বর্তমানে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, গণতান্ত্রিক সরকার ও বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা যেভাবে রোহিঙ্গাদের দেশ থেকে বিতারণ করছে তার একটি ডেমো সংস্করণের মঞ্চায়ন দেখলাম আমরা সম্প্রতি তাহিরপুর উপজেলার একটি গ্রামে। তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের নোয়ানগর গ্রামে আলী আকবর ও হাফিজউদ্দিন গ্রুপের মধ্যে সংঘটিত একটি সংঘর্ষের জের ধরে হাফিজ উদ্দিন গ্রুপের ৫০ পরিবার গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয়েছে বলে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে গত মঙ্গলবার সংবাদ প্রকাশ হয়। ওই সংবাদ প্রকাশের পর স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে অন্তত ২০টি পরিবার পুনরায় গ্রামে ফিরে এসেছে বলে বুধবারের পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন গ্রামছাড়া পরিবারগুলোকে গ্রামে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন, পাশাপাশি বিষয়টির নিষ্পত্তির লক্ষ্যে তারা বেশ কিছু পদক্ষেপও গ্রহণ করেছেন। একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের শেষে বাংলাদেশের কোন গ্রামে এমন মধ্যযুগীয় কাজকারবার দেখে আমরা হতভম্ব হয়ে পড়ি। এই ঘটনা প্রমাণ করে শক্তিমানদের দাপটের কাছে আজও আমাদের গ্রামীণ সমাজ কতোটা অসহায়। দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়ন ও নোয়ানগর গ্রাম ভৌগোলিকভাবে হাওরবর্তী একটি বিচ্ছিন্ন জনপদ। উপজেলা সদর থেকে যাতায়াত বেশ কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার এই সুযোগ নিয়ে গ্রামটিতে যে এখনও সামন্ত-সমাজব্যবস্থার মতো কিছু বিষয় কায়েম রয়েছে দুইটি পক্ষের সংঘর্ষ ও এর জের ধরে কিছু পরিবারের গ্রাম ছাড়ার বিষয়টি তার প্রমাণ। মূলত আমাদের সমাজকাঠামোর সর্বত্রই এই ধরনের শক্তিধরদের প্রাধান্য বজায় রয়েছে। বরং বলা বোধ করি সংগত হবে যে, সারা পৃথিবীর বৈশিষ্ট্যটি এরকমই, নানা রকমফের নিয়ে হলেও। এই কলামের শুরুতেই রোহিঙ্গা ইস্যুর সাথে নোয়ানগর গ্রামের ঘটনার তুলনা টানার উদ্দেশ্য হলো, বিশ্বব্যাপী মানবতার ভুলুণ্ঠনের বিষয়টিকে সামনে আনা। নোয়ানগর গ্রামের যে পরিবারগুলো ভয়ে গ্রাম ছেড়েছিলো তারা যদি প্রতিপক্ষের চাইতে শক্তি-সামর্থ্যে বড় হতো তাহলে এখানে উল্টো ঘটনা ঘটত। এই যে শক্তিনির্ভর সামাজিক ব্যবস্থা, এর অবসানকল্পে পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত ইতিহাসের নানা পর্বে বহু মানুষ বহুভাবে চেষ্টা করে গেছেন। কিন্তু আমরা যে এখনও সেই প্রত্যাশিত মানবিক পৃথিবী রচনা করতে পারি নি, মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশে রোহিঙ্গা দলন ও তাহিরপুরের নোয়ানগরে কিছু পরিবারের গ্রাম ছাড়ার ঘটনা তার পক্ষে স্বাক্ষ্য দেয়।
নোয়ানগরের মানুষের মধ্যে যে গোষ্ঠীতান্ত্রিক অন্ধ আনুগত্য লক্ষ করা যায় সেটি কখনও একটি সমাজকে সামনের দিকে নিয়ে যেতে পারবে না। এ ধরনের প্রশ্নহীন আনুগত্য ব্যক্তির স্বাতন্ত্রতাকে বিনষ্ট করে, তাকে করে তোলে মানুষের পরিবর্তে ভিন্ন কিছু। শিক্ষায়, বিজ্ঞানে, প্রাযুক্তিক উৎকর্ষতায় বিষ্ময়কর উন্নয়ন সত্বেও এই মানবিক অন্ধত্ব বিশ্বপ্রগতির একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। স্থানীয় প্রশাসন নিজেদের মত করে এর সমাধান খুঁজছেন, এর বাইরে যাওয়ার কোন উপায় তাঁদের নেইও, এর মধ্য দিয়ে গ্রামছাড়া ৫০ পরিবার যদি ফিরে আসে স্বভূমে, তাহলে এটুকুই হবে আপাতত স্বস্তি। এই ফিরে আসাদের এবং যাদের ভয়ে তারা গ্রাম ছেড়েছিল, সকলের ভিতর মানবিকতা জাগিয়ে তোলার যে কঠিন কাজ সেটি এই আর্থসামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সম্ভব নয়, সেজন্য দরকার মানুষের চিন্তায় মনুষ্যত্বের আলোকপ্রক্ষেপণ। আমরা উজ্জ্বল সেই আলোর অপেক্ষায়ই বরং আশাবাদী হই।