সুভাষ দাশ
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উন্নতির ইতিহাস পর্যালোচনায় সুস্পষ্ট ভাবে প্রতীয়মান হয় যে, শিক্ষা কোন দেশের উন্নতির সঠিক ও দক্ষ হাতিয়ার। সেই হাতিয়ারকে কাজে লাগানোর জন্য দক্ষ, পরিশ্রমী, দেশপ্রেমিক ও নীতিবান পরিচালক আবশ্যক। প্রযুক্তির কল্যাণে নতুন যন্ত্র আবিষ্কৃত হচ্ছে। সেই যন্ত্রকে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন উপরে বর্ণিত চারটি গুণসম্পন্ন দক্ষ জনবল। তা না হলে বিজ্ঞানের নবতর আবিষ্কার যুগের চাহিদা মোকাবেলায় কার্যকর ভুমিকা পালনে ব্যর্থ হবে। এই সত্যটিকে বিবেচনায় রেখে শিক্ষার উন্নয়নে সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন। তাতে প্রশান্তি আছে কিন্তু আত্মতৃপ্তির সুযোগ কম। কারণ আরও নানা ধরণের অগ্রগতি একান্ত প্রয়োজন। লেখার শুরুতেই পরিচালকের চারটি বৈশিষ্টের কথা বলা হয়েছে-কেন?
শিক্ষাকে চলমান রাখার জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত শিক্ষক। শিক্ষকতা একটি মহান পেশা আর শিক্ষক সমাজে একজন শ্রদ্বেয় সম্মানিত ব্যক্তি যা যুগের বিবর্তনের প্রেক্ষিতে ও পরম্পরায় চলমান সত্য।সেই সত্য শব্দটিকে টিকিয়ে রাখার সুকঠিন দায়িত্ব পালন করার কাজ যে মানুষগুলোর ওপর বর্তায় তাঁদেরকে অবশ্যই এই বৈশিষ্ট্যগুলো শুধু লালন না পালনও করার জন্য দৃঢ় অঙ্গীকারাবদ্ধ হতে হবে যার প্রমাণ মিলবে প্রাত্যহিক কাজে। তাই একজন শিক্ষকের পদ মর্যাদা রক্ষা করতে হয় বিভিন্ন দায়িত্ব সম্পাদনের মধ্য দিয়ে। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের পঁচন ধরলে চিকৎসার মাধ্যমে একজন রোগীকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয় কিন্তু যদি মস্তিষ্কে পঁচন ধরে তবে খুব দ্রুতই তাকে মৃত্যুর কাছে মাথা নত করতে হয়। ঠিক একইভাবে একটি দেশের বিভিন্ন পেশার লোক অনৈতিকতায় জড়িয়ে পড়লে খুব সহজেই সেই দেশের সার্বিক অবস্থা ভেংগে পড়ার আশংকা থাকেনা। কিন্তু যখন শিক্ষক সমাজে নৈতিকতার স্খলন ঘটে তখন মস্তিষ্ক পঁচনের শামিল হয়ে যায়। একবিংশ শতাব্দীর চাহিদা মোকাবেলার উপযোগী করে শিক্ষার্থীদের বিশ্ব নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে গুণগত মান সম্পন্ন শিক্ষার লক্ষ্য অর্জন বর্তমান সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ। এ লক্ষ্য অর্জনে সবচেয়ে বড় বাধা বিষয়ভিত্তিক গভীর ও বিস্তৃত জ্ঞান, শিখন-বিজ্ঞান ও শিখন-শেখানো কৌশল সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও দক্ষতা, শিক্ষার্থীর প্রতি যথাযথ মমত্ববোধ ও দায়িত্ব জ্ঞান, মানবিক ও কল্যাণকর দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন শিক্ষকের অভাব। শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর যার দক্ষ হাতের ছোঁয়ায় একজন শিক্ষার্থী পায় তার ভবিষ্যৎ জীবনের পরিপূর্ণতা। বহু সংখ্যক শিক্ষার্থীকে নিয়ে একজন শিক্ষকের শিক্ষণ শিখন কার্যক্রম পরিচালিত হয় যাদের মধ্যে ভিন্নতা আছে মেধা এবং আচরণের। শিক্ষক জ্ঞানের গভীরতা, ব্যক্তিত্ব, বিচক্ষণতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদেরকে আকৃষ্ট, মুগ্ধ ও নিয়ন্ত্রণ করবেন। শিক্ষককে শিক্ষার্থীদের আপনজন
হয়ে আন্তরিকতার সাথে তাদের মেধা ও মননকে পরিমাপ করতে হয়। তারপর সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটানোর কাজ যা অত্যন্ত দূরুহ-এখানেই শিক্ষকের সার্থকতা। এজন্য একজন শিক্ষকের জ্ঞানের গভীরতা সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়।
দূর্নীতি একটি সামাজিক ব্যাধি। তাই দূর্নীতি মুক্ত সমাজ বিনির্মানের প্রথম প্রয়াস আদর্শ মানুষ গড়া। সেই সাথে সমাজকে সচেতন এবং সর্বক্ষেত্রে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এ কাজে সর্বাগ্রে শিক্ষকদের ভুমিকা অগ্রগন্য। অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে,তব ঘৃণা তারে যেন তৃণ সম দহে- রবি ঠাকুরের এই দর্শনটি শিশুদের মনে প্রতিষ্ঠিত করানোর একমাত্র পবিত্র দায়িত্ব পরম শ্রদ্বেয় শিক্ষক সমাজের মাধ্যমেই সম্ভব। মহানবী (সাঃ) নিজেকে শক্তিশালী রাষ্ট্র নায়ক বা সেনা নায়ক হিসেবে নিজেকে অভিহিত না করে বলেছিলেন আমি শিক্ষকরূপে প্রেরিত হয়েছি। শিশুরা অনুকরণ প্রিয়। শিক্ষকগণ নীতি ও নৈতিকতার কথা শুধু মুখের বাণীতে না রেখে আচার আচরণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন।
শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। শিক্ষা ছাড়া কোন জাতি উন্নতি করতে পারেনা। শিক্ষা এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পরস্পর মিথস্ক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এই মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে জ্ঞান, কর্মদক্ষতা, চরিত্র ও মানসিক শক্তির বিকাশ ঘটে এবং সৃজনশীল ক্ষমতার উদ্ভব হয়। জাতীয় জীবনে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। শিক্ষা সভ্যতার জন্মদাতা। যে জাতি যত বেশি উৎপাদন, কর্মমুখী ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি শিক্ষায় শিক্ষিত সে জাতি তত বেশি উন্নত। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, জাতির অপরিহার্য অঙ্গ হচ্ছে সুশিক্ষা। আর এই শিক্ষা অর্জনের জন্য শিক্ষার্থীকে কয়েকটি স্তর অতিক্রম করতে হয়। একটি সুস্থ জাতি গঠনের জন্য শিক্ষার উথকর্ষ সাধন অর্থাথ ঢেলে সাজানোর কোন বিকল্প নেই। উন্নত দেশ শিক্ষকদের সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তাদের পদমর্যাদাসহ বেতন কাঠামো অত্যন্ত সমৃদ্ধ। অথচ আমাদের দেশের চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। ফলে ক্রমান্বয়ে এ পেশায় মেধাবীদের সংখ্যা এ পেশায় কমে যাচ্ছে। তাহলে কীভাবে গুণগত শিক্ষা অর্জন সম্ভব? জাতির আশা আকাংখার প্রতীক ভবিষ্যত সুশিক্ষিত প্রজন্ম গড়ে তুলতে যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করেন সেই শিক্ষকের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক মর্যাদা যদি হয় অবহেলিত তাহলে তাঁরা কীভাবে এ মহান পেশায় সম্পূর্ণ আত্মনিয়োগ করবেন সেই প্রশ্নটি থেকেই যায়? শিক্ষকদের পদ মর্যাদা সমৃদ্ধ করণের এখনই মাহেন্দ্রক্ষণ যাহা ভিশন-২০২১ কে আরোও চমকপ্রদ করবে বলে বিশ্বাস।
লেখক: শিক্ষক, সরকারি এস.সি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়