- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

নিউইয়র্কে করোনার দিনকাল

ইশতিয়াক রুপু
করোনার তান্ডব মনে হচ্ছে ধীরে ধীরে স্থিমিত হয়ে আসছে। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে করোনার আক্রমন শুরু হয়ে মধ্য এপ্রিলে নিউইয়র্ক নগরী উৎকন্ঠা আর ভীতির নগরীতে রুপ নেয়। প্রতিদিন মৃত্যর মিছিলে বাড়তেই থাকে। তা দেখে প্রথমে নিউইয়র্কের গভর্নর কুমো ও মেয়র ডি ব্লাজিও নেমে এলেন করোনার আক্রমনে ছিন্ন বিছিন্ন নগরীর ভেঙে পড়া হাসপাতাল গুলিতে।নিউইয়র্কের হাসপাতাল সব এতো রোগীর একসাথে আগমনের জন্য তৈরী ছিলো না। তাছাড়া করেনার রোগীদের সেবা করবার জন্য
ডাক্তার নার্স সহ পুরো হাসপাতালে ছিলো সুরক্ষা সামগ্রী ও প্রতিষেধক ঔষধের প্রচন্ড অভাব। সব মিলিয়ে নগরীর প্রায় ২৪০ টি ছোট বড় হাসপাতালে শুধু সংকট আর সংকট। স্রোতের ন্যায় আক্রান্ত রোগীরা লাইন ধরে আসছে হাসপাতালের জরুরী বিভাগে। নার্স আর ডাক্তারদের করতে হয়েছে অমানুষিক পরিশ্রম। বিশেষ করে বয়স্ক রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়ে উঠে অসম্ভব। প্রতিদিন আসতে শুরু করলো চেনা জানা আর স্বজন হারানোর সংবাদ। এদিকে সবাই ঘরে বন্দি। একমাত্র টেলিফোনে যোগাযোগ ছাড়া আর কোন উপায় নেই। মৃত্যভয় দ্রুত ছড়িয়ে পড়লো সর্বত্র। ২৮ শে মার্চ মঙ্গলবার পর্যন্ত নিউইয়র্ক হারিয়েছে ২০৬ জন বাংলাদেশী যার মধ্যে এক তৃতীয়াংশ হলেন বৃহত্তর সিলেটের অধিবাসী। করোনার আক্রমন বেশি ছিলো নগরীর বাংলাদেশ অভিবাসী অধ্যুষিত জ্যাকসন হাইট, জ্যামাইকা আর ওজন পার্ক এলাকায়।
মৃত্যদের মধ্যে আছেন নিউইয়র্কের শীর্ষস্থানীয় সমাজ সেবী সহ বিভিন্ন পেশাজীবী নিউইয়র্কার।বাংলাদেশীদের বৃহৎ সামাজিক সংগঠন বাংলাদেশ সোসাইটির সভাপতি সিলেটের কৃতি সন্তান কামাল আহমদ মারা গেলেন নানা শারিরীক জটিলতায়।আরো যারা করোনার আক্রমনে প্রান দিলেন সিলেটের ইসমত চৌধুরী সহ আরো ২৫/৩০ জন। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে অনেকেই করোনার আক্রমনে সৃষ্ট নানা শারিরীক জটিলতায় স্বল্প সময়ে প্রান হারান। সিলেট নগরীর পরিচিত মুখ অরুপ শ্যাম চৌধুরীর স্ত্রী কবিতা সেনগুপ্তা। যিনি ছিলেন প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী প্রয়াত সুবির নন্দীর শ্যালিকা। যার শেষ কৃত্য হয প্রায় ২০ দিন পর নিউইয়র্কের অদূরে নিউজার্সীর এক শহরে। করোনার কারনে মৃত্যদের জন্য সবচেয়ে করুন অংশ হলো শেষবারের মত স্বজনদের সাক্ষাতে নিয়মবিধি। একান্ত নিজেদের প্রিয় আত্মীয়দের মধ্যে চার/ পাঁচ জন ছাড়া কাউকে শেষকৃত্য পালনে যোগ দিতে দেয়া হয় না। এমনি কত শোকের গল্প নিয়ে আমাদের প্রবাস জীবনে চলা। যখন এই প্রতিবেদন লিখছি তখনই খবর পেলাম একজন সাংবাদিকের অকাল মৃত্য। যিনি ছিলেন নিউইয়র্কের সবার প্রিয় এক ব্যাক্তিত্ব হুমায়ূন কবির খোকন। কার কথা লিখবো আর বলবো কত পরিচিত মুখ সহ যোদ্ধা সাংবাদিক ফটো সাংবাদিক নিউইয়র্কের পুলিশ বাহিনীর সক্রিয় সদস্য দেশ থেকে আসা সুখি ও স্বচ্ছল ব্যবসায়ী সহ আরো অনেক স্বজন আর প্রিয়জন। ২৮ শে মার্চ মঙ্গলবার বাইরে সুন্দর ঝক ঝকে দিনের মধ্য প্রহর। তিন তালার জানালার ওপাশে বসে দিন কে দেখছি আর ভাবছি এই অবরুদ্ধ সময়ের শেষ কবে। মানসিক পীড়নের চুড়ান্ত পর্যায় চলছে শুধু কি আমার দুই মেয়ে এমনকি সাড়ে পাঁচ বছরের নাতিন সুমেশার। গতকাল বায়না ধরে মা কে বলছে সে স্কুলে যাবে। অনেক দিন সহপাঠি দের দেখছে না। ক্লাস টিচার কে দেখছে না। বন্দি জীবনে সে ক্লান্ত।
আমরা সবাই যতটুকু ভাল থাকা যায় সেই তেমনই আছি তবে পুরো মানসিক সুস্থতা নিয়ে নয়। প্রতিরাতে ঘুমাতে যাই পরদিনের একটি উজ্জল, আলোকিত এবং নিরাপদ সকালের শুরু দেখব বলে।
মনে হচ্ছে সেই কাঙ্খিত দিন হয়তো বেশি দুরে নয়।

  • [১]