- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

নাইওড়ির নাও, ২৮ বছর ধরে চালাচ্ছেন তিলক বৈষ্ণব

পি সি দাশ শাল্লা
‘ছোট বেলা থেকে বড় ভাইদের সাথে লাইনের নাও (যাত্রী যাতায়াতের নৌকা) চালাই। আগে নাওয়ের পানি ফালানি, পুটপরমাশ করতাম। পরে ভাইয়েরা নাও চালানি বাদ দিছে, কিন্তু আমি নাও চালাইতাছি।’
কথাগুলো বলেন দিরাই উপজেলার চরনারচর থেকে শাল্লা উপজেলার প্রতাপপুর পর্যন্ত নৌ রুটের নৌ চালক বৃহস্পতি বৈষ্ণব ওরফে তিলক।
জানা যায়, দীর্ঘ ২৮ বছর যাবত চরনারচর থেকে বায়া শ্যামারচর হয়ে প্রতাপপুর পর্যন্ত নৌকা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। প্রায় ১৬ মাইলের এই নৌ রুটে রয়েছে চরনারচর, দুর্গাপুর, লসিমপুর, কার্তিকপুর, আলীপুর, শ্যামারচর বাজার, পেরুয়া, দাউদপুর, উজানগাঁও, জয়পুর, নিয়ামতপুর, রামপুর, আনন্দপুর, নওয়াগাঁও, হরিনগর, আঙ্গারুয়া, সুখলাইন, বাহাড়া নয়া হাটি, বাজার হাটি, রঘুুনাথপুর, বাগের হাটি, যাত্রাপুর সহ অনেকগুলো গ্রাম।
গত রবিবার প্রতাপপুর থেকে নিজ বাড়ি শাল্লার নওয়াগাঁও যাওয়ার জন্য তার নৌকায় উটি। ঠিক ২ টায় প্রতাপপুর থেকে যাত্রীবাহি নৌকা ছেড়ে চরনারচর অভিমুখে যাত্রা শুরু করি। প্রখর গরম থাকায় নৌকার উপরে যাই। আমাকে দেখে নৌকার চালক তিলক বৈষ্ণব বলেন, ‘আরে সাংবাদিক দাদা যে- ছাতি (ছাতা) আইনচওই না?’ উত্তর না বলায় তিনি নিজের হাতের ছাতাটি আমার দিয়ে বলেন বইন আমার লগে (পাশে)।
কথা প্রসঙ্গে বেড়িয়ে আসে তিলক বৈষ্ণবের জীবনের বহু অজানা ঘটনা। নৌকা চালিয়ে কেমন আয় হয় জানতে চাইলাম। তিনি বলেন, ‘দাদা এখন খুব একটা ভাল না। ২৮ বছর ধরে এই লাইনে আমি নাও চালাই। এলাকায় আমার নাও রে সবাই কয় নাইওড়ির নাও। আমার নাওয়ে দিরাই শাল্লার প্রায় ১৬ টি গ্রামের মানুষ যাতায়াত করে। বহু মা, বোন তাদের বাবার বাড়ি, কেউ স্বামীর বাড়ি, আবার অনেকেই মেয়ে বাড়ি যায়। এই জন্য আমার নাওরে নাইওড়ির নাও হিসেবে সাবাই চিনে।’
আয় না হলে নৌকা কেন চালান প্রশ্নের উত্তরে তিলক বৈষ্ণব বলেন, ‘কি করবো বহুদিন যাবত এই রাস্তায় নৌকা চালাইতে চালাইতে প্রত্যেক গ্রামের মানুষের সঙ্গে আমার ভাল সম্পর্ক হয়েছে। বহু মা-বোনের কাছে আমার ফোন নাম্বার আছে। তারা ফোন দিয়ে বলেন, দাদা কোন সময় আইবায়, আমার লইয়া যাইও। এই সম্পর্কে আটকা পরে আছি বলেই এখনও আছি লাইনে। এলাকার সবাই আমায় খুব বিশ্বাস করে। আমিও ২৮ বছর যাবত এই সুনাম ধরে আছি। কেউ বলতে পারবেনা টাকার জন্য আমি কোন যাত্রী কে নাও থাইক্যা লামাইয়া দিছি। আমি স্কুল, কলেজের ছাত্র ছাত্রীদের এমনি আনি, তাদের মনে চাইলে টাকা দেয়, না দিলেও কিছু বলিনা।’
তিনি বলেন, ‘দাদা আমি লেখা পড়া করছি না। এখন বুঝি পড়া লেখার কি মান। এর লাগি তারারে আমার সাধ্য মত এই নাও ভাড়াটা না নিয়ে একটু সাহস দেই আর বলি তোমরা বড় হও লেখাপড়া করে। এর জন্য আমি না হয় কয়ডা টেকা ( টাকা) নাই নিলাম। তারাই তো এক দিন দেশের সম্পদ হবে।
তিলক বৈষ্ণবের মুখ থেকে এসব কথা শুনে খুব ভাল লাগলো। তিনি জানান তার একটি ছেলে ও একটি মেয়ে আছে। এইচএসসি পাশের পর গত বছর মেয়েটিকে বিয়ে দিয়েছেন এবং একমাত্র ছেলে তপু বৈষ্ণব জিপিএ এ পেয়ে এইচ এস সি পাশ করছে দিরাই সরকারি ডিগ্রি কলেজ থেকে।
তিনি জানান, এই নৌকা বেয়েই কিছু জমি করছি, সন্তানদের লেখাপড়া করাইতেছি, একটা নিজের নাও বানাইছি। তিনি জানান এলাকার মানুষদের না দেখলে আমার ভাল লাগে না। আয় হোক আর না হোক যতদিন পরি এই রুটে নৌকা চালিয়ে যাবেন বলে জানান।
আনন্দপুর গ্রামের শহীদ মিয়া জানান, ছোট থাকতেই দেখতাছি তিলক দা এই রুটে নৌকা চালায়। তার ব্যবহার খুব ভাল। সে খুব বিশ্বাসী মানুষ আমাদের এলাকায়।
পাশে রামপুর গ্রামের কৃপেশ দাস বলেন, চরনারচরের নৌকারে আমরা নাইওড়ির নৌকা বলি। বহুদিন যাবত একেই রুটে নৌকা চালিয়ে তিলক সবার প্রিয় হয়ে গেছে।
শাল্লা সদরের এক সময়ের ইজারাদার মধু মিয়া বলেন, তিকল দার ব্যবহারে তার নৌকার জন্য যাত্রীরা অপেক্ষা করতো। এখন ও মাঝে মাঝে তার সঙ্গে দেখা হলে খুব ভাল ব্যবহার করে, তার সুনাম আছে এলাকায়।
বর্তমান ইজারাদার মহাদেব দাস বলেন, তিলক বৈষ্ণব বহুদিন ধরে নৌকা চালান। তার বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত কোন অভিযোগ পাইনি। আসলে সে খুব ভাল। এখনও সুনামের সাথে নৌকা চালিয়ে যাচ্ছে।

  • [১]