেষ নজরদারি ও তদারকীর আওতায়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তদারকি তো রয়েছেই, আমরা কামনা করি এখানে জননজরদারিত্বও করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা যদি আন্তরিক ও সচেতন থাকেন তাহলে আমাদের বিশ্বাস কেউ এখানে দুর্নীতি করার চিন্তাও করতে পারবে না। সুনামগঞ্জের উৎপাদন ও অর্থনীতির সাথে জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নদী-নালা-খাল-বিলের গুরুত্ব সর্বাধিক। এগুলো উৎপাদন ব্যবস্থাকে শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়ে রাখার প্রধান স্তম্ভ। এই ধরনের একটি জরুরি কাজ শুরু হওয়ার মুহূর্তে আমরা কেবল আশাবাদ বজায় রাখতে চাই। কোন নেতিবাচক প্রপঞ্চকে ধারে ঘেষতে দেব না। সুনামগঞ্জের নদী খনন প্রকল্পের সুষ্ঠু বাস্তবায়নই কেবল আমাদের কাম্য।