- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

পাটি শিল্পীদের দুর্দিন

মো. ওয়ালী উল্লাহ সরকার, জামালগঞ্জ
আবহমান বাংলার যুগযুগ ধরে ছিল শীতল পাটির চাহিদা। প্রচণ্ড গরমে ক্লান্ত শ্রান্ত মানুষকে প্রশান্তি এনে দেয় বলেই এর নাম শীতল পাটি। এক সময় ঘরে ঘরে শীতল পাটির ব্যবহার ছিল। সময়ের পরিবর্তনে চাহিদার ধরন বদলে যাওয়ায় শীতল পাটির জৌলুশ হারিয়ে গেছে। এই পেশায় জড়িত পাটি শিল্পীদের এখন দুর্দিন চলছে।
শীতল পাটির জন্য ২ যুগ আগেও বিখ্যাত ছিল জামালগঞ্জ উপজেলা। উপজেলার কয়েকটি গ্রামের শীতল পাটি ছিল উন্নত মানের। জেলা কিংবা উপজেলায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের আগমনে শীতল পাটি উপহার দেয়া হতো। অনেকেই এই পাটি উপহার পেয়ে আনন্দিত হতেন। বাড়তো উপজেলা শীতল পাটি শিল্পীদের গৌরব।
পাটি শিল্পীরা জানান, বাজারে কম দামে প্লাস্টিক ম্যাট পাওয়া যায় বলে কমে গেছে শীতল পাটির চাহিদা। পাশাপাশি বেড়ে গেছে শীতল পাটির তৈরী মুর্তা বেতসহ উপকরণের দাম। এতে হুমকিতে পড়েছে পাটিশিল্পীদের ঐতিহ্যবাহী পেশা। এছাড়াও প্রয়োজনীয় পুঁজির অভাবে অনেকে এই পেশায় টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, মুর্তাবেত দিয়ে তৈরী করা হয় শীতল পাটি। বুনন কৌশল ও কাজের দক্ষতায় পাটিতে ফুটিয়ে তোলা হয় বিভিন্ন নকশা। মসজিদ, লতা-পাতা, নৌকা, পালকি, ইত্যাদি ফুটিয়ে তোলা হয় শীতলপাটির বুননে। উপজেলা কয়েকটি গ্রামে প্রায় দেড় হাজার পরিবার বংশ পরষ্পরায় শীতলপাটি তৈরী করে জীবিকা নির্বাহ করতো। তবে এই কাজে স্বাধীনতার ৫৩ বছরে তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি।
উপজেলার ভীমখালী ইউনিয়নের কালীপুর, জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের সোনাপুর, চাঁনপুর, কদমতলী, বেহেলী ইউনিয়নের বদরপুর, বেহেলী, গ্রামসহ কয়েকটি শীতলপাটির খ্যাতি সমৃদ্ধ গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, পাটিশিল্পীদের কেউ পাটি বুনছেন, কেউ বেত তুলছেন, আবার কেউ পাটি বাজারে নেওয়ার ব্যবস্থা করছেন। সব মিলিয়ে বেশ কর্মব্যস্ত দিন কাটলেও তাদের দুর্দিন কাটছে না বলে জানান তারা।
ভীমখালী ইউনিয়নের কালীপুর গ্রামের পাটিশিল্পী লক্ষীরাণী দত্ত বলেন, গরমের মৌসুম ছাড়া অন্য মৌসুমে অনেকটা হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হয়। গরমে পাটি বুননের কাজ বেড়ে যায়। গরমের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে পাটি বিক্রিও বাড়তে থাকে। তবে বাজারে প্লাস্টিকের ম্যাটের কারণে শীতল পাটির কদর কমে গেছে। এই এলাকায় সাধারন পাটি নয়শত থেকে একহাজার টাকা বিক্রি হয়। কাজ করা নকশী শীতল পাটি তিনহাজার থেকে চার হাজার টাকা বিক্রি হয়। কিন্তু বাজারে দুই শত থেকে তিনশত টাকায় ম্যাট পাওয়া যায়। তিনি বলেন, সারা দেশে চাহিদা থাকলেও বেতের স্বল্পতা ও মূলধনের অভাবে পাটি শিল্পের প্রসার ঘটানো যাচ্ছে না।
পাটির শিল্পী স্বরস্বতী রাণী দত্ত বলেন, পাটি তৈরির প্রধান উপকরণ মুর্তা বেত। এর চাষ ক্রমাগত কমে যাওয়ায় এই পেশা সংকটে পড়েছে। অনেকে পেশা বদল করে অন্য পেশায় চলে গেছে।
একই গ্রামের পাটির শিল্পী পারুল রাণী দত্ত, পূর্ণিমা রানী দত্ত বলেন, একটি সাধারন পাটি বুনতে তিন, চার জনের দুই তিন লেগে যায়। আর নকশী শীতল পাটি বুনতে আট দশ দিন লাগে। আমরা সংসারের অন্যান্য কাজের ফাঁকে পাটি বুনন করে থাকি। একটি পাটিতে খরচ বাদে তিন থেকে চারশত টাকা লাভ হয়।
তারা বলেন, শীতল পাটিতে খরচ বাদে এক হাজার থেকে বারশত টাকা লাভ হয়। এতে করে জনপ্রতি পঞ্চাশ থেকে ষাট টাকা রোজ পড়ে। তার পরও পরিবারের ঐতিহ্য ধরে রাখতে এবং অন্য কোন পেশা জানা না থাকায় এই পেশায় নিয়োজিত আছি। এখনও কিছু কিছু মানুষ আছে তারা শীতল পাটি ব্যবহার করে। তবে তারা সংখ্যায় অনেক কম।
জামালগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইকবাল আল আজাদ বলেন, শত বছরের ঐতিহ্য এই শীতল পাটি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। প্লাস্টিক আর ম্যাটের সাথে প্রতিযোতিযোগিতায় তারা টিকে থাকতে পারছেনা। উন্নত প্রশিক্ষণ ও ঋণ সুবিধা সহ প্রয়েজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তারা স্থানীয় ভাবে তৈরী শীতল পাটি দেশে ও বিদেশে রপ্তানী করে উপজেলার সম্মান ও পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে পারবে।

  • [১]