সু.খবর ডেস্ক
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় নিজামউদ্দিন আউলিয়ার দরগা জিয়ারতের মাধ্যমে ভারতে তাঁর ৪ দিনের সফর শুরু করেছেন। তিনি সেখানে কিছু সময় অতিবাহিত এবং ফাতিহা পাঠ ও মোনাজাত করেন।
প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সচিব কে এম সাখাওয়াত মুন সাংবাদিকদের জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেখানে নফল নামাজ আদায় ও মোনাজাতকালে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করেন।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী পরে নিজামউদ্দিন আউলিয়ার দরগার বিভিন্ন অংশে যান। ভারতে সুফি সংস্কৃতির অন্যতম পবিত্রস্থান এই দরগাটি প্রায় ৭০০ বছরের পুরনো।
বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকান্ডের পর ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত দিল্লীতে অবস্থানকালে শেখ হাসিনা নিয়মিত নিজামউদ্দিন দরগায় জিয়ারতে যেতেন।
প্রধানমন্ত্রী ৮ সেপ্টেম্বর ভারত সফরের শেষ দিনে রাজস্থানে আজমির শরীফ দরগা জিয়ারত করবেন।
বাংলাদেশী প্রধানমন্ত্রী ২০১৭ সালে আজমির শরীফ জিয়ারত করেন। এর আগে ২০১০ সালে যখন তিনি দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন তখনও আজমির শরীফ জিয়ারত করেন।
বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রী সোমবার ভারতের স্থানীয় সময় বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে নয়াদিল্লীর পালাম বিমানবন্দরে পৌঁছেন। সেখানে শেখ হাসিনাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেয়া হয়।
ভারত সফরের প্রথম দিন বিকেলে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস. জয়শংকর মৌর্য্য হোটেলে প্রধানমন্ত্রীর স্যুইটের সম্মেলন কক্ষে তাঁর সাথে দেখা করেছেন।বৈঠক শেষে ভারতীয় মন্ত্রীর বরাত দিয়ে সিনিয়র পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানান, “তারা আমাদের বলেছে যে, ভারত সেখানে (রাখাইন রাজ্য) সৃষ্ট অস্থিরতার দিকে নজর রাখছে।”
বৈঠকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে, রাখাইন রাজ্যে সাম্প্রতিক অস্থিরতার ইস্যুতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ব্যাহত হবে কিনা।
প্রধানমন্ত্রীর উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, “প্রত্যেকেরই সেই আশঙ্কা রয়েছে।”
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফর বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও গভীর করার প্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। তিনি মনে করেন, এই সফরের ফলে এক বছরে (২০২১) ভারতীয় রাষ্ট্রপতি এবং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের মাধ্যমে শুরু হওয়া চক্রটি শেষ হয়েছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব বলেন, দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক খুবই ভালো।
পররাষ্ট্র সচিব বলেন, বৈঠকে বাংলাদেশ ও ভারত উভয়ই প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সংযোগ বাড়াতে তাদের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান ও নেপালের জনগণের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করবে এমন প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
পররাষ্ট্র সচিব বলেন, এ লক্ষ্যে এই অঞ্চলে আরও ভালো যোগাযোগের জন্য বিবিআইএন-এর মতো উদ্যোগকে বেগবান করতে হবে।
তিনি বলেন, নেপাল ও ভুটানকে বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দেয়ার উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি বলেন “এই সংযোগ মানে শুধু ভৌত সংযোগ নয়, এতে আছে জ্বালানি সংযোগ এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের সংযোগ”।
কোভিড-১৯ মহামারী চলাকালীন জনগণের সাথে জনগণের যোগাযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোভিড-১৯ পরিস্থিতির পর সড়ক, বিমান ও রেল যোগাযোগ পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।
গ্রিড কানেক্টিভিটির বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, গ্রিড কানেক্টিভিটি বাংলাদেশকে নেপাল, ভুটান এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ আনতে এক অংশ থেকে অন্য অংশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সহায়তা করবে।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এরই মধ্যে সংযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশে ১০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আনা হচ্ছে।
আলোচনাকালে পানি বণ্টনের বিষয়টিও উঠে এসেছে জানিয়ে তিনি বলেন, আগামীকাল (মঙ্গলবার) এ লক্ষ্যে মূল আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।
তিনি বলেন, বৈঠকে তারা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও আলোচনা করেছেন যা বিশ্বে একটি সংকট তৈরি করেছে।
তিনি আরো বলেন, উভয় নেতা সম্মিলিতভাবে সংকট মোকাবেলায় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
যুদ্ধের পটভূমিতে জ্বালানি সহযোগিতার বিষয়ে তিনি বলেন, পারস্পরিক সম্মত শর্তাবলীর ভিত্তিতে জ্বালানি উদ্বৃত্ত থাকলে বাংলাদেশ ভারত থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে পারে।
রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল কেনার বিষয়ে তিনি বলেন, তারা রাশিয়া থেকে তেল নিতে পাবেনা এটা ঠিক নয়, তবে “আমরা এখন প্রযুক্তিগত বিষয়গুলো যাচাই করছি”।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তারা কুশিয়ারা নদীর পানি বণ্টন, পানি ব্যবস্থাপনা, তথ্য ও সম্প্রচার, রেলওয়ে এবং বিএসআরআই-এর বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করার লক্ষ্যে খসড়া চূড়ান্ত করছেন।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অন্যান্য আরো অনেক ইস্যুর পাশাপাশি তিস্তা ও গঙ্গা নদীর পানি বন্টন নিয়ে আলোচনা হতে পারে। শীঘ্রই গঙ্গার পানি বন্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে।
পরে আদানী গ্রুপের চেয়ারম্যান গৌতম আদানী একই স্থানে শেখ হাসিনার সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
প্রধানমন্ত্রী সন্ধ্যায় ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাই কমিশনার মোহাম্মদ ইমরান ও মিসেস জাকিয়া হাসনাত ইমরান আয়োজিত এক রিসেপশন-কাম-ডিনারে যোগ দেন।
সফরের দ্বিতীয় দিনে ৬ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনা হায়দরাবাদ হাউসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ও একান্ত আলোচনা করবেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভ্যর্থনা জানাবেন এবং তাঁকে আনুষ্ঠানিক গার্ড অব অনার প্রদান করা হবে।
দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর, দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং পরে একটি প্রেস বিবৃতি জারি করা হবে।
শেখ হাসিনা পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক তাঁর সম্মানে আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজে যোগ দেবেন।
একই দিন শেখ হাসিনা ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু ও উপ-রাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখারের সাথে পৃথক সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
৬ সেপ্টেম্বর তিনি রাজঘাটে মহাত্মা গান্ধীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন।
পরের দিন ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের উন্নয়ন মন্ত্রী জি কিষান রেড্ডি এবং নোবেল বিজয়ী কৈলাশ সত্যার্থী তাঁর সঙ্গে পৃথকভাবে সাক্ষাত করবেন।
একই দিনে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দেখা করার কথা রয়েছে।
৭ সেপ্টেম্বর, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী নেতাদের সভায় এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় শহীদ বা গুরুতর আহত ভারতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর অফিসারদের বংশধরদের ‘মুজিব বৃত্তি’ প্রদানের অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ফেরার আগে রাজস্থানের খাজা গরীব নওয়াজ দরগাহ শরীফ, আজমির (আজমির শরীফ দরগাহ) জিয়ারত করবেন।
সূত্র : বাসস