বর্তমান সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালনে অভূতপূর্ব সফলতা দেখাতে সক্ষম হয়েছিলো যা আগের সরকারগুলোর যাবতীয় অগ্রগতিকে অনেক পেছনে ফেলে দেয়। ২০০৯ সনে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ছিলো যেখানে ৪ হাজার ৯ শত বিয়াল্লিশ মেগাওয়াট সেখানে বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৬ হাজার পাঁচ শত পঞ্চাশ মেগাওয়াট। ২০০৯ সনে সঞ্চালন লাইন ৮ হাজার সা.কি.মি. থেকে বেড়ে বর্তমানে ১৪ হাজার ৬ শত বাহাত্তর সা.কি.মি. এ উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ দেশের ভঙ্গুর বিদ্যুৎ ব্যবস্থকে একটি ভালো ও গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে নিয়ে আসতে এই সরকার ব্যাপক সফলতা দেখাতে সক্ষম হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ও পরিধি বাড়ার কারণে দেশের প্রায় সকল জনগোষ্ঠী যেমন বিদুুৎ ব্যবহারের আওতায় আসতে পেরেছে তেমনি দেশে ঘটেছে ব্যাপক শিল্পায়ন। বাংলাদেশের বিস্ময়কর অর্থনৈতিক উন্নয়নের পিছনে বিদ্যুতের এই উত্তম সরবরাহ ব্যবস্থা অন্যতম অনুঘটকের ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু গতবছর থেকে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা যেন আবার উল্টো হাঁটা শুরু করেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানী তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটের কারণে দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো উৎপাদন হ্রাস করতে বাধ্য হয়। বন্ধ করে দেয়া হয় জ্বালানী নির্ভর অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র। বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণে পতন ঘটতে থাকে। এ কারণে ২০২২ সনে আমরা এক ভয়াবহ গ্রীস্ম মৌসুম অতিবাহিত করেছি। চরম লোডসেডিংয়ে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিলো। শীতে এই অবস্থার কিছু উন্নয়ন ঘটে সংগত কারণেই, কারণ এ সময়ে বিদ্যুৎ ব্যবহারের চাহিদা গ্রীস্মের তুলনায় অনেক কমে যায়। কিন্তু ২০২৩ সনের গ্রীস্ম মৌসুম শুরু হতেই গতবছরের মতো সংকট পুনরায় শুরু হতে চলেছে বলে আমরা দেখতে পাচ্ছি।
বিদ্যুৎ উৎপাদন সংকটের সাথে এই দুরবস্থায় যুক্ত হয়েছে ত্রুটিপূর্ণ সঞ্চালন লাইন ও রক্ষণাবেক্ষণের ত্রুটি। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, বুধবার বিকালে কালবৈশাখির ছোট এক ঝড়ের কারণে বিদ্যুতের সঞ্চালন ব্যবস্থায় বিপর্যয় তৈরি হওয়ায় জেলা সদরসহ বিভিন্ন উপজেলা তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিলো। এসময় ইন্টারনেট সেবাও বন্ধ হয়ে পড়ে। ইদানীং আমরা লক্ষ করি, সামান্য ঝড়-বাতাস কিংবা বজ্র-বৃষ্টি হলেই বিদ্যুৎ চলে যায়। ঝড়-বৃষ্টি থামলেও কখন বিদ্যুৎ আসবে তা কেউ বলতে পারেন না। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যতীত রয়েছে নিয়মিত লোডসেডিং যা আদতে কোনো পরিকল্পনার আওতায় পরিচালিত হতে আমরা দেখি না। এরকম এক নড়বড়ে বিদ্যুৎকাঠামোর আওতায় সারা দেশের মতো এই জেলার মানুষও সার্বক্ষণিক বিপত্তিতে রয়েছেন। এর আশু অবসান হওয়া কাম্য। আমরা মনে করি সঞ্চালন লাইনগুলো যদি বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের নিয়মিত নজরদারিতে রাখা হয় তাহলে হঠাৎ করে কোথাও সমস্যা তৈরি করতে পারত না। অটোমেটেড সিস্টেমের কারণে লাইনের বিপত্তি এখন কন্ট্রোলরুমে বসেই সনাক্ত করা সম্ভব। তড়িৎ উদ্যোগ নিয়ে সহজেই যা সারিয়ে তোলা যায়। তবে এ ক্ষেত্রে জনবল সংকটের বিষয়টি দূর করা আবশ্যক বলে আমরা মনে করি।
এই সময়ে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় একটি সেকেন্ডও কাটাতে রাজী নয় মানুষ। বিদ্যুৎ না থাকার অর্থ হলো সমস্ত কাজ থেমে যাওয়া। অর্থাৎ উন্নয়নকে থমকে দেয়া, পিছিয়ে দেয়া সর্বোপরি পিছনের দিকে নিয়ে যাওয়া। তাই বিদ্যুৎ সমস্যাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। নতুবা বিদ্যুৎ ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর তীব্র অসন্তুষ্টির শিকার হতে হবে সরকারকে। একটি দৃঢ় ও সমর্থ বিদ্যুৎ কাঠামো সংশ্লিষ্ট দেশের উন্নয়নের প্রকৃত অবস্থাকে নির্ণয় করে। এক্ষেত্রে নড়বড়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্মকা-কেও নড়বড়ে করে দেয় যা কখনও কারো কাক্সিক্ষত নয়। এই প্রত্যাশায় আমরা দেশের এবং জেলার বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আশু উন্নয়ন কামনা করি।