পণতীর্থ ও শাহ আরেফিনের ওরস উপলক্ষে এবার অভূতপূর্ব জনসমাগম ঘটেছিল। বিশেষ করে জেলা সদরের সুরমা নদীর উপর সেতু নির্মিত হওয়ায় এবার বিভিন্ন এলাকার তীর্থযাত্রীরা সরাসরি গাড়ি নিয়ে তীর্থস্থানে যেতে পেরেছেন। এজন্য সোমবার বিকাল থেকেই জেলা সদর থেকে লাউড়েরগড় পর্যন্ত স্থানে স্থানে দীর্ঘ যান ও জনজট তৈরি হয়েছিল। যানবাহনের অভাবে অনেক যাত্রীকে অসহায়ভাবে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। এই সুযোগে বিভিন্ন যানবাহনের চালকরা যাত্রীদের নিকট থেকে গলাকাটা ভাড়া আদায় করেছে। অন্যদিকে বৈরি আবহাওয়া থাকার কারণে আসা-যাওয়ার পথে যাত্রীরা অশেষ দুর্ভোগ সহ্য করেছেন। সবচাইতে প্রণিধানযোগ্য বিষয় হলো, যে তীর্থস্নানকে উপলক্ষ করে লক্ষ লক্ষ লোকের জমায়েত ঘটেছিল দেশের সকল প্রান্ত এবং ভারত থেকে সেখানে তেমন করে কোন প্রশাসনিক প্রস্তুতি ছিল না। ফলে রাস্তার যানজট, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, পথের নিরাপত্তা, তীর্থস্থানের সার্বিক ব্যবস্থাপনা সর্বত্রই বিশাল পরিমাণের ঘাটতি চোখে পড়েছে। প্রশাসনের একটি অংশ অবশ্য স্বীকার করেছেন এবার এত তীর্থযাত্রী আসার বিষয়টি তাঁরা আগে থেকে বুঝতে পারেননি। এবারের অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যতে একটি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা কৌশল তৈরির বিষয়েও তাঁরা যতœবান হওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
পণতীর্থ ও ওরসকে কেন্দ্র করে যে এবার অধিক জনসমাগম ঘটবে সে বিষয়ে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে বেশ আগেই বিশিষ্ট সমাজসেবী অর্ধেন্দু ঘোষ চৌধুরী (সঞ্জু) আভাস দিয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিলেন। অবশ্য বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা প্রশাসনও আগেভাগে বেশ কিছু প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। যার মধ্যে বিভিন্ন স্থান থেকে তীর্থস্থান পর্যন্ত যানবাহনের ভাড়া নির্ধারণসহ বড় গাড়ি সুরমা সেতুর উত্তর পাড়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা যায়নি। ফলে সার্বিক অব্যবস্থাপনাকে মোকাবিলা করা এবার বেশ মুশকিল হয়ে পড়েছিল। তবে স্থানীয় প্রশাসন যেখানে যতটুকু পারেন আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেছেন সমস্যার সমাধান করার। জেলা সদরে গভীর রাত পর্যন্ত ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে যাত্রী হয়রানি কমানোর উদ্যোগটি ছিল প্রশংসনীয়। এবারের অভিজ্ঞতা থেকে এই তীর্থস্নান ও ওরস উপলক্ষে ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তাকে সকলের সামনে নিয়ে এসেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি এ বছরের এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আগামী বছরগুলোতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করেন তাহলে আমরা খুশি হব।
তীর্থস্নান ও ওরস উপলক্ষে লক্ষ লক্ষ লোকের আগমনের একটি অর্থনৈতিক উপযোগিতাও রয়েছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে এলাকায় যে অর্থপ্রবাহ ঘটে সেটি এলাকার সমৃদ্ধি ঘটাবে। অন্যদিকে এর মধ্য দিয়ে জেলার পরিচিতি ও সুনাম সর্বত্র প্রচারিত হয়। সুতরাং একটি ভাল ব্যবস্থাপনা দাঁড় করানো এবং আগত বিশাল জনগোষ্ঠীকে মোটামোটি স্বাচ্ছন্দ্যময় ভ্রমণ পরিবেশ দিতে পারলে ভবিষ্যতে এই উপলক্ষটি অর্থনৈতিক বিবেচনায় আরও কার্যকর হয়ে উঠবে। ধর্মীয় অনুভূতির পাশাপাশি এই বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে তাই সকলকে চিন্তা করতে হবে।
সুনামগঞ্জকে আকর্ষণীয় পর্যটনস্পট হিসাবে গড়ে তোলার যে অভিপ্রায় আমরা ব্যক্ত করি তাতে এই তীর্থস্থানের গুরুত্ব অনেক। সুনামগঞ্জের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে পণতীর্থের মতো পবিত্র ধর্মীয় স্থান যুক্ত হওয়ায় পর্যটন সম্ভাবনাকে আরও অনেক বেশি জোরালো করেছে। তীর্থস্থানের আশে-পাশে এখন তীর্থযযাত্রীদের সুযোগ-সুবিধার জন্য তেমন কোন অবকাঠামো গড়ে উঠেনি। পণতীর্থে স্নানের সাথে আরেকটি অন্যতম অনুষঙ্গ থাকে রাজারগাঁওয়ের অদ্বৈত মন্দিরে অর্ঘ নিবেদন। এই মন্দিরটি আরও দৃষ্টিনন্দনভাবে গড়ে তোলার অবকাশ রয়েছে। এই সককিছু মিলিয়ে যদি একটি সমন্বিত পরিকল্পনা সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে গৃহীত হয় তাহলে ভবিষ্যতে সুনামগঞ্জের সুনাম আরও বৃদ্ধি পাবে।