স্টাফ রিপোর্টার
ঝুমন দাশের নিরাপত্তা ও পরিবারের খাদ্যসংস্থান নিয়ে চিন্তিত তার মা। তিনি ছেলের নিরাপত্তার পাশাপাশি সংসার পরিচালনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এদিকে ঝুমন দাশ দাবি করেছেন, যে তিনটি অভিযোগে তিনি সাড়ে ৬ মাসের অধিক জেল খেটেছেন, সেই অপরাধ তিনি করেন নি।
ফেসবুকে হেফাজতের সাবেক নেতা কারাবন্দি মামুনুল হকের সমালোচনার অভিযোগে গত ১৬ মার্চ গ্রেপ্তার হন সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার দুর্গম নোয়াগাঁও গ্রামের যুবক ঝুমন দাশ। সাড়ে ৬ মাসের অধিক জেল খেটে গত ২৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় জামিনে মুক্তি পেয়ে বাড়ি ফিরেছেন ঝুমন। দাড়াইন ও ভান্ডাবিল হাওরঘেরা তার গ্রামটিতে গত ১৭ মার্চ তা-ব চালিয়েছিল হেফাজত অনুসারীরা। নোয়াগাঁওয়ে সেই আতঙ্ক এখনো কাটে নি। ঝুমন কারামুক্ত হওয়ায় তার পরিবার আনন্দিত হলেও তার নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত মা।
ঝুমন দাস বললেন, আমি যখন জেলে তখনও ১৫-১৬ টি আইডি আমার নামে সচল ছিলো। আমি জেলে থাকার পর কিভাবে আমার নামের এই আইডিগুলো সচল থাকে। যে পোস্টের কারণে আমার নামে মামলা হয়েছে সে রকম কোনো পোস্ট দেই নি আমি। মামলায় ৩টি পোস্টের কথা উল্লেখ আছে। সত্যিকার অর্থে সর্বশেষ যে পোস্টটি সেটা আমি দিয়েছি। সে পোস্টে মামুনুল হকের সমালোচনা করা হয়েছে। বাকী যে ২ টি পোস্টে অশ্লিল কথা লিখে দেয়া হয়েছে, সেগুলো আমি দেই নি। কেউ আমার প্রোফাইলের স্ক্রিনশর্ট নিয়ে এডিট করে আমার নামে চালিয়ে দিয়েছে।
ঝুমন দাস আরও বললেন, ‘বিগত ১০ বছর ধরে আমি সিলেটের গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট মৌলভীবাজারের রাজনগর, শমসেরনগরে, সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ, তাহিরপুর ও ধর্মপাশায় মার্কেটিংয়ে কাজ করেছি। স্কয়ারে কাজ করেছি। এভাবেই আমার পরিবারের খরচ চালিয়েছি। চলতি বছরের প্রথমদিকে আমার ভাই ব্যবসা করবার জন্য কিছু টাকা দেন। সে টাকায় ব্যবসা শুরু করবার পরই এই ঘটনা। জেলে থাকার ৬ মাসের সময়ে আমার পরিবার অনেক ঋণ করেছে। এখন আমার কিছু করতে হবে। বুঝতে পারছি না কি করবো।’
ঝুমনের মা নিভা রানী দাশ তার প্রিয় সন্তানকে নিয়ে উদ্বিগ্ন। তিনি গত দুদিন ধরে চোখে চোখে রাখছেন ঝুমনকে। আড়াল হতে দিচ্ছেন না। সন্তানের নিরাপত্তার সঙ্গে পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়েও তিনি উদ্বিগ্ন।
নিভা রানী দাস বললেন, এখন আমার ছেলে ঝুমন দাস জেল থেকে বের হয়ে বাড়িতে আসছে। আমার পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি ঝুমন। এতোদিন সে জেলে থাকায় ধারকর্য করে পরিবার চালিয়েছি। আগে সে চাকরি করে পরিবারের খরচ চালিয়েছে। এখন আমার পরিবার চলবে কিভাবে, খাবো কি, সে চিন্তাই করছি। একদম নিরুপায় অবস্থায় আমার পুরো পরিবার।
ঝুমন দাসের স্ত্রী সুইটি রানী দাস বললেন, মিথ্যা অভিযোগে তার স্বামী জেল খেটেছেন। তিনি জেল খাটার মতো কোন অপরাধ করেন নি। স্বামী ঝুমন দাসের নিঃশর্ত মুক্তি চান সুইটি।
এদিকে ১৭ মার্চের নারকীয় হামলার কথা ভুলতে পারেননি এলাকাবাসী। তারা শত বছর ধরে যেভাবে শান্তি ও সম্প্রীতি নিয়ে অবস্থান করতেন সেই ধারাবাহিকতায় গ্রামে শান্তিতে বসবাস করতে চান। একই সঙ্গে যারা তাদের গ্রামে হামলা করেছিল তাদের বিচার দাবি করেন গ্রামবাসী।
নোয়াগাঁওয়ের বাসিন্দা চন্দন দাস বললেন, আমরা শতবছর ধরে শান্তি সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করছি। আমাদের বাপদাদারা এখানে বসবাস করেছেন দুই ধর্মের মানুষ মিলেমিশে। কোনোদিন এরকম ঘটনা হয়নি। কিন্তু কিছু দুষ্কৃতিকারী গুজব ছড়িয়ে আমাদের বাড়িঘর ভাঙচুর, লুটপাট করেছে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে এর বিচার চাই।
বীর মুক্তিযোদ্ধা অনিল চন্দ্র দাস বললেন, আমাদের বাড়িঘর ভাঙচুর লুটপাট হয়েছে। আমার বয়স অনেক হয়েছে। আর কতদিন বাঁচবো জানি না। মৃত্যুর আগে দোষীদের শাস্তি দেখে যেতে চাই।
পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান জানালেন নোয়াগাঁওবাসীর নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্খা থাকার কোন কারণ নাই। পুলিশ গ্রাম ও ঝুমনের নিরাপত্তার ব্যাপারে সচেতন আছে।