- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

পরিবহন শ্রমিক সেক্টরে আত্মসমালোচনা ও শুদ্ধিকরণ আবশ্যক

এবারের অনৈতিক পরিবহন ধর্মঘটটি দেশের শ্রমিক আন্দোলন ও ট্রেড ইউনিয়নের চরিত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, ফেলবে ভবিষ্যতেও। কিছু নেতার দায়িত্বহীন সিদ্ধান্তে একদিকে সারা দেশের মানুষ দুই দিন জিম্মি দশায় ছিলেন অন্যদিকে নিঃশর্তে ধর্মঘট প্রত্যাহার করতে বাধ্য হওয়ায় ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন কঠিন অবস্থার মধ্যে পতিত হবে। এই ধর্মঘটের কারণে দুই নিরিহ পরিবহন শ্রমিকের প্রাণ গেছে। মামলায় আসামী হয়েছেন বহু শ্রমিক ও শ্রমিক নেতা। এদের অনেকেই এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। দৃশ্যমান ও আশ্চর্য বিষয় হলো ধর্মঘট ডাকার জন্য যে দুই প্রভাবশালী মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর নাম উচ্চারিত হচ্ছে তাঁদের কেউই এমনকি নামকরা কোন পরিবহন শ্রমিক নেতার বিরুদ্ধে মামলা হয় নি। শীর্ষ নেতারা এখন ধর্মঘটের দায় অস্বীকার করে একে পরিবহন শ্রমিকদের অবিবেচক ও অত্যুৎসাহী কর্মকা- বলে বক্তব্য দিচ্ছেন। শ্রমিক সেক্টর অশ্রমিক সুবিধাবাদী নেতৃত্বের কারণে কী পরিমাণ বিপর্যস্থ হতে পারে এবারের ধর্মঘট ও ধর্মঘট পরবর্তী বাস্তবতা এর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এই অবিমৃষ্যকারিতার পরিণতি থেকে পরিবহন শ্রমিক সেক্টর কীভাবে রক্ষা পাবে সেটি দেখার বিষয়। সাধারণ পরিবহন শ্রমিকদের বিষয়গুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করতে হবে এখন।
এবার যে কারণে ও পদ্ধতিতে পরিবহন ধর্মঘট আহুত হয়েছিলো তার কোনটিই শ্রমিক আন্দোলনের ঐতিহাসিক চরিত্রের সাথে বেমানান। প্রথমত শ্রমিক আন্দোলন কখনও নিজেদের অন্যায় ও অপরাধকর্মের দায়মুক্তি চেয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করতে পারেন না। দ্বিতীয়ত ধর্মঘট ডাকতে হলে লেবার আইন অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট কিছু প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়, যার কোনটিই অনুসৃত হয় নি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বহু মানুষের মন্তব্য অনুসারে যে ধারণাটি পাওয়া যায় তা হলোÑ এক বা দুই প্রভাবশালী ব্যক্তি নিজের ক্ষমতার পরিধি দেখাতেই নাকি এমন গণবিরোধী ধর্মঘট আহ্বান করেছিলেন। প্রকৃত পরিবহন শ্রমিক নেতৃত্বকে আজ সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে এক কঠিন লড়াই-সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়ে নিজেদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার ব্রতী হতে হবে। নতুবা অন্যের হাতের ক্রীড়নক হয়েই থাকতে হবে তাঁদের এবং তাঁরা কখনও সাংগঠনিক উপায়ে প্রকৃত শ্রমিকস্বার্থ সংরক্ষণ করতে পারবেন না।
শ্রমিক শ্রেণি হলেন উৎপাদন প্রক্রিয়ার সবচাইতে প্রভাবক অংশ। তাঁদের শ্রম-ঘামে তৈরি সুদৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকে দেশের অর্থনীতি। শ্রমিক শ্রেণি সর্বদাই নিরাপোষ এবং সংগ্রামী চরিত্রের অধিকারী। এই শ্রেণিটি সমাজের বৈপ্লবিক রূপান্তরের প্রধান শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখছে যুগে যুগে দেশে দেশে। প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি তাই সর্বদাই শ্রমিকদের একতাকে ভাঙতে, দালাল নেতৃত্ব তৈরি এবং সুবিধাবাদীতার চোরাবালিতে শ্রমিক নেতৃত্বকে নিয়ে যেতে অপরিসীম উৎসাহী থাকেন। আমাদের দেশের বিভিন্ন শ্রমিক সেক্টরের দিকে তাকালে এর জ্বলন্ত উদাহরণ দেখা যায়। সকল সেক্টরের শ্রমিক শ্রেণিকে গভীরভাবে বিষয়গুলো উপলব্ধি করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর।
এবার পরিবহন ধর্মঘটে শ্রমিক শ্রেণিকে দেশের সাধারণ মানুষের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়েছে।  মানুষের আবেগ অনুভূতি ব্যাপকভাবে শ্রমিক শ্রেণির বিপক্ষে চলে গিয়েছিল। এই সুচতুর প্রক্রিয়াটি প্রতিক্রিয়াশীলদের গোপন অভিসন্ধি। অথচ সাধারণ মানুষ ও শ্রমিক সমাজের গন্তব্য এক। এক ও অভিন্ন লক্ষের অনুসারী দুইটি বৃহৎ গোষ্ঠীর পারষ্পরিক ঐক্যের পরিবর্তে এই বিভাজন সেই শক্তির স্বার্থ রক্ষা করবে যে শক্তি সর্বদাই পৃথিবীকে শোষণের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রাখছে। সুতরাং এই জনস্বার্থ বিরোধী পরিবহন ধর্মঘটের উপর ব্যাপক আত্ম সমালোচনার প্রক্রিয়া চালু করে নিজেদের শুদ্ধিকরণের আহ্বান আমাদের পরিবহন সেক্টরের শ্রমিকগণের প্রতি।  
   

  • [১]