সু.খবর ডেস্ক
শৈশব থেকে গাছকে ভালোবাসতেন তিনি। প্রকৃতির সঙ্গে মিশতে মিশতে এক সময় তার অনুধাবন হয় গাছ ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। সেই থেকে প্রকৃতি নিয়ে লেখালেখি। নিজে বাগান করতে লেগে যাওয়ার পাশাপাশি অন্যকেও এতে উৎসাহিত করা। যুক্ত ছিলেন পরিবেশ আন্দোলনের সঙ্গে। ‘তরু-পল্লব’ নামের একটি সংগঠনের মাধ্যমে মানুষকে ‘গাছ দেখা, গাছ চেনা’তে সাহায্য করতেন।
তিনি বলতেন, ‘প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে তাতে মানুষের জেতার কোনো সম্ভাবনা নেই। তাই আমাদের আরেকটি নতুন করে সভ্যতা গড়ে তুলতে হবে। যেখানে মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থান থাকবে।’ আহবান জানাতেন, ‘মানুষ, বৃক্ষের মতো আনত হও, হও সবুজ…।’
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক, লেখক ও গবেষক শামসুজ্জামান খান তার সম্পর্কে বলেছেন, তিনি আমাদের অনেক অজ্ঞতা দূর করেছেন। মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থান চাওয়া সেই মহীরুহর নাম দ্বিজেন শর্মা। শুক্রবার ভোর ৩টা ৫৫ মিনিটে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই নিসর্গবিদ ও লেখক। দ্বিজেন শর্মা ছিলেন
॥একাধারে একজন প্রকৃতিবিদ, জীববিজ্ঞানী, বিজ্ঞান লেখক, অনুবাদক, শিক্ষক। পরিবেশ ও প্রকৃতি নিয়ে কাজ করছেন দীর্ঘদিন ধরে।
১৯২৯ সালের ২৯ মে মৌলভীবাজারের বড়লেখা থানার শিমুলিয়া গ্রামে জন্ম দ্বিজেন শর্মার। তার বাবা চন্দ্রকান্ত শর্মা গ্রাম্য কবিরাজ ছিলেন। মায়ের মগ্নময়ী দেবী ছিলেন সমাজসেবী হিসেবে পরিচিত।
বাবা কবিরাজ ছিলেন বলে শৈশবে নিজ বাড়িতেই নানা লতা-পাতা ও বৃক্ষের সঙ্গে পরিচয়। বেড়ে উঠেছেন গ্রামীণ নিসর্গের মধ্যে। গ্রামের পাঠশালায় পড়ালেখার হাতেখড়ির পর করিমগঞ্জ পাবলিক হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন।
ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতির প্রতি পক্ষপাত ছিল দ্বিজেন শর্মার। গাছপালা তাকে আকৃষ্ট বলে কলকাতা সিটি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন।
পড়াশোনা শেষ করে ১৯৫৮ সালে বরিশালের ব্রজমোহন কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬২ সাল পর্যন্ত সেখানেই কর্মরত ছিলেন। এরপর ঢাকাস্থ নটরডেম কলেজে শিক্ষকতার শুরু তার। ১৯৭৪ সালে সোভিয়েত প্রকাশনা সংস্থা ‘প্রগতি’তে অনুবাদকের চাকরি নিয়ে মস্কো চলে যান। চল্লিশটিরও বেশি বই অনুবাদ করেছেন দ্বিজেন শর্মা। ১৯৯১ সালে রাশিয়া থেকে ফিরে আসেন দেশে।
বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে তার পরোক্ষ সংযোগ ছিল। এ কারণে আত্মগোপনেও ছিলেন কিছুকাল। করতে হয়েছে কারাবাসও, যাকে দুর্লভ সৌভাগ্য বলে মনে করতেন তিনি। সমাজতন্ত্র সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল পুঁজিবাদি বিশ্বের সোভিয়েত গবেষকদের থেকে ভিন্ন। এসব বিষয়ে তার বেশ কিছু নিবন্ধ ও স্কেচধর্মী লেখা রয়েছে।
দ্বিজেন শর্মার একইসঙ্গে ছিলো চমৎকার শিল্পবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি। ব্যক্তিগত জীবনে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভক্ত এই নিসর্গবিদ সুন্দরের অন্বেষণকে চিরজীবনের আকাক্সক্ষা করে নিয়েছিলেন। পছন্দ করতেন তরুণদের সঙ্গে আড্ডা দিতে।
স্ত্রী ড. দেবী শর্মা ছিলেন ঢাকার সেন্ট্রাল উইমেনস কলেজের দর্শনের অধ্যাপিকা। ১৯৬০ সালে বরিশালে দেবীর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। তার ছেলে ডা. সুমিত শর্মা মস্কোতে থাকেন। একমাত্র মেয়ে শ্রেয়সী শর্মা।
নিসর্গ নিয়ে লেখালেখি ও অনুবাদের পাশাপাশি মৌলিক সাহিত্য কর্মেও সিদ্ধহস্ত ছিলেন দ্বিজেন শর্মা। ১৯৪৯ সালে আইএসসি শেষবর্ষের ছাত্র থাকাবস্থায় একটি গল্প লেখার মধ্য দিয়ে লেখালেখির ভুবনে প্রবেশ তার। সেই গল্প কলেজ বার্ষিকীতে ছাপা হয়েছিল। এরপর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের একাধিক দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীতে তার লেখা গল্প ছাপা হয়।
দ্বিজেন শর্মার প্রকাশিত গ্রন্থগুলো হলো- শ্যামলী নিসর্গ, সপুষ্পক উদ্ভিদের শ্রেণি বিন্যাস, ফুলগুলি যেন কথা, গাছের কথা ফুলের কথা, এমি নামের দুরন্ত মেয়েটি, নিসর্গ নির্মাণ ও নান্দনিক ভাবনা, বিজ্ঞান ও শিক্ষা: দায়বদ্ধতার নিরিখ, ডারউইন ও প্রজাতির উৎপত্তি, সতীর্থ বলয়ে ডারইউন, সমাজতন্ত্রে বসবাস, জীবনের শেষ নেই, বিগল যাত্রীর ভ্রমণ কথা, গহন কোন বনের ধারে, হিমালয়ের উদ্ভিদরাজ্যে ডালটন হুকার, বাংলার বৃক্ষ, মম দুঃখের সাধন, আমার একাত্তর ও অন্যান্য।
কাজের স্বীকৃতি হিসেবে বহু পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন দ্বিজেন শর্মা। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ড. কুদরত-এ খুদা স্বর্ণপদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, এম নুরুল কাদের শিশু সাহিত্য পুরস্কার ও চ্যানেল আই প্রবর্তিত প্রকৃতি সংরক্ষণ পদক। ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য পেয়েছেন সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদক।
ছাত্র ইউনিয়নের শোক প্রকাশ
দ্বিজেন শর্ম্মার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে জেলা ছাত্র ইউনিয়ন। শুক্রবার জেলা ছাত্র ইউনিয়নের এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়। জেলা ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষে সভাপতি তারেক চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক পুলক তালুকদার শোক প্রকাশ করেন।