বিশ্বজিত রায়, হাওর থেকে ফিরে
কৃষকের ফসল রক্ষায় প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও হাওর এলাকায় নতুন-পুরাতন বাঁধ, ক্লোজার নির্মাণ ও মেরামত করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তত্ত্বাবধানে সংশ্লিষ্ট উপজেলা কাবিটা স্কীম প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটি কতৃর্ক গঠিত প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) এ কাজ করে আসছে। এতে সরকার প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। কিন্তু বছরের পর বছর ফসল রক্ষা বাঁধ কাজে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ অঢেল অর্থ ছাড় দিলেও বাঁধের কাজ সম্পন্নে মানা হয় না কোন নিয়ম-নীতি। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে বর্ধিত সময়েও শেষ হয় না বাঁধের কাজ। যে কারণে এ বছর অসময়ের পানিতে অনেক হাওর তলিয়ে স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে কৃষকের। এর জন্য অনিয়ম-দুর্নীতির পাশাপাশি পাউবোর বিলম্ব অর্থ ছাড় ও তাদের গড়িমসিকে অনেকাংশে দায়ী বলে মনে করছেন হাওর সচেতন মানুষ ও পিআইসি সংশ্লিষ্টরা।
পিআইসি ও কৃষক নেতাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, হাওর রক্ষা বাঁধ কাজে পদে পদে অনিয়ম আছে। সবকিছুর পর পাউবোর বিলম্বিত বিল পরিশোধের ব্যাপারটি বাঁধের কাজ এগিয়ে নিতে অন্যতম অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। পাউবো সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড় না দেয়ায় পিআইসিসহ হাওর পাড়ের কৃষকেরা মনোবল হারিয়ে বাঁধের কাজে অনাগ্রহী হয়ে উঠছে। অস্বচ্ছল পিআইসিদের কেউ কেউ বাঁধের কাজ প্রশাসনের অতিরিক্ত চাপে ধারদেনা করে কোনরকম এগিয়ে নিলেও সেই কাজে ঢের দুর্বলতা থেকে যাচ্ছে। ফলে পানি আসার সাথে সাথে নড়বড়ে বাঁধ আরও দুর্বল হয়ে কৃষকের সর্বনাশ ডেকে আনছে।
অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা পাউবো ও স্থানীয় প্রশাসন সম্পূর্ণ অনিয়মতান্ত্রিকভাবে অযোগ্য, অদক্ষ ও অকৃষকের হাতে পিআইসির দায়িত্ব তুলে দিয়ে নিজেদের আখের ঘুচানোর চেষ্টা করে থাকে। সংশোধিত নীতিমালায় জারিকৃত বাঁধের কাজ হাওর পারের কৃষকের হাত থেকে পূর্বের ঠিকাদারী প্রথায় ফিরিয়ে নিতে কলকাঠি নাড়া হচ্ছে বলে মনে করছে সচেতন মহল। তবে এ অভিযোগ মানতে নারাজ পাউবো সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, ২০১৭ সালের আলোচিত হাওর বিপর্যয়ের পর কৃষকের স্বার্থে ঠিকাধারী প্রথা বাতিল করে পিআইসি প্রথা চালু করে সরকার। হাওর পাড়ের উপকারভোগী অর্থাৎ স্থানীয় কৃষক দ্বারা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠনের মাধ্যমে সরকার হাওরকে দুর্নীতিমুক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। সে নীতিমালায় ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শুরু এবং ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ করার কথা বলা আছে। কিন্তু কৃষকের ফসল রক্ষার স্বার্থে সরকার বাঁধ রক্ষা কাজের নীতিমালা পরিবর্তন করলেও কাজ চলে সেই পুরোনো আদলে। এতে করে সরকারের কৃষকবান্ধব এ নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পাঁয়তারা চলছে বলে মনে করছেন কৃষক ও কৃষক নেতারা।
বাঁধের কাজে কৃষকের অনাগ্রহ, গেল অর্থবছরের পাওনা গত জানুয়ারিতে পরিশোধ
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের ১১টি উপজেলার ছোট-বড় হাওর রয়েছে অন্তত ১৩৭টি। এর মধ্যে ৪২টি হাওরে প্রায় ১২১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭২৭টি পিআইসির মাধ্যমে ৫৩৫ কিলোমিটার বাঁধ, ক্লোজার নির্মাণ ও মেরামত করা হয়েছে। জামালগঞ্জে এ বছর ছোট-বড় ৬টি হাওরে ১৮৫ কি.মি. বেড়িবাঁধের মধ্যে ৯০ কি.মি বাঁধে জরিপ চালিয়ে ৪৪.৮৬৫ কি.মি. বাঁধের কাজ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি ক্লোজার আছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে উপজেলার ৪০টি পিআইসির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এ পর্যন্ত ৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা পিআইসির অনুকূলে ছাড় দেওয়া হয়েছে। এখনও বাকি আছে প্রায় ৫০ ভাগেরও বেশি বিল। ২০২০-২১ অর্থবছরে পিআইসিদের পাওনা বিলের ১ কোটি ৪৯ লাখ টাকা চলতি বছরের জানুয়ারিতে পরিশোধ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে উপজেলা পাউবো কার্যালয়।
বেহেলী ইউনিয়নের মহালিয়া হাওর পাড়ের কৃষক ও ৮ নম্বর পিআইসি সভাপতি চন্দন বর্মন বলেন, আমার পিআইসির বরাদ্দ হইল ১২ লক্ষ ৩৮ হাজার টেকা। এখন পর্যন্ত পাইছি আমি ৪ লাখ ৩৪ হাজার। বাকি টেকা আমি ঋণ কইরা আনছি। আমার কাজের টোটাল ব্যয় আছে আপনার ৮ লাখ টেকার উপরে। ৪ লাখ ৭২ হাজার টেকা সুদি কইরা আনছি। এখন বিল দিতে গিয়া যদি লেইট হয় তখন তো আমার একমাত্র পরিস্থিতি মরণই, এছাড়া তো কোন উপায় নাই। বিলের ব্যাপারে আমি স্যাররে ফোন দিছিলাম, স্যারে বলতাছে যে আমরা হিসাব-কিতাব করতাছি ঈদের পরপর দেওয়া হইব।
চন্দন বর্মনের মতো মরণাপন্ন অবস্থা প্রায় অধিকাংশ পিআইসির। প্রায় প্রতি বছরই বন্যা, খরা, শিলাবৃষ্টিসহ প্রকৃতিগত নানা দুর্যোগে হাওর পাড়ের কৃষক এমনিতেই ক্ষতিগ্রস্ত। এর মাঝে ঋণের টাকায় হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ করে যদি সময়মতো বিল না পাওয়া যায় তাহলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে কৃষক, এমন প্রশ্ন রাখের কৃষক নেতারা। পাউবোর বিল ছাড়ে গাফিলতি ও অব্যবস্থাপনা ফসল রক্ষার বিপরীতে কৃষককে সর্বস্বান্ত করার পাঁয়তারা বলে মনে করছেন তারা।
কেন্দ্রীয় হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, পাউবো মূলত পিআইসি প্রথা চায় না। এছাড়া বাঁধের কাজে প্রশাসনের সম্পৃক্ততাও তারা মেনে নিতে পারছে না। এতে তাদের সমস্যা হচ্ছে। আমি মনে করি পিআইসিকে সময়মতো টাকা না দেওয়ায় বাঁধের কাজ খামখেয়ালিভাবে হয়, দুর্বল হয়। বাঁধের কাজে যদি ঠিকমতো বিল দেওয়া হতো তাহলে বাঁধের কাজও সঠিকভাবে হতো। মূলত কৃষককে পাশ কাটিয়ে বাঁধের কাজ পূর্বের অবস্থানে ফিরিয়ে নিতে পাউবো এ রকম করছে।
এ ব্যাপারে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, বাঁধের কাজে বিলের বিলম্ব কোন বিষয় না। যখন টাকা আসছে তখনই তো আমরা দিয়ে দিচ্ছি। কাজের প্রাক্কলনের ভিত্তিতে কাজ যতটুকু করবে সে ততটুকু বিল পাবে। এটা পিআইসিদের গাফিলতি, এটা টাকার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা আমার দৃষ্টিকোণ থেকে কম। আর বিল দিলেও পিআইসিরা এভাবেই কাজ করবে।
পাউবো আসলে চাচ্ছে না বাঁধের কাজ কৃষক করুক, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এতে পাউবো চাওয়া না চাওয়ার কিছু নাই। গভমেন্টের নীতিমালার আলোকে কাজ হচ্ছে। পাউবো গভমেন্টের বাইরের তো কোন সংস্থা না। সরকার যেভাবে চাইবে পাউবো সেভাবেই কাজ করবে। এ নিয়ে অভিযোগ হাস্যকর।