দেশ থেকে দারিদ্র হটানো তথা মানুষের আত্মকর্মসংস্থান তৈরি, সঞ্চয়ী মনোভাব গঠন করে নিজস্ব বিনিয়োগযোগ্য মূলধন বাড়ানো এমন উদ্দেশ্য নিয়ে গতকাল নবগঠিত পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের ১০০ শাখার উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী। গণভবন থেকে বিটিভিতে প্রচারিত সরাসরি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ৪৮৫ টি উপজেলার মধ্যে প্রথম ধাপে ১০০ উপজেলায় বিশেষায়িত এই ব্যাংকের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী। চলমান একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের উপকারভোগীদের শেয়ারহোল্ডার করার মধ্য দিয়ে এই ব্যাংকের যাত্রা শুরু হয়েছে। যদিও ব্যাংক গঠনের ঘোষণা, আইন ও বিধি প্রণয়নসহ প্রাকপ্রস্তুতিমূলক কর্মকা- এক বছর আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে তৃণমূল পর্যায়ে গতকালই এই ব্যাংকের যাত্রারম্ভ হলো। খুশির বিষয় হলো প্রথম ধাপের ১০০ শাখার মধ্যে সুনামগঞ্জের সদর ও দক্ষিণ সুনামগঞ্জেও গতকাল থেকে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের যাত্রা শুরু হয়েছে। অবশিষ্ট উপজেলাগুলোতেও শীঘ্রই ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু করা হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেয়া হয়েছে। আমরা নবগঠিত এই বিশেষায়িত ব্যাংকটির শুভযাত্রা কামনা করছি।
প্রশ্ন আসতে পারে কৃষি ব্যাংক, আনসার ভিডিপি ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক এমন সব বিশেষায়িত ব্যাংক থাকার পরও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক নামের আরেকটি ব্যাংক চালুর উদ্দেশ্য কী। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংককে এমনভাবে গড়ে তোলা হবে যেখানে গ্রামের দরিদ্র মানুষরা নিজেদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় জমা করার মধ্য দিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ খুঁজে পাবেন। বলা হচ্ছে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রাম পর্যায়ে গঠিত সমিতিগুলোর নিজস্ব পুঁজির পরিমাণ ইতোমধ্যে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে যে কর্মচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে সেটিকে স্থায়িত্ব দেয়াই এই ব্যাংক গঠনের একটি মুখ্য উদ্দেশ্য। তাছাড়া বেসরকারি সংস্থাগুলোর মাধ্যমে মাইক্রোক্রেডিটের যে চরিত্র বর্তমানে ধারণ করেছে সেখান থেকে একে গণমুখী চরিত্রে ফিরিয়ে নেয়াও এর আরেকটি উদ্দেশ্য। সরকারের এসব উদ্দেশ্য যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে গ্রামের গরিব মানুষের নিজের ব্যাংক হিসাবে এই ব্যাংকটি জায়গা করে নিতে সক্ষম হবে।
যেহেতু ব্যাংকটি সবে মাত্র যাত্রা শুরু করল তাই এর সফলতা-ব্যর্থতা প্রসঙ্গে মন্তব্য করা এখন সমীচীন হবে না। গ্রামীণ ব্যাংক গঠন করে সমাজের দারিদ্রতা দূরীভূত না হলেও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের মাধ্যমে যদি ২০১৮ সনের মধ্যে দারিদ্রতা দুরিকরণের জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা যায় এবং এই বিশাল কর্মকা-ে যদি ব্যাংকটি যথাযোগ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয় তাহলে আরেকটি ব্যাংক গঠনের সার্থকতা প্রমাণিত হবে। তাই আমরা ব্যাংকের কার্যক্রমের দিকে অনেক আশা নিয়ে চেয়ে রইলাম। আশার কথা এই যে, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে আশির দশক মাইক্রোক্রেডিটের যে ধারণার বাস্তবায়ন শুরু হয় সেটিকে আরও গণমুখী করতেই একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প গ্রহণ করা হয় যেখানে ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে কোন ধরনের মুনাফা অর্জন সরকারের লক্ষ্য ছিল না। এই প্রকল্পে সরকার সঞ্চয়ের বিপরীতে সমপরিমাণ প্রণোদনা সঞ্চয় এবং ঋণ তহবিল দিয়ে গ্রামীণ মানুষের পুঁজি গড়ে দিয়েছে। বিনিয়োগকৃত ঋণের যৎসামান্য সার্ভিস চার্জ আবার সমিতিরই তহবিলে জমা হয়ে তাদের পুঁজি বাড়িয়েছে। অর্থাৎ এই প্রকল্পের সমুদয় তহবিল ও মুনাফার শতভাগ আবার গ্রামের দরিদ্র মানুষগুলোর কাছেই চলে গেছে। পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকও এই দর্শন দ্বারাই পরিচালিত হবে বলে সরকার ঘোষণা দিয়েছেন।