- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

নিরীহ প্রশ্ন নয়, জটিল বটে- তরমুজের লাভ কারা খায়?

তরমুজের লাভ কারা খায়? জাতীয় দৈনিক সমকালের গতকালের একটি সংবাদ শিরোনাম। প্রতিবেদক তথ্য দিচ্ছেন, ক্ষেতে যে তরমুজ বিক্রি হয় ১০ টাকা কেজি সেই তরমুজ ঢাকায় ভোক্তা পর্যায়ের ক্রেতারা কিনছেন ৬০ টাকা কেজি দরে। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে লাভ ৫০ টাকা। প্রতিবেদক এই লাভের টাকা কোথায় যায় সেই প্রশ্নটি তুলেছেন, এর উত্তর জানারও চেষ্টা করেছেন। শেষ পর্যন্ত উত্তরটি বলে উঠতে পারেননি তিনি। তিনি আরেকটি প্রশ্ন তুলতে পারতেন। সেটি হলোÑ উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যায়ে আসতে একটি পণ্যে ঠিক কতটা লাভ করা গেলে তাকে সংগত বলা যাবে অথবা ঠিক কতটা লাভ করা যৌক্তিক? কৃষি বিপণন আইন ২০১৮ অনুসারে তরমুজের ক্ষেত্রে প্রতি কেজিতে ৩-৫ টাকার বেশি লাভ না করার বিধান আছে। বলা হয় উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যটি আসতে অন্তত তিনটি হাত ঘুরে। এদের লাভ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ঘাড়ে এসে পড়বে অর্থনীতির স্বতসিদ্ধ নিয়মানুসারে। আছে পরিবহণ খরচ (পথের চাঁদাবাজিসহ)। রয়েছে পচনযোগ্য ফলের নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি, এরও একটি আর্থিক হিসাব করতে হবেই। সবকিছু মিলিয়ে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাব মতে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি কেজি তরমুজ ২০ টাকার নিচে থাকার কথা। ২০ টাকা দরে বেচলেই সকল অংশীজনের যথেষ্ট পরিমাণ মুনাফা থাকে। কিন্তু ক্রেতারা তো কিনছেন ৬০ টাকা কেজিতে। যুক্তিসঙ্গত মুনাফার বাইরে প্রতি কেজিতে আরও অতিরিক্ত ৪০ টাকা বেশি নেয়া হচ্ছে। অর্থাৎ যুক্তিসঙ্গত (শেষ পর্যায়ে) মুনাফা যদি শতকরা ২০ শতাংশ হিসাবে ৩ টাকা হয়, ওই শেষ পর্যায়েই এর ১৪ গুণ বেশি মুনাফা নিয়ে নেয়া হচ্ছে। এই মুনাফা কে পায়? একেবারেই মৌলিক ও যথার্থ প্রশ্ন। নিশ্চয়ই শেষ ধাপের খুচরা ব্যবসায়ীটি এই পরিমাণ মুনাফা করতে পারেন না। তাহলে কে নেয় এই মুনাফা? পুঁজিবাদী অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম যারা বুঝেন তারা জানেন আগ্রাসী বাজার ব্যবস্থা তথা এর নিয়ন্ত্রকরাই এই বিশাল পরিমাণের মুনাফার অংক নিজেদের পকেটে ঢুকায়। বাজারের এই আগ্রাসী চরিত্রকে কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয় না। সরকার, আইন, প্রতিষ্ঠান সকলেই অক্ষম এদের উদগ্র মুনাফা-লোভের রাশ টেনে ধরতে। অথচ এই বাজার ব্যবস্থা নিয়ে কত গদগদ অবস্থা। মুক্তবাজার নামের বাহারী পরিচয় দিয়ে এর উপকারী দিকগুলো সামনে আনা হয়েছিল গত শতাব্দীর শেষ দিকে। যার পরিচয় আমরা নিত্যদিন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।
এই বাজারে ভোজ্য তেলের দাম বেড়ে যায় কোন কারণ ছাড়াই। পেঁয়াজের দাম বাড়ে, চালের দাম বাড়ে। এই দাম বাড়ার কোন কারণ থাকে না। কারও মর্জি হল, ঠিক সে-সময় থেকেই লাফ দিয়ে বাড়তে শুরু করে দ্রব্যমূল্য। এই মর্জিধারীর নাম সিন্ডিকেট। মূলত হাতে গোণা কযেকজনের সংঘবদ্ধ আগ্রাসী তৎপরতাই বাজারকে বেসামাল করে দেয় আর সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত উপার্জনকে অমানবিক হিং¯্রতায় নিজেদের পকেটে ঢুকিয়ে নেয়। এরা থাকে প্রতাপশালী, অর্থনীতিতে-রাজনীতিতে। সরকারের নীতিনির্ধারণী ব্যবস্থাকে এরা নিয়ন্ত্রণ করে। কখনও কেউ তাদের স্বার্থের জায়গায় প্রশ্ন তুললে এরা বাজারকে অচল করে দিবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। এই চরম শোষণমূলক বাজার ব্যবস্থা নিয়মিতই বিভিন্ন হুজুগ তৈরি করে কী পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেয় তার হিসাব সাধারণ মানুষ না জানলেও এর গরম আঁচ অনুভব করেন প্রত্যেকে। কিন্তু সমস্যা হলোÑ বাজারের ভোক্তারা সংগঠিত নয় বলে তারা এই অন্যায্যতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জারি করতে পারে না। ঠিক এ কারণেই তরমুজে ক্রয় মূল্যের ৫ গুণ বেশি মুনাফা করেও এরাই থাকে নমস্য এবং প্রভাবশালী।
আসল কথা হলোÑএই নিপীড়নমূলক বাজার ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, যা মূলত পুরো সমাজ পরিবর্তনের সাথে সম্পৃক্ত।

  • [১]