করোনাকালীন বা পরবর্তী বিশ্বে মানুষের নতুন জীবনাচরণকে কিছু সমাজবিজ্ঞানী নিউ নরমাল বা নতুন স্বাভাবিকত্ব বলে ভাবতে শুরু করেছেন। অর্থাৎ করোনা মহামারী শুরু হওয়ার পর মানুষের যে নতুন জীবন যাপনের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তাকেই নিউ নরমাল হিসাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। কী এই নতুন জীবন যাপনের সংস্কৃতি? পারতপক্ষে ঘর থেকে বের না হওয়া, মুখে মাস্ক পরিধান করা, বারবার হাত ধোয়া, জনসমাবেশে যোগ না দেয়া, অন্যের সংশ্রব এড়িয়ে চলা; ইত্যাদি অভ্যাসকে করোনা থেকে বাঁচার উপায় হিসাবে বাতলে দেয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে করোনা মহাদুর্যোগটি সহসা বিশ্ববাসীর ঘাড় থেকে নামবে না। করোনাকে সাথে নিয়েই বহুদিন আমাদের জীবন যাপন করতে হবে। আর এজন্য করোনাকালে যে জীবনাচরণের শিক্ষা দেয়া হয়েছে তাই অব্যাহত রাখতে হবে। নতুন এই জীবন সংস্কৃতির সাথে অভ্যস্ত হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকার যে বৈশ্বিক তাগিদ সেটিকেই নিউ নরমাল নামে গ্রহণ করার উপদেশ দেয়া হচ্ছে। এই যে নতুন জীবনবোধ বা দর্শন আমাদের সামনে উপস্থাপন করা হচ্ছে তাতে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ চেহারাটা কেমন হতে পারে? এই নতুন সংস্কৃতি মানুষকে কোন্ উপহার দিবে সে নিয়ে ভাবনার অন্ত নেই। তবে অতীতে মানব সভ্যতায় যত দুর্যোগ এসেছিল তার পরিণতিতে সভ্যতার কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে এমন বলার অবকাশ নেই। সুতরাং করোনা অভিঘাতের নিউ নরমাল আইডিয়াটিও হয়তো সেই অর্থে বিশ্বকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে না। তবুও মানুষ বেঁচে থাকার নিরন্তর চেষ্টা করে যাবে। করোনাকে কাবু করার উপায় বের করবে এবং আবারও ঘুরে দাঁড়াবে। তবে এর কোনটিই নিউ নরমাল নামের ভ্রান্ত জীবনাদর্শ দ্বারা উদ্ভূত হবে না। হবে মানুষের চিরন্তন সৃজনশীলতা ও অগ্রগতির সনাতন বৈশিষ্ট্যের কারণেই।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল মানবসভ্যতার এক মহাদুর্যোগ কাল। ওই মহাযুদ্ধের অপূরণীয় ধ্বংসযজ্ঞ দেখে মানুষ শান্তি ও সদ্ভাবের শিক্ষা অর্জন করেনি। বরং ওই সময়ই আনবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নতুন সুপারপাওয়ার হয়ে উঠার হুংকার ছাড়া হয়েছে। এই মহাযুদ্ধের সংকটকে ব্যবসায়িক স্বার্থ সিদ্ধি তথা মুনাফা লুণ্ঠনের উপকরণ করা হয়েছে। আমাদের উপমহাদেশে আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতা অপব্যবহারের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় বা জনগণের সম্পদ হরণ করে বিত্তের পাহাড় গড়ার সুযোগ তৈরি করে দেয়ার ব্যবস্থা বেগবান হয়েছিলো ওই মহাযুদ্ধ কালে। এই করোনার সময়েও আমরা দুর্নীতির নতুন নতুন রূপ ও চমকপ্রদ উপায় দেখে রীতিমত অবাক হচ্ছি। করোনা দুর্যোগকে কাজে লাগিয়ে কারও এক নম্বর সুপারপাওয়ার হওয়ার আবার কারও জায়গা ধরে রাখার নিদারুণ প্রচেষ্টাও আমরা দেখছি। করোনায় অসহায় মৃত্যু মানুষের লালসাকে বিন্দুমাত্র অবদমিত করতে সক্ষম হয়নি। অনেকেই বলেন করোনা নামক অদৃশ্য ভাইরাসের মহা আঘাত মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে ইতিবাচকভাবে পালটে দিবে। কিন্তু তা যে হবার নয় তা আমাদের দেশ সহ পুরো পৃথিবীর অবস্থা দেখে বেশ ভালো বুঝা যায়।
তাই নিউ নরমাল দর্শনের নামে শোষণমূলক বিশ্ব ব্যবস্থা এখন ব্যক্তির গোষ্ঠীশক্তির অপরিমেয় ক্ষমতাকে অবদমিত করে রাখার নতুন কৌশল হিসাবে সামনে আনবে। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে বিচ্ছিন্নতাকে উসকে দেয়া হবে। মানুষের সংঘবদ্ধতাকে দুর্বল করার চেষ্টা করা হবে। পুঁজি আর পুঁজ শাব্দিকভাবে কাছাকাছি অবস্থান করে। এই কাছাকাছি অবস্থান করা পুঁজির চরিত্র নির্দেশ করে। পুঁজি সবকিছুকে পচিয়ে হলেও নিজের সমৃদ্ধি ঘটাতে চায়। করোনার সময়ে অপ্রয়োজনীয় রেমডিসিভির প্রকৃত মূল্যের কয়েকগুণ বেশি দামে বিধ্বস্ত রোগীকে গছিয়ে দিয়ে যেমন সর্বস্ব লুটতে চাওয়া অথবা ভুয়া অক্সিজেন ব্যবহারের নাম করে লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়া কিংবা করোনার মিথ্যা রিপোর্ট দিয়ে জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে দেয়া; ইত্যাদিও নিউ নরমাল হয়ে যায় কিনা তাই এখন প্রান্তিক বিশ্ববাসীর দুশ্চিন্তার কারণ।