- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

পাটলাই নদীতে পাঁচ কিলোমিটার নৌজট

সাইদুর রহমান আসাদ
নদীর নাব্যতা সংকটে তৈরি হয়েছে নৌজট। আটকা পড়েছে পাঁচশ’এর বেশি নৌকা। পণ্য নির্ধারিত গন্তব্যে পাঠাতে না পেরে কোটি টাকার লোকসানের মুখে ব্যবসায়ীরা। ১৮ দিনেও প্রায় ৫ কিলোমিটারের নৌজট স্বাভাবিক করার উদ্যোগ না থাকায় অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন পার করছেন বাল্কহেড’এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হাজারও শ্রমিক। আটকে পড়াদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়েরও অভিযোগ আছে। সুনামগঞ্জের সীমান্তবর্তী উপজেলা তাহিরপুরের পাটলাই নদীতে এখন এমন দৃশ্য।
তাহিরপুরে পাটলাই নদীর দুই কিলোমিটার অংশ খুবই সরু ও অগভীর। এতে প্রতিদিন দু-তিনটির বেশি বাল্কহেড নদীর সুলেমানপুর এলাকা পারি দিতে পারে না। বছরের পর বছর পলি পড়ে নদীর তলদেশে ভরাট হয়ে এই সংকট তৈরি হয়েছে। এ কারণে গেল ১৫ জানুয়ারি থেকে নদীর সুলেমানপুর অংশে তৈরি হয়েছে নৌজট। বর্তমানে নদীর ৫ কিলোমিটার অংশ জুড়ে দীর্ঘ হয়েছে নৌজট। কবে এই নৌজট খুলে স্বাভাবিক হবে জানেন না নৌকার চালকরা।
আটকে থাকা পাঁচ শতাধিক নৌযানের ধারাবাহিকতা ঠিক রাখতে এবং শৃঙ্খলা রক্ষায় তাহিরপুর কয়লা আমদানিকারক সমিতি ৩০ জন পাহারাদার নিয়োগ দিয়েছে। রাতে ও দিনে পালাক্রমে ১৫ জন করে এদের দায়িত্ব পালনের কথা। তবে এই পাহারাদারদের বিরুদ্ধে চাঁদবাজির অভিযোগও আছে। অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে পেছনের নৌকা সামনে, আবার সামনের নৌকা পেছনে নিয়ে সমস্যা বাড়াচ্ছে তারা।
নৌ চালক মো. আনোয়ার হোসেন বললেন, ১৭ দিন ধরে নৌকা নিয়ে নদীতে আটকে আছি। রাতে সেন্ট্রিরা (পাহারাদার বা নিরাপত্তা কর্মী) এসে চাঁদা দাবি করে। না দিলে মারধর করে। যারা দেয় না, তাদের কে পেছনের সিরিয়ালে নেয়। ডাল ভাত খেয়ে না খেয়ে কোনোভাবে টিকে আছি, যে যেমন পারে জোরজুলুম করছে আমাদের উপর, আমরা অসহায়ের মত আছি।
পায়রাবন্দের বাল্কহেড চালক মো. হোসেন বললেন, এখানে সেন্ট্রি যারা আছে তারা টাকা নিয়ে পেছনের নৌকা আগে ও আগের নৌকা পেছনে নিয়ে আসে। এটা বন্ধ করতে আমাদের নৌকা সমিতি থেকে ৮ জন লোক দেয়া হয়। পরে সুলেমানপুরের সেন্ট্রিরা নৌকা সমিতির এই ৮ জন কোন কারণ ছাড়াই মেরেছে। বিচার চেয়ে আমরা তাহিরপুর থানায় গিয়েছি। পরে ইউএনও সাব ও পুলিশ এসে এই ঘটনার ফয়সালা করে দিয়েছেন। তারা বলেছেন, এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে ঘটলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলের জেলা সুনামগঞ্জের এই তাহিরপুর উপজেলার স্থল শুল্কষ্টেশন বড়ছড়া-চারাগাঁও ও বাগলী শুল্ক ষ্টেশন থেকে পাটলাই নদীপথে দেশের বিভিন্ন জেলার ইটভাটায় কয়লা ও সিমেন্ট ফ্যাক্টরীতে চুনাপাথর সরবরাহে ব্যবহৃত সহ¯্রাধিক ইঞ্জিন চালিত নৌকা, বাল্কহেড জটের কারণে আটকে পড়ে আছে। উপজেলার মাটিয়ান হাওর সংলগ্ন হাঁসমারা বিল থেকে পাইকরতলা নদীর ৫ কিলোমিটার নৌপথের দুই তীরে গত ২০ দিন ধরে এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পণ্যবাহী এসব নৌকা ঠিক সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারায় লোকসান গুণতে হচ্ছে তাদের। এছাড়াও ভৈরব থেকে আনা মুদি-দোকানের কাচামাল পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়বেন।
ভৈরবের বাসিন্দা নৌকা চালক মোশাররফ হোসেন বললেন, আমাদের নৌকা ভৈরব থেকে ট্যাকেরঘাট পর্যন্ত কাঁচামাল পরিবহন করে। আমরা সুলেমানপুর আটকে আছি। বোয়ালমারা থেকে কানামইয়া পর্যন্ত নৌকার জ্যাম। একারণেই আমরা যেতে পারছি না। অনেক নৌকা ১ মাস হয়ে গেছে আটকা আছে।
তিনি বললেন, ১ বস্তা পেঁয়াজের দাম হয় ৩ হাজার টাকা, এমন নৌকাও আছে ১০০-১৫০ বস্তা পেঁয়াজ। সকল পেঁয়াজ পচে যাবে। দুয়েকটি নৌকায় ডিমও (লাল ডিম) আছে। এগুলো পচে নষ্ট হয়ে গেছে।
আলিম উদ্দিন নামের কিশোরগঞ্জের এক বাল্কহেড চালক বললেন, চুনাপাথরের অর্ডার পেয়ে এখান থেকে মালামাল নিতে এসেছিলেন। ১৬ দিন ধরে এখানেই আটকা আছেন। রোববার তার অর্ডার বাতিল হয়ে গেছে। হাত খরচের টাকাও শেষ হয়ে গেছে, এখন বাল্কহেড’এর স্টাফদের খরচ চালানো নিয়েও বিপদে পড়েছেন তিনি।
তাহিরপুর কয়লা আমদানীকারক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন বললেন, প্রতিদিন আমরা প্রায় ২০ হাজার টন কয়লা চুনাপাথর পরিবহন করি। নৌজটের কারণে গেল ১ মাস হয় আমদানী রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। এতে কোটি কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। এছাড়াও এই ব্যবসায় খেটে খায় এমন শ্রমিকরা বেকায়দায় পড়েছে।
সমস্যা সমাধানের জন্যে স্থানীয় প্রশাসন ১০০ টনের উপরে ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন বড় নৌকাকে আহসানপুর এলাকা থেকে নদীর উজানে আসতে দেয়া বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেখান থেকে ছোট ছোট নৌকায় করে পণ্য নিয়ে আসতে হবে উজানে। বড় নৌকাগুলো নদীর তলদেশে আটকে যাওয়ার কারণে দীর্ঘ নৌজটের তৈরি হয়েছে। এজন্য এই নৌকাগুলো থেকে ১০০ টনের কম ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন নৌকা দিয়ে পণ্য সরানো হবে। এভাবে নৌচলাচল স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন ও আমদানীকারক সমিতি।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার রায়হান কবির বললেন, ভারি নৌকা থেকে পণ্য ছোট নৌকায় সরানো হবে। এছাড়াও এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত একশ টনের বেশি ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন নৌকাকে নদীর উজানের দিকে আসতে দেয়া হবে না। আহসানপুর এলাকা থেকে ছোট নৌকা করে পণ্য পরিবহণ করতে হবে। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে দ্রুত খননের তাগিদ দেওয়া হবে।
নৌজটে চাঁদা আদায়ের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বললেন, বিষয়টি তদন্তাধীন, সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

  • [১]