বিশেষ প্রতিনিধি
অসিম দাস সুনামগঞ্জ শহরের শহীদ আবুল হোসেন রোড থেকে প্রতিদিনই সকালে রিক্সায় করে পুরাতন বাসস্টেশনে অফিসে আসেন। সোমবার সকালে নিজের মহল্লা থেকে বাসস্টেশনে এসে অফিসের গলি দিয়ে ঢোকার সময় তাকে বহনকারী রিক্সার এক চাকা বসে গেলে উল্টে মাটিতে পড়ে পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা পেলেন তিনি।
রমিজ উদ্দিন পুরাতন বাসস্টেশন থেকে রিক্সায় হাসপাতাল যাচ্ছিলেন, হাসননগর সিভিল সার্জন অফিসের আগে রিক্সা মোড় নেবার সময় উল্টে গেল রিক্সাটি। সোমবার দুপুরের ঘটনা এটি।
শহরের নতুনপাড়ার বাসিন্দা রূপক, জয়, টিটু সোমবার দুপুরে এই প্রতিবেদককে বললেন, রিক্সাওয়ালাদের কয়েক বছর আগের যে রূপ ছিল গেল কয়েক দিন হয়, সেই রূপে দেখা যাচ্ছে। ১০ টাকার ভাড়া ২০ টাকা চাচ্ছে তারা। ডাকলে সাড়া না দেওয়াসহ খারাপ ব্যবহার বেড়েছে।
সুনামগঞ্জ শহর বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাসরীন আক্তার খানম বললেন, রিক্সাভাড়া গত কয়েকদিন হয় দ্বিগুণ বেড়েছে, যার কাছ থেকে যা পারে নিচ্ছে রিক্সাওয়ালারা, ব্যবহারও খারাপ করছে। অটোরিক্সা বন্ধ হবার পর এই যন্ত্রণা বাড়ছে। অটোরিক্সা বন্ধ করার আগে বিকল্প যান, এমনকি রিক্সাও বাড়ানো যেত।
প্রান্তিক শহর সুনামগঞ্জে আদালতের আদেশে অটোরিক্সা বন্ধের পর রিক্সা চালকদের এমন হয়রানি বেড়েছে বললেন শহরের নতুনপাড়ার বাসিন্দা কবি কুমার সৌরভ। গত কয়েকদিন হয় শত শত ভাঙা, পুরোনো রিক্সা নিয়ে আনকোড়া চালকরা ঘুরছে শহরে। এ কারণে পথে পথে দুর্ঘটনা, দুব্যবহার বেড়েছে।
শহর ঘুরে দেখা গেছে, কোনো কোনো রিক্সার সিট, উড ফ্রেম ভাল নয়, বেল নষ্ট। নয়া মুখের বহু চালক এইসব রিক্সা নিয়ে যাত্রী বহন করছে। নি¤œআয়ের যাত্রীরা এ কারণে বিপাকে পড়েছেন। দ্বিগুণের চেয়ে বেশি ভাড়া দিয়েও সময়মত গন্তব্যে পৌঁছা সম্ভব হচ্ছে না। রিক্সায় উঠার পর যখন প্যাডেল ঘুরে না, চাকা টাল থাকে, সিটের অবস্থা খারাপ, উড ভাল নয়, তখনই যাত্রী-চালকের মধ্যে শুরু হয় ঝগড়া। রিক্সার সিটে জমে থাকা পানিতে প্যান্ট ভিজে, উডের পুরাতন আলপিনে মাথা বা হাতে জখম হয়, জামা-কাপড় ছিঁড়ে যায়, নানা কারণে ত্যক্ত বিরক্ত হচ্ছেন যাত্রীরা।
একাধিক যাত্রী জানান, চালকদের নিজের খেয়াল-খুশিমতো পছন্দের যাত্রী নিয়ে গত কয়েক দিন হয় বহন করেন রিক্সায়। যারা শহরের বাসিন্দা বা চাকুরিজীবী, এসব যাত্রীর কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া চাইলেও পাবে না, তাদের বেলায় ‘টিপ লাগাইল’ বলে চলে যাচ্ছেন চালকরা। বিশেষ করে গ্রামের মহিলা ও বয়স্ক পুরুষদের রিক্সায় বহন করতে আগ্রহী চালকেরা। কারণ এদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা সহজ।
সুনামগঞ্জ শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা নদীর উত্তরপাড়ের কামারগাঁওয়ের রিক্সা চালক সাজিদ উল্লাহ বললেন, সকাল ৯ টা থেকে শহরের বিভিন্ন স্থানে রিক্সা চালানো শুরু করেছি। এখন বেলা ১১ টা বেজেছে। আমার রুজি হয়েছে প্রায় ২শ’ ৫০ টাকা। রিক্সা পুরাতন। রিক্সা ভাঙা, না হয় এসময়ে রোজগার আরও বেশি হতো।
রিক্সাচালক শহরতলির বালিকান্দি গ্রামের শুকুর আলী বললেন, আগে অটো রিক্সা চালাতেন, এখন রিক্সা চালাচ্ছেন, গ্যারেজ মালিকরা পুরাতন ভাঙা রিক্সা না দিলে রোজগার অটো রিক্সার মতোই করতে পারতেন তিনি।
শহরের পুরাতন কোর্টের রিক্সা গ্যারেজের মালিক আব্দুল আলী বললেন, এতোদিন ব্যবসা মন্দা ছিল। কয়েকদিন হয় রিক্সার চাহিদা বেড়েছে। তার ৩০ টি রিক্সার মধ্যে ২০ টি ভালো, ১০ টি চালানোর অনুপযোগী ছিলো। ১০-১২ দিন আগেও ১৫ টির বেশি রিক্সা ভাড়ায় যেতো না। এখন ভালো ২০ টি রিক্সাতো ভাড়া যাচ্ছেই। খারাপগুলোও যাচ্ছে। অটো চালক, ইটভাটা শ্রমিকরা এখন নতুন করে রিক্সা চালাতে আসছে। আনকোড়া চালকদের তিনি রিক্সা দিচ্ছেন না বলে দাবি করেন এই গ্যারেজ মালিক।
রিক্সা শ্রমিক সংঘের সভাপতি সোহেল আহমদ বললেন, প্রত্যেক গ্যারেজ মালিকের উচিৎ ভালো রিক্সা ও ব্যবহারে ভালো দক্ষ চালকদের রিক্সা ভাড়া দেওয়া। সড়কে চলার অনুপযোগী রিক্সা ভাড়ায় দিলে, দুর্ঘটনায় গ্যারেজ মালিকরাই দায়ি থাকবেন।
অ্যাড. নুর হোসেন বললেন, পৌর কর্তৃপক্ষ শহওে ভাড়ার হার নির্ধারণ করেন নি। শহরের কোথায়, কত ভাড়া নির্ধারণ করে দর্শনীয় স্থানে ভাড়া বোর্ড লাগানো জরুরি।
আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাড. বুরহান উদ্দিন বললেন, শহরে রিক্সায় চলাচল এক ভোগান্তির নাম। ভাড়াও বেশি, সময়ও লাগে বেশি। রিক্সাচালকের আচার-আচরণও ভাল নয়। মানুষ অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে অটোরিক্সায় চলাচলে। এটা বন্ধ হওয়ার পর নি¤œআয়ের মানুষ ভাড়া নিয়ে সমস্যায় আছেন।
জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক অ্যাড. নুরে আলম সিদ্দিকী উজ্জ্বল বলেন, মানুষ অটোরিক্সায় চলতে চলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। হঠাৎ অটোরিক্সা বন্ধ হওয়ায় চালকেরা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। শহরে পুরাতন রিক্সা চলছে কিন্তু পর্যাপ্ত নয়। রিক্সা একটু উঁচু থাকায় বয়স্করা উঠতে পারেন না। শিক্ষার্থীরা এবং চাকুরিজীবীরা সময়মত আসা-যাওয়া করতে পারেন না। সকল শ্রেণী পেশার মানুষ ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নাদের বখ্ত বললেন, রিক্সা ভাড়া নির্ধারণ করে ভাড়া বোর্ড স্থানে স্থানে লাগানো আছে। অপ্রাপ্ত ও অদক্ষ চালকরা যাতে শহরের প্রধান সড়ক দিয়ে রিক্সা চালাতে না পারে, সেজন্য অভিযান চালানো হবে। শহরে রিক্সা ভাড়া’র হারের প্রচারও বাড়ানো হবে। যাত্রী হয়রানি রোধে পৌরসভা কঠোর হবে।
প্রসঙ্গত, গত ৪ মাস ধরে উচ্চ আদালতের নির্দেশে সুনামগঞ্জ শহরে প্রায় সাড়ে চারশত অটোরিক্সা চলাচল বন্ধ রেখেছে সুনামগঞ্জ পৌর কর্তৃপক্ষ।