প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষ যদি উপকার না পায় তাহলে সেই প্রযুক্তিকে জনবান্ধব বলার উপায় থাকে না। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, স্থাপনা ও স্পটে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা স্থাপন করা হয় নিরাপত্তার স্বার্থে, দুর্ঘটনা এড়াতে বা অপরাধী সনাক্ত করতে। মাত্রই কয়েকদিন আগে শহরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্পটে চেম্বারের অর্থায়নে মহাধুমধামে বসানো হলো বেশ কয়েকটি সিসি ক্যামেরা। জেলা কালেক্টরেট ভবনটি আগে থেকেই সিসি ক্যামেরার আওতাভুক্ত ছিলো। এরকম বহু সরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখন সিসি ক্যামেরার দ্বারা মনিটর করা হচ্ছে। বেসরকারি পর্যায়েও বিভিন্ন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়িতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। মোটামোটি বলা যায় সর্বত্র সিসি ক্যামেরা লাগানোর একটা হিড়িক পড়েছে । কিন্তু স্থাপিত এসব সিসি ক্যামেরার সহায়তায় কোন অপরাধপ্রবণতা রোধ কিংবা অপরাধী সনাক্ত করা গেছে কিনা তা এতোদিন ছিল অপরীক্ষিত। সম্প্রতি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের আঙ্গিনা থেকে একটি মোটর সাইকেল চুরি হলে সিসি ক্যামেরার কার্যকারিতা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন উঠে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে এই তথ্য পাওয়ার পাশাপাশি আরও জানা যায় যে, কাজির পয়েন্ট এলাকায় কুটুমবাড়ি রেস্টুরেন্টের সিসি ক্যামেরার সামনে বিশ্বজিৎ হত্যাকা- কিংবা প্রাইম ব্যাংকের সামনে থেকে মোটর সাইকেল চুরি যাওয়ার বিষয়ে পার্শ্বস্থ সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে অপরাধী চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে মোটর সাইকেল চুরির দৃশ্যটি সিসি ক্যামেরার চোখে ধরা পড়ে এবং চুরির দৃশ্যটি ফেসবুকে আপলোড করায় এটি দেখার সুযোগ পেয়েছেন বহু মানুষ। কিন্তু এখানে চোরের চেহারা স্পষ্ট দৃশ্যমান নয়। আবছাভাবে চোরকে দেখা গেছে। চেহারা চিহ্নিত না হওয়ায় চোর সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন ব্যক্তি এজন্য সিসি ক্যামেরাগুলোর মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের অভিমত, স্থাপিত সিসি ক্যামেরাগুলোর মান ভাল নয় বলেই আওতাধীন এলাকার স্পষ্ট ছবি তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে এগুলো। সিসি ক্যামেরা স্থাপন করলেই যে শুধু চলবে না বরং এর মান নিয়েও ভাবতে হবে সেটি আমরা এখন বুঝতে পারছি।
অন্যদিকে আরেকটি বিষয় ভাবার মতো। বিভিন্ন জায়গায় সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হলেও নিয়মিত মনিটর করা হয় না। সদর থানার ওসি বলেছেন, সিসি ক্যামেরা মনিটরিংয়ের জন্য পৃথক কোন লোকবল না থাকায় নিয়মিত কর্মকর্তাদের দিয়েই কাজটি সারতে হয়। এজন্য কিছু সমস্যা হচ্ছে। আমাদের ধারণা সর্বত্রই এই বাস্তবতা বিরাজমান। সিসি ক্যামেরার মনিটরের সামনে সার্বক্ষণিকভাবে একজন পর্যবেক্ষক বসে থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে অপরাধ রোধ করা সম্ভব হয়। তিনি অপরাধ ঘটনার দৃশ্য দেখামাত্র তা প্রতিহত করতে সংশ্লিষ্টদের বার্তা দিতে পারেন। কিন্তু এই সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের জায়গাটি দুর্বল থাকায় এখানে একটি বড় ধরনের ফাঁক থেকে যাচ্ছে। সুতরাং ক্যামেরার মান নিয়ে প্রশ্ন এবং নিয়মিত মনিটরিং না করায় শহরজুরে স্থাপিত সিসি ক্যামেরাগুলো সৌন্দর্যবর্ধক উপকরণের বাইরে আর কিছু ভাবার কোন অবকাশ আপাতত দিচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে।
সমাজে অপরাধপ্রবণতা থাকবে, এটি একটি নির্মম বাস্তবতা। কিন্তু আসল কথা হলো রাষ্ট্রীয়ভাবে এই অপরাধ মোকাবিলায় একটি শক্ত প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি এই প্রতিরোধের বিষয়টিকে বহুমুখী কার্যকারিতা এনে দিয়েছে। এখন সঠিক মানের অভাব ও তদারকির দুর্বলতার কারণে যদি একটি প্রযুক্তির সুফল আমরা তুলতে না পারি সেটি নিতান্তই দুর্ভাগ্যজনক। সিসি ক্যামেরা নিয়ে যে প্রশ্নগুলোর সন্মুখিন হওয়া গেছে সেগুলো দূরিকরণে সকলে উদ্যোগী হবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।