- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

নির্মাণকালেই ভেসে যায় সড়ক

বিশেষ প্রতিনিধি ও আকরাম উদ্দিন
হাওর বান্ধব ডিজাইন না করে কাজ করায় সুনামগঞ্জ শহরতলির ৩ কিলোমিটার গুরুতবপূর্ণ বাইপাস সড়কের কাজ ৩ বছরেও শেষ হয়নি। এবারের তিন দফার বন্যার পর বুঝাই যাচ্ছে না, এইখানে এক সড়কের কাজ হয়েছিল। সড়কটি হচ্ছে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের ছেকনিখাড়া থেকে ইসলামপুর-শান্তিগঞ্জ সড়ক। এই সড়কের কাজ শেষ না করায় ৮ গ্রামের মানুষ জেলা শহরের পাশে থেকেও বর্ষায় তিন কিলোমিটার নায়ে- হেমন্তে চলতে পায়ে। এলাকাবাসী জানান, লক্ষণশ্রী ও মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের ছেকনিখাড়া সেতু থেকে ইসলামপুর হয়ে রৌয়ারপাড়, কলাউড়া, নোয়াগাঁও, গোয়াচুরা, ইছাগড়ি ও শান্তিগঞ্জ বাজার পর্যন্ত মানুষের চলাচলের অন্যতম বাইপাস সড়ক এটি। এছাড়াও এই বাইপাস সড়ক হলে ওই দুই ইউনিয়নের মানুষ নিজেদের গ্রাম থেকে সুনামগঞ্জ- সিলেট মহাসড়কে ওঠতে ১৫ কিলোমিটার ঘুরতে হবে না।
এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠরা জানান, সদর উপজেলার লক্ষণশ্রী ইউনিয়ন ও মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের দেখার হাওর ও শিয়ালমারা হাওরের মাঝপথ দিয়ে ৫০ বছর আগে থেকে মাটির সড়কে মানুষ যাতায়াত করে আসছে।


২০১৭ সালে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা প্রকৌশল অফিস থেকে এই হাওরের পথ দিয়ে গ্রামীণ বাইপাস সড়ক নির্মাণের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়। ব্যয় ধরা হয় ৩ কিলোমিটারে ৩ কোটি টাকা। কিন্তু এর ডিজাইন হাওরবান্ধব হয় নি। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সড়কের কাজের টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে এই বছরের ২১ মার্চে ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তিপত্র করা হয়। ২২ তারিখ থেকে ঠিকাদার কাজ শুরু করে মে মাস পর্যন্ত কাজ করে। মে মাসে অকাল বন্যা হলে ঢেউয়ে-আপালে সড়ক ভাঙতে থাকে। ওই বন্যায়ই অপেক্ষাকৃত নিচু এই মাটির সড়কের অস্তিত্ব অনেকটা বিলীন হয়ে যায়। এলজিইডি’র উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সরেজমিনে দেখে সড়কটি হাওরবান্ধব হয়নি জানিয়ে কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। পরে তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী সড়কের কাজ বন্ধ রাখার জন্য চিঠি দেন। এরপর ২০১৮, ২০১৯ এবং সর্বশেষ তিন দফা বন্যায় এই সড়কের অস্তিত্ব বিলীন প্রায়।
সোমবার সরেজমিনে ছেকনিখাড়া গেলে এলাকার ইকবাল হোসেন, মেহেদী হাসান, হাবিবুর রহমান, কামরুল ইসলাম, রুবেল আহমদ, শাহজাহান মিয়া, আবু সুফিয়ান, আনোয়ারা বেগম, সালেহা বেগমসহ আরও অনেকে জানান, সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের ছেকনিখাড়া সেতু থেকে ইসলামপুর হয়ে রৌয়ারপাড়, কলাউড়া, নোয়াগাঁও, গোয়াচুরা, ইছাগড়ি ও শান্তিগঞ্জ এলাকার মানুষ চলাচলের অন্যতম বাইপাস সড়ক এটি। এই বাইপাস সড়ক দিয়ে আমবাড়ি বাজার পর্যন্ত চলাচল করা অতি সহজ। সড়কের কাজ শুরু হয়েছিল ৩ বছর আগে। কাজের নমুনা দেখে ঠিকাদারকে আমরা বাধা দিয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের কথা কেউ শুনেননি। পরবর্তীতে বন্যায় ভেঙে যায় পাকা সড়ক ও গার্ডওয়াল। অবশেষে বন্ধ হয় ঠিকাদারের কাজ। ক্রমান্বয়ে সড়ক নিশ্চিহৃ হয়েছে। এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার মানুষের যাতায়াত। এখন নৌকায় চলাচল করতে হয় সকলকে। দ্রুত এই সড়কের উন্নয়নের দাবি জানান এলাকাবাসী।
লক্ষণশ্রী ইউপি চেয়ারম্যান মো. আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, এই বাইপাস সড়কের কাজে অবহেলা আছে। এই কারণে চলাচলে মানুষের দুর্গতি বেড়েছে। শুরুতেই ডিজাইনে ভুল ছিল। পরে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন চলছে সড়কের কাজ হচ্ছে না। শহরের পূর্বদিকে পরিকল্পিত বাইপাস সড়ক হলে সড়কের পূর্ব এলাকার সৌন্দর্য বেড়ে যাবে। মানুষের যাতায়াত কষ্টও কমে যাবে।


সড়কের তৎকালীন ঠিকাদার মিলন কান্তি দে বলেন, ২০১৭ সালে ছেকনিখাড়া ইসলামপুর সড়কের জন্য ২ কোটি ৬৭ লাখ টাকার বরাদ্দ হয়। এলজিইডি’র ডিজাইন অনুযায়ী এই সড়কের কিছু অংশের কাজ শুরু করি। কাজ চলাকালীন সময়ে বন্যার পানিতে সড়কের সাইটের গার্ডওয়াল ভেঙে পড়ে। সড়কেরও বিভিন্ন অংশ ভেঙে যায়। এই খবর পেয়ে এলজিইডির উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরেজমিন পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনের সময় জানানো হয় সড়কের ডিজাইন হাওরবান্ধব হয়নি। কাজ বন্ধ করে দেওয়া। এখনো আমার বিল বকেয়া রয়েছে।
সদর উপজেলা এলজিইডি’র প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন বলেন, এই সড়কের আগের ডিজাইন বন্যাসহিষ্ণু বা হাওরবান্ধব ছিল না। ২০১৭ সালে করা ২ কিলোমিটার সড়কের গার্ডওয়াল ৩০০ মিটার নতুন সড়ক বন্যার ঢেউয়ে ভেঙে যায়। এরপর কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ঠিকাদারের ৫০ লাখ টাকার বিলের মধ্যে ২৫ লাখ টাকার মতো পরিশোধ হয়েছে। তাঁর আরও ২৩ লাখ টাকা দাবি রয়েছে। এই সড়কের জন্য ৬ কোটি টাকার প্রাক্কলন প্রস্তত করা হয়েছে। পুরোনো ঝামেলা মিঠেগেলে এবং নতুন প্রকল্প অনুমোদন হলে এই বাইপাস সড়কের কাজ করা যেতে পারে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক সম্প্রতি স্থানীয় সরকার মন্ত্রী, স্থানীয় সরকারের মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলীর নিকট আমবাড়ি- ছেকনিখাড়া বাইপাস সড়ক নির্মাণের জন্য অনুরোধপত্র পাঠিয়েছিলেন। পরে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর নির্দেশে একটি বিশেষজ্ঞ দল এই এলাকা পরিদর্শন করেও গেছেন। এই প্রক্রিয়ার এখন আর অগ্রগতি নেই বলে জানিয়েছেন এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ে কর্মরত একজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী।

  • [১]