সমন্বয়হীনতার চূড়ান্ত নজির দেখা যায় বাংলাদেশের উন্নয়ন কাজগুলোতে। একটি কাজ করতে গেলে দেখা যায় কর্মএলাকায় রয়েছে সরকারের নানা দপ্তরের নিয়ন্ত্রণ। কারও ড্রেনেজ ব্যবস্থা, কারও গাছপালা, কারও গ্যাস লাইন, কারও বিদ্যুতের খুঁটি ইত্যাদি ইত্যাদি। এই কর্মএলাকায় যখন কোনো একটি দপ্তর উন্নয়ন কাজে হাত দেয় তখন বাধা হয়ে দাঁড়ায় অন্য দপ্তরগুলোর বিদ্যমান উপকরণগুলো। আন্তঃ দপ্তর সমন্বয়ের সুনির্দিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষ না থাকায় এসব ক্ষেত্রে সমন্বয়ের কাজগুলো বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। বড় বড় শহর বা নগরে এমন সমন্বয়হীনতার কারণে বছরের পর বছর কাজ ঝুলে থাকার দৃষ্টান্ত কম নয়। আবার সমন্বয় না হওয়ার কারণে যে দপ্তর উন্নয়ন কাজটি করল সেই উন্নয়ন কাজের সুফল পাওয়ার ক্ষেত্রে বাস্তব প্রতিবন্ধকতা থেকে যায়। সম্প্রতি শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাগলা বাজার সড়ক সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে অনুরূপ সমন্বয়হীনতার একটি সংবাদ গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত হয়েছে। পাগলাবাজার এলাকার ভয়াবহ যানজট নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে সড়ক ও জনপথ বিভাগ ওই সড়কের সম্প্রসারণ ও একটি বাসস্টপেজ নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। কাজ চলমান। কিন্তু সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে সড়কের কিনারে স্থাপিত পল্লী বিদ্যুতের খুঁটি। ওটি সরানোর জন্য দুই দপ্তরের মধ্যে চিঠি চালাচালি চলছে। কিন্তু চিঠি চালাচালির বহর বেশ হলেও খুঁটি সরানোর ক্ষেত্রে অগ্রগতি এখনও দৃশ্যমান নয়। ফলে বৈদ্যুতিক খুঁটির জায়গাটুকু বাদ রেখে সওজ ঢালাই এর কাজ করছে। এতে কী হবে? সড়ক প্রশস্তকরণের কাজ শেষ হওয়ার পর দেখা যাবে সড়কমধ্যে মূর্তিমান আতংকের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ওই খুঁটি। শুধু ওই খুঁটিটি পথিমধ্যে থাকার কারণে সড়ক সম্প্রসারণের কোনো সুফলই পাওয়া যাচ্ছে না। বহু টাকা ব্যয় করে যে উদ্দেশ্য নিয়ে সড়কের সম্প্রসারণ করা হলো তা পূরণ হচ্ছে না বলেই দেখা যাবে। এই অদ্ভূত সমন্বয়হীনতা দূর হওয়া দরকার। উন্নয়নের স্বার্থে যে দপ্তরের যে কাজটি করা দরকার কাজ শুরু হওয়ার আগেই তা নির্ধারণ করে বাস্তবায়নের নিয়ম থাকলেও আলোচ্যক্ষেত্রে সেটি না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষ যারপরনেই ক্ষুব্ধ।
আলোচ্য সংবাদটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায় পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ বলেছেন, খুঁটি সরানোর জন্য ২ লাখ টাকার একটি এস্টিমেটসমেত প্রস্তাব তারা সড়ক ও জনপথ কর্তৃপক্ষের নিকট পাঠিয়েছেন। কিন্তু সড়ক ও জনপথ বিভাগ এখনও ওই প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি। আমাদের কথা হলো, সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং পল্লী বিদ্যুত সমিতি বাংলাদেশ সরকারেরই দুইটি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান। টাকা যদি লাগেও তা সরকারি কোষাগার থেকেই যাবে এবং একই কোষাগারে জমা হবে। আমলাতান্ত্রিক ঐতিহাসিক জটিলতা পরিহারের গণবান্ধব চিন্তা দ্বারা আমলাতন্ত্র পরিচালিত হলে এই ধরনের দুর্ঘটনা কখনও ঘটত না। কাজ শুরুর আগেই যাবতীয় প্রস্তুতিমূলক কার্যাদি শেষ হয়ে যেত। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমাদের সরকারি দপ্তরগুলো যেকোনো কাজকে সহজীকরণের পরিবর্তে জটিলকরণের মহানন্দ ভোগ করতে যেন উন্মুখ থাকে। তাই সড়কের মাঝখানে খুঁটি রেখেই সড়ক সম্প্রসারণের কাজ করতে হচ্ছে। এমন অবস্থার অবসান কাম্য।
পাগলাবাজার শান্তিগঞ্জের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা। এই সড়কের পাশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। এই বাজারের সম্মুখ দিয়ে চলাচল করে অসংখ্য যানবাহন। অসহনীয় যানজট ও দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা এটি। যে যানজট ও দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণের জন্য সড়ক সম্প্রসারণ করা হচ্ছে এখন বিদ্যমান বৈদ্যুতিক খুঁটিটি সেই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিবে। এমন ঝুঁকিবহুল উন্নয়ন কাজ করে লাভ কী? তাই দ্রুত বৈদ্যুতিক খুঁটিটি সরানোর জন্য আমরা পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানাই।