- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

নৈসর্গিক ঘরকলজিক কবি : মোহাম্মদ সাদিক- জলজ্যোৎস্নার কালিদহ চরের স্বপ্নবাজ

ইকবাল কাগজী
যে-কোনও দিন কেউ কেউ আসে বদ্ধ জন্মদ্বার খোলে। দক্ষিণর্প্বূ এশিয়ার পূর্বদেশ, এই বাংলাদেশে, ধারারগাঁয়ের মতো কোনও এক গ্রামে নামকরণের কী দারুণ মচ্ছব বসে। পাড়াপড়শির সমাহারে জেগে উঠে গ্রামীণ সংস্কৃতি। প্রতিনিয়ত এমন জম্পেশ আসর জমে জমে একেবারে ক্ষীর হয়, জলজ্যোৎস্নার বিরল বিকিরণে স্নাত সবুজশ্যামলিমশান্ত বনতলে। রাম-রহিম কিংবা যদু-মধুদের কলরবে মুখরিত হয় সুরমা নামের কোনও এক তটিনীর তীর। তারা দলে দলে আসে, কালে কালে মিছিলের অপরূপ সজ্জায়, জলজঙ্গল পেরনো উদ্বাস্তু রোহিঙ্গার ক্লান্ত দঙ্গলের মতো। মহাজীবনের প্রান্তরে মানুষ-মানুষীরা পায়ের ছাপ এঁকে এঁকে পথমাপে পেরিয়ে কালান্তরের সেতু। কী অদ্ভুত, জবর কৌশল জানে তারা। ভেতরে এক আয়নামহলে জমা করে রাখে নিরন্তর জল, ঝড়, বজ্র, আফালের ঢেউ, নদীর ডহর, পায়ে চলা পথের নির্জনে পাতার মর্মর, লিলুয়া বাতাস, শ্যাওলার সবুজ চিহ্ন, হাওরে ভাঙা নৌকা, নক্ষত্রের ভাঙা বাড়ি,  রঙধনু, পাখির ডানার স্বরলিপি, শিশির সকাল, কুড়া কিংবা ডাহুকের ডাক, নীল আকাশে উড়ন্ত চিলের ছায়া, বাবনবাশ্শার মৎস্য শিকার, সাফাত শাহের লাঠি কিংবা কৃষক বাবার হুক্কা, রাতের চন্দ্রাহত গাঁওদেশের হিজল-করচের বনে পাতার তলে পাখির সংসার, সমস্ত শব্দের যাদুবাস্তবতার অনুপুঙ্খ মূর্তবিকিরণ, কামক্ষুধায় তাড়িত মানবমানবীর সুখদুঃখের গল্পগাছা ইত্যাদি অগুন্তি মানুষের সুখদুঃখ প্রলম্বিত ইতিহাস। এইসব মিলেমিশে কর্পোরেট পুঁজির পতাকার তলে জীবনানন্দীয় অদ্ভূত আঁধার জমে সেই আয়নার হাজারদোয়ারী মহলে। এই অদ্ভূত আয়নার অধিকারী যে-কোনও মানুষ মানুষীই। কিন্তু তারা সকলেই সেই আয়নায় বাইরের পৃথিবীর প্রতিফলন জমা করে রাখে কেবল, সে প্রতিফলনকে চিত্রকল্প করে তুলে শিল্পপ্রসবে পারঙ্গম হতে পারে না, কালনীর কূলের ছেলে শাহ করিম হয় না, হয়ে যায় না নজরুল কিংবা জীবনানন্দ, যেমন কেউ কেউ হয়ে যায় মোহাম্মদ সাদিক।
সাদিকেরা জন্ম নেয় সাধারণ মানুষ হয়ে, তারপর কেরমে কেরমে হয়ে যায় কবি, ‘কবিতা লিখিনি আজো/ তবু কবিতার জন্য এই ছটফট প্রাণ’ হয়ে পড়ে গড়পরতা মানুষের মধ্যেই অন্যরকমের মানুষ অসাধারণ। এই অসাধারণ সাদিকের জন্ম  গতশতকের ১৯৫৫ সালের ৫ অক্টোবর, সুনামগঞ্জের অদূরে ধারারগাঁয়ে। অনতিতরুণ বেলায় জলজ্যোৎস্নার শহর সুনামগঞ্জের অলিগলিতে ঘোরলাগা চক্কর। কোনও এক কিশোরীর প্রেমে পড়া। লেখাপড়ার ফাঁকফুঁকড়ে কবিবন্ধুদের নিয়ে শত শত দিনের জম্পেশ আড্ডা, লঞ্চঘাটে সহস্র রজনীর নিশিযাপনের নেশায় মধুর মগ্নতা। কী মশগুল আর মশহুর সেই সব দিনে কবিতার পানসিতে চরে জলবতী সুরমা সুন্দরীর প্রেমে মাতাল হয়ে বজরা বাসানো, প্রিয়তমা কবিতার সঙ্গে সে এক অবাক জলযাত্রা। কবিতা সাকির পরিবেশিত সুরা আকণ্ঠ পান করে নিমগ্ন থাকা ‘দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী’। মৌতাত লাগা জীবনের কী অপরূপ এক চিত্রকল্প। জীবন এমন বিখ্যাত হয়ে উঠবে না আর কখনও, বোধ করি কোনও জন্মেই না।  
অথবা বাসস্ট্যান্ডের জালাল আর জালালের বিখ্যাত একত্রিশ নম্বরে সে আর এক সাদিক। তখন তিনি এক বেসরকারী কলেজ গোবিনগঞ্জে পড়ান। অথচ বাড়ি থেকে গোবিনগঞ্জ যাবেন বলে বেরিয়ে বাসস্ট্যান্ডে এসেই কলেজ কামাই। অধ্যাপকীয়পনা শিকেয় তুলে রেখে একত্রিশে হামলে পড়ে জম্পেশ আড্ডার চক্কর। একটি আবাসিক হোটেলের একটি কক্ষ কী করে যে কবিতা আর নাটকের আতুর ঘর হয়ে উঠে, সে রহস্যকথা সাদিক ছাড়া কারও জানার সাধ্য নেই। অন্তরের একান্তে বাউল বুহেমিয়ান সাদিক পারেনও বটে। একটি হোটেল কক্ষকে  কাব্যলক্ষ্মীর ফুলশয্যা করে তুলা কেবল একজন কবিরই স্বাধিকার হতে পারে, আর কারও নয়। এখানেই তিনি গোলাম রাব্বির ঔরসে জন্ম নেওয়া বিখ্যাত নাটক ‘সুমতির মুখে সেফটিটিন’ এর সুনিপুণ ধাত্রীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন।
‘আসমান ভাইংগ্যা জোছনা পড়ে’ রাতে কালিদহ চরের শহর সুনামগঞ্জে বাউন্ডুলে ঘুরাঘুরি সে আর এক অভিনব জীবন পরিক্রমা। রাতভর ঘুরাঘুরি। লঞ্চঘাটে বসে আড্ডা, কবিতা পাঠ, চা, সিঙ্গারা, সিগারেট। আহা কী বিন্দাস সে সময়।  আজকাল এমনটা হবার নয়। নির্ঘাত চৌদ্দ শিকের ভেতরের বাসিন্দা হয়ে পড়তে হবে।  সাদিক, মুতাসিম,    
আশরাফ, মউজদীন, রাব্বি কিংবা কাগজীর আঙ্গুলে আঙ্গুল সেলাই। তারপর হতেই জলজ্যোৎ¯œার দেশের নৈসর্গিক ঘরকলজিক ও ভবিষ্যতের জলস্নিগ্ধশান্ত জীবনের স্বপ্নবাজ এই মানুষটি নিজের জবানীতে তিনি, ‘এইসব জল নিয়ে টলমল আমি’ হয়ে আছেন, লোকেলাখে যাঁকে জানে একজন বাঙলাদেশ সিভিল সার্ভিস প্রশাসনের ক্যাডার সদস্য বলে এবং তিনি বর্তমানে কর্মরত বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান পদে। তাঁর এই পরিচিতির উর্ধে  তাঁর আর একটি পরিচিতি আছে। এখানে সেই পরিচিতিটি তুলে ধরা কর্তব্য বলে মনে করি। এক কবিতায় তিনি বলেছেন, ‘চাঁদের গাঁয়ে চাঁদ লেগেছে, আজ ঘরে ঘরে কবিতা হবে, কবিতা/ আজ জোছনায় মাটিতে নামবেন/ রাত জেগে বসে থাকো কবিতার সঙ্গে দেখা হবে/ বাতি নিভিয়ে বসে থাকো কবিতার সঙ্গে দেখা হবে/ পাড়া পড়শির ঘুম নাই কবিতা আসবেন/ আজ কবিতার জন্মদিন। আজ কবিতা আসবেন।’ মনে হয় কবিতার এই কতিপয় পংক্তিতেই তাঁর প্রকৃত পরিচিতি পল্লবিত হয়েছে।  
আজ, ৫ অক্টোবর, কবি মোহাম্মদ সাদিকের জন্মদিন, ‘আজ কবিতার জন্মদিন’। সুনামগঞ্জের জলজ্যোৎস্নার কবির জন্মদিন, ‘আজ ঘরে ঘরে কবিতা হবে’। আজ জলসবুজের শহর সুনামগঞ্জের মনের দোয়ার খোলা, আজ আয়নামহলে মাধবী আসরে বাতি নিভিয়ে চন্দ্রাহত রাতে কাব্যলোকের ‘টুয়াবাতি’ উদযাপিত হবে, আর  আন্তর্জালে ‘স্বপ্ন ছিলো চন্দনের বনে/ পৃথিবীর সব স্বৈরাচার শেষ হয়ে যাবে, … ।’  চিত্রকল্পের সুরে বাজতেই থাকবে, বাজতেই থাকবে, বাজতেই …।  

  • [১]