- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই স্কুল ভবনে ত্রুটি-মন্দিরে পাঠদান

এনামুল হক এনি, ধর্মপাশা
বিদ্যালয়ের জরাজীর্ণ ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা করার পর শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম শুরু হয় বিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী একটি বাড়িতে। দুই বছর পর বিদ্যালয়ের জরাজীর্ণ ভবন ভেঙে শুরু হয় নতুন ভবন নির্মাণের কাজ। কেটে যায় আরও দুই বছর। গত কয়েক মাস ধরে কাজ বন্ধ থাকলেও দূর থেকে দেখে মনে হয় বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। কাছে যেতেই সেই ধারণা ভ্রান্ত হয়ে যায়। ভবন নির্মাণ সংশ্লিষ্টদের দাবি ভবন নির্মাণ কাজ এখনও শেষ হয়নি। চলতি বছরের শুরু থেকে এ বিদ্যালয়ের পাঠদান চলছে গ্রামের একটি মন্দিরে। ধর্মপাশা উপজেলার মধ্যনগর থানার বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নে দীর্ঘ চার বছর ধরে বিদ্যালয়ের বাইরে শিক্ষা কার্যক্রম চলতে থাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম দক্ষিণ উড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে এ বিদ্যালয়ের পুরাতন ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ দেখিয়ে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এরপর থেকে দক্ষিণ উড়া গ্রামের হরমুন সরকারের বাড়িতে পাঠদান কার্যক্রম শুরু হয়। চলতি বছরের শুরু থেকে হরমুন সরকারের বাড়িতে থেকে স্থানীয় শ্রী শ্রী রাধাগোবিন্দ্র মন্দিরে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম স্থানান্তর করা হয়। এ বিদ্যালয়ে ৪ জন শিক্ষক ও মোট ১৩৯ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। বৃহস্পতিবার বেলা ১২টায় সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, মন্দিরের রচনা’র (কীর্তন করার নির্ধারিত স্থান) পশ্চিম পাশে শিক্ষকেরা বসেছেন। পূর্ব পাশে তৃতীয়, উত্তর পাশে পঞ্চম ও দক্ষিণ পাশে রয়েছে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। মাত্র কয়েক গজের ব্যবধানে তিনটি শ্রেণির পাঠদান চলছে। দুইজন শিক্ষক দুই দিকে ফিরে পঞ্চম ও তৃতীয় শ্রেণির বিজ্ঞান ক্লাস নিচ্ছেন। অন্যদিকে চতুর্থ শ্রেণির বাংলা ক্লাস নিচ্ছেন একজন শিক্ষক। সকল শ্রেণির জন্য রয়েছে একটি মাত্র ব্ল্যাকবোর্ড। শিক্ষক শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের জন্য এখানে কোনো টয়লেট নেই। ফলে শিক্ষক কিংবা শিক্ষার্থীদের অনেক সময় বিপাকে পড়তে হয়। বিপাকে পড়তে হয় মন্দিরের পুরোহিতকেও। নিয়মিত মন্দিরের রচনায় পাঠদান চলায় ধর্মী আচার অনুষ্ঠানের বেঘাত ঘঠে।                      
পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র পরিতোষ তালুকদার ও পিয়াস রায় জানায়, একই সাথে তিনটি শ্রেণির পাঠদান চলাতে ক্লাসে মনযোগ থাকে না। ফলে তাদের পড়াশোনার মারাত্মক বেঘাত ঘটছে।
স্থানীয় বাসিন্দা বিপ্লব বিশ্বাস বলেন, ‘কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে বিদ্যালয়ের ভবনের কাজ দ্রুত শেষ করা উচিত।’
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের (এলজিইডি) পিডিবি-৩ এর আওতায় এ বিদ্যালয়ের তিন কক্ষ বিশিষ্ট একতলা ভবন নির্মাণের কাজটি পায় নাদির আহমেদ নামের একজন ঠিকাদার। যার নির্মাণ ব্যয় ৪৯ লাখ টাকা। ঠিকাদার যখন কাজ শুরু করেন তখন রমজানের ছুটিতে বিদ্যালয় বন্ধ ছিল। এই সুযোগে ঠিকাদার কাউকে কিছু না জানিয়ে তাঁর লোকজন দিয়ে পুরাতন ভবনটি ভেঙে নিয়ে যায় এমন দাবি বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির। নিয়ম অনুযায়ী বিদ্যালয়ের পুরাতন ভবনের মালামাল নিলামে বিক্রি হওয়ায় কথা। কিন্তু বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও প্রধান শিক্ষক জানালেন, কোনো নিলাম কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়নি। এমনকি তাঁরা এও জানতেন না যে, বিদ্যালয়ের পুরাতন ভবন নিলামে বিক্রি করার নিয়ম রয়েছে।
মন্দির থেকে নৌকায় করে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের ভবনের বারান্দায় ওঠার জন্য সিড়িটি ভেঙে গেছে। বারান্দায় পশ্চিম দিকে কিছু অংশ ভেঙে গেছে। স্থানীয়রা জানায়, ভবনের কাজ শুরু হওয়ার পর ঠিকাদার কোনোদিন সেখানে যায় নি। ভবন নির্মাণে নি¤œমানের উপকরণ ব্যবহার করার ফলেই নির্মাণ কাজ শেষ হওয়া আগেই ভবনটির বিভিন্ন জায়গা নষ্ট হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত বিদ্যালয়ের আসবাবপত্র সরবরাহ করা হয়নি। ফলে কবে এ বিদ্যালয়ে পুনরায় শিক্ষক শিক্ষার্থীরা ফিরতে পারবে তা এখনো বলা যাচ্ছে না।    
ঠিকাদার নাদির আহমেদ বলেন, ‘ম্যানেজিং কমিটির লোকজন বিদ্যালয়ের ভবন সরিয়ে দিয়ে কাজের সুযোগ করে দিয়েছে এবং ভবনের মালামাল গ্রামের মন্দিরে ব্যবহার করেছে। এটি নিচু ভূমির নকশায় তৈরি বিদ্যালয়। কিন্তু ওইখানে জায়গা উচু করে ভবন নির্মাণ করতে গিয়ে আমাকে অতিরিক্ত টাকা গুনতে হয়েছে।’
বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি প্রাণেশ চন্দ্র রায় বলেন, ‘কোনো মন্দিরের কাজে বিদ্যালয়ের ভবনের মালামাল ব্যবহার করা হয়নি এবং আমরা ভবন সরিয়ে কাজের সুযোগ করে দিয়েছি এমনটি সত্য নয়। ঠিকাদার মিথ্যাচার করছে। বরং ঠিকাদার যখন কাজ শুরু করেন তখন বিদ্যালয় রজমানের বন্ধ থাকায় পুরাতন ভবন ভেঙে কয়েক লাখ টাকা মালামাল সরিয়ে নেন।’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুকুমার চন্দ্র তালুকদার বলেন, ‘মন্দিরে ক্লাস নিতে গিয়ে খুব সমস্যা হয়। বৃষ্টি হলে শিক্ষার্থীরা বসতে পারেনা। পানিতে ভিজে যায়। ২০১৫ সালের জুন মাসে বিদ্যালয়ের ভবনের কাজ শুরু হয়ে এখন শেষ না হওয়ার বিষয়টি দুঃখজন। পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যালয়ের ভবনের কাজ শেষ করা উচিত।’
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রোকেয়া আক্তার খাতুন বলেন, ‘বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্লীপের টাকা দিয়ে অস্থায়ীভাবে একটি টিনশ্যাড ঘর করে দেওয়া হয়েছিল। এটি যে জায়গায় করা হয়েছিল সে জায়গার মালিক সেখানে একটি ঘর  তৈরি করেছেন। ফলে সেখানে আর ক্লাস নেওয়া যাচ্ছে না। দ্রুত বিদ্যালয়ের ভবনের কাজ শেষ করে, আসবাবপত্র দিয়ে তা বিদ্যালয়ের নিকট হস্তান্তর করার জন্য সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলবো।’   
বিদ্যালয় নির্মাণ কাজের তদারকির দায়িত্বে থাকা উপজেলা এলজিইডি’র সহকারি প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘মাস তিনেকের মধ্যে এর কাজ শেষ হতে পারে। চলতি কাজে কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি থাকতে পারে। যখন লেআউট দিয়েছি তখন এখানে কোনো ভবন ছিল না, ফ্রি ল্যান্ডের ওপর লেআউট দিয়েছি।’

  • [১]