অঞ্জন চৌধুরী ও প্রসেনজিৎ দে
“আমার যখন আড়াই বছর বয়স তখন থেকেই আমি গানের সাথে যুক্ত, মা বলেছেন আমি নাকি তখনই- প্রমোদে ঢালিয়া দিনু মন এই গানটি গাইতাম”।
এই কথাগুলো বললেন আমাদের সুনামগঞ্জের মেয়ে অনিন্দিতা চৌধুরী, যিনি বর্তমানে ঢাকায় থাকেন, বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে সপ্তাহে এক দুবার তাঁকে গানের বিভিন্ন আসরে দেখা যাবেই। অনিন্দিতা চৌধুরী সিমি উকিল পাড়াস্থ সুপরিচিত লম্বা বাসার সুযোগ্য উত্তরসুরী। তাঁর ঠাকুরদা সুধীর কুমার চৌধুরী একজন স্বনামধন্য মোক্তার ছিলেন। পিতা প্রাক্তন ব্যাংক কর্মকর্তা বর্তমানে এডভোকেট সুকুমার চৌধুরী (আমাদের শংকরদা), মা বিজয়া চৌধুরী। তারা ১ ভাই, ১ বোন, বড়ভাই সৌনক চৌধুরী সঞ্জীব পেশার কারণে ঢাকায় অবস্থারত। গত ২ জুন কেন্দ্রীয় কালীবাড়ী নাটমন্দিরে লোকনাথ বাবার ১২৬তম তিরোধান উৎসবে যোগদান করতে সুনামগঞ্জ এসেছিলেন অনিন্দিতা, তখন তার বাসায় আড্ডাচ্ছলে তবলাবাদক অঞ্জন চৌধুরীর সাথে তার কথোপকথনের কিছু অংশ পাঠকদের সামনে তুলে ধরার জন্য এই প্রয়াস।
অনিন্দিতা বলছিলেন- “আমাদের বাসায় ছিল গানের পরিবেশ, কাকু, পিসি সবাই গান করতেন তাই জন্মের পর পরই গানের সাথে সখ্যতা, প্রথম হাতে খড়ি হয় ভারতী চক্রবর্তীর নিকট। তাঁকে আমি জবা পিসি বলে ডাকতাম আর এসএসসি পাস করার পর প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী অকাল প্রয়াত হিতাংশু তালুকদার অপুর নিকট গান শিখি প্রায় দুবছর। উনার নিকট নজরুল, রবীন্দ্র ও বিশেষ করে ভজন শিখি। তারপর এইচএসসি পাস করার পর বাবা সিলেট বদলী হয়ে যাওয়ার কারণে আমরাও সিলেট চলে যাই। সেখানে পন্ডিত রামকানাই দাশের নিকট উচ্চাঙ্গ সংগীতে তালিম নেই। পরবর্তীতে উনার ছেলে খ্যাতনামা তবলা বাদক পিনুসেন দাশের সাথে বিয়ে হওয়ার সুবাদে বিয়ের পরও আমার শ্বশুর পন্ডিত রামকানাই দাশ নিজের কন্যা স্নেহে গান শিখিয়ে যেতে থাকেন। পিনুসেন দাশের সংগে আমার পরিচয় গানের স্কুল থেকেই, আমি যখন অনার্স পড়ি তখন ২০০৩ সালে বিয়ে হয়। পরবর্তীতে ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকে স্বামীর সংগে ঢাকা যাওয়ার পর ছায়ানটে নজরুল সংগীত বিভাগে ভর্তি হই। ঐ বিভাগে আট বৎসরের কোর্স এর মধ্যে আমি চার বৎসরের কোর্স করি। নজরুল ইনষ্টিটিউটে গান শিখি বিখ্যাত সুধীন দাশ, সোহরাব হোসেন, শাহিন সামাদ, সুমন দাশের কাছে। ছায়ানটে একটা সময়ে উস্তাদ মসকুর আলী খাঁ সাহেব ভারত থেকে আসতেন তাঁর নিকট আমি এক বৎসর উচ্চাঙ্গ সংগীতে প্রশিক্ষণ নেই। ২০০৫ইং সনে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন তিন কবির গান ও উচ্চাঙ্গ সংগীত প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। আমি প্রতিযোগিতায় ফাইন্যাল রাউন্ডে মনোনীত হই, তাছাড়া ধ্রুব পরিষদ আয়োজিত সংগীত প্রতিযোগিতায় নজরুল সংগীত ও উচ্চাঙ্গ সংগীতে দ্বিতীয় হই। আমার বিশেষত নজরুল সংগীত গাইতেই ভাল লাগে তাছাড়া তিন কবির গান যেমন নজরুল, রবীন্দ্র ও দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গান ছাড়াও সেমি ক্লাসিক্যাল গান ও আধুনিক গান গাইতে ভাল লাগে। আমি প্রায় প্রতিটি টিভি চ্যানেলেই গান করেছি। আর তাছাড়া ডার্ক গ্রুপ নামের একটি প্রতিষ্ঠান, ওইখানে গার্মেন্টস শিল্পে যারা কাজ করে সেইসব সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের, প্রতি শুক্রবার গান শিখিয়ে থাকি আর তাছাড়া বাসায় গানের ক্লাস নেই। বাকী সময়টুকু নিজের গানের চর্চাতেই চলে যায়”।
গানের এই পর্যন্ত আসার পেছনে কার অবদান বেশী, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমার বাসার বাবা, কাকু, পিসি সবার সহযোগিতা তো ছিলই, বিয়ের পর আমার শ্বশুর পন্ডিত রামকানাই দাশ আমাকে প্রেরণা উৎসাহ যেমন যুগিয়েছেন তেমনি উজাড় করে শিখিয়েছেনও, আমার স্বামী পিনু সেনদাশের অবদান অনস্বীকার্য । তাঁর সাহায্যেই আমাকে এতটুকু পথ আসা। পরবর্তীতে আরও অনেক দূর যাওয়ার যে তাগিদ দেওয়া সেটাও উনি দিয়ে যাচ্ছেন। আমার প্রথম এলবাম বেঙ্গল ফাউন্ডেশন থেকে বের হয় এটি একটি নজরুল সংগীতের উপর, তিন কবির গান নিয়ে একটি মিক্স এলবাম হয়েছে সেখানেও আমার একটি গান আছে। তাছাড়া নজরুল ইনষ্টিটিউট থেকে নজরুলের সুর করা গান নিয়ে সম্ভবত ১০টি গানের একটি এলবাম বের হয় তাতে আমার একটি গান আছে। অতি সম্প্রতি নজরুল ইন্সটিটিউট থেকে আরও একটি সিডি করা হয়েছে তাতে আমার একটি গান আছে। তাছাড়া নিজের এলবামটি নিজের কারণেই সময দিতে না পারায় হচ্ছে না, এটি একটি নজরুল সংগীতের এলবাম কলকাতার দূর্বাদল চট্টোপাধ্যায় সঙ্গীত পরিচালনা করছেন। আশা করছি খুব সম্প্রতি তা শ্রোতাদের হাতে পৌঁছাতে পারব”। বর্তমান সময়ের গানের ব্যাপারে আপনার মতামত কি? এমন প্রশ্নে অনিন্দিতা বলেন “আমি আসলে নিরাশাবাদী নই। শুদ্ধ সংগীত আছে, থাকবে, বর্তমানে যারা সত্যিই গান শিখছে তারা বুঝতে পারছে যে এই গানগুলি না শিখলে, না গাইলে গানের ভিত তৈরী হবে না বা ঐ হালকা গান আর লাফালাফির গান যাই বলি না কেন তা কিন্তু গাওয়া যাবে না। আর গানের রুচি বোধের বিষয়টা নিজ নিজ পরিবার থেকে ছোটবেলায়ই তৈরী হয়ে যায়, মানুষ রাগআশ্রিত গান নজরুল, রবীন্দ্রের গান শুনে বলেইতো এখনও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান করার আমন্ত্রণ পাই”। তার স্বামী ও পরিবার সম্পর্কে তিনি বলেন, স্বামী পিনুসেন দাশ, তাঁর পিতা পন্ডিত রামকানাই দাশ, খুবই বিখ্যাত একজন মানুষ ছিলেন। পিনুসেন দাশ বিশিষ্ট তবলা বাদক, বাংলাদেশের প্রায় সকল সিনিয়র শিল্পীদের সাথে উনি তবলা বজিয়েছেন, উনার তবলায় হাতেখড়ি তাঁর পিতা রামকানাই দাশের নিকট । তাছাড়া তবলা শিখেছেন কলকাতার বিখ্যাত ওস্তাদ সমর সাহার নিকট। একমাত্র মেয়ে, শ্রেষ্ঠা প্রিয়দর্শিনী। সে তবলা শিখছে গানও শিখছে। সংগীত আমার পিতার পরিবার যেমন তেমনি শ্বশুরের পরিবার থেকে পাওয়া। আমার রক্তেই মিশে আছে গান। আর আমার স্বামীর প্রসঙ্গে বলব, আমার জন্য এমনই একজন জীবনসংগী প্রয়োজন ছিল। সেটা শুধু গানের ক্ষেত্রে নয়, আমার পড়াশুনার ক্ষেত্রেও তাঁর প্রেরণা এবং উৎসাহ অনস্বীকার্য। আমি একা একা রাত জেগে পড়তে পারতাম না, এ কারণে আমার পরীক্ষার সময় উনিও আমার সাথে রাত জাগতেন। আমার সংগীত গুরু হিতাংশু তালুকদার সম্পর্কে একটা কথা বলা হয়নি। উনি ছিলেন অত্যন্ত দূরদর্শী আমাকে উনি বলে ছিলেন আমি যেন নজরুল সংগীতকেই প্রধান করে রাখি। আমার শ্বশুর বাড়ীর সবাই গান করে থাকেন। আমার স্বামীর বড়বোন কাবেরী দাশ, তিনিও বিশিষ্ট নজরুল সংগীত শিল্পী। বর্তমানে আমেরিকা আছেন, তাঁর দুই মেয়ে। আর আমার কাকু অভিজিৎ চৌধুরী এখনও সুনামগঞ্জের প্রতিটি অনুষ্ঠানে গান করে থাকেন। আমার আরেক কাকু শান্তনু চৌধুরী গান করতেন, পিসি সুপ্রিয়া চৌধুরী গান করতেন। আর সবচেয়ে আমার বড় বন্ধু, প্রেরণাদাত্রী হচ্ছে আমার কাকাতো বোন অভিনন্দা চৌধুরী স্বর্ণা। সে খুব ভাল গান করে। স্বর্ণা আমার ছোট। আমার প্রতিটি লাইভ শো সে দেখে এবং ফোন দিয়ে খুব প্রেরণা যুগিয়ে থাকে।
আমার ভবিষ্যত পরিকল্পনা বলতে যা কিছু তার সবই গান নিয়ে। আরও ভাল গান শিখতে চাই ভাল গান গাইতে চাই। আর পরিবার পরিজন নিয়ে অতি সাধারণভাবে বেঁচে থাকতে চাই। আমি সবার নিকট আশীর্বাদ প্রার্থী। আমি কোন দিন আমার এই শৈশবের শহর সুনামগঞ্জকে মন থেকে মুছে ফেলতে পারব না তাই যে কারও ডাকে আমি সর্বপ্রথম সুনামগঞ্জেই আসব”।
এই আড্ডায় তথা কথোপকথনে অনিন্দিতার বৌদি সুতপা ভট্টাচার্য্য উর্মি বেশ দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন। মাঝে মধ্যেই বিভিন্ন বিষয় মনে করিয়ে দিয়ে, কথার ফাঁকগলে পড়ে যাওয়া অনেক বিষয়কে আবার টেনে এনে প্রায় দক্ষ সংবাদকর্মীর মতো ভূমিকা পালন করে যাচ্ছিলেন। তাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
সবশেষে অনিন্দিতা এ শহরের আপামর জনসাধারণের আশীর্বাদ চাইলেন। তার সংসার অর্থাৎ স্বামী ও একমাত্র মেয়ে শ্রেষ্ঠার জন্য। বৃষ্টিমুখর সন্ধ্যায় মায়ের বড় আদরে বানানো পিঠের কথা শুনে শ্রেষ্ঠার সামনেই অনিন্দিতার শিশুর মতো খুশী দেখে মনটা এক অনির্বচনীয় অনুভূতিতে ভরে উঠছিলো। নন্দিত হও অনিন্দিতা, প্রকৃতি মুখরিত হোক তোমার ঐশ্বরিক সুরের ইন্দ্রজালে।
অনুলেখন : এড: প্রসেনজিৎ দে