খলিল রহমান
দিন-তারিখ মনে নেই। এক সকালে পঙ্কজ দা বলেন ডিসি অফিসে যেতে হবে। মোটরসাইকেলের পেছনে বসে কারণ জানতে চাই। তিনি বলেন না। ডিসি অফিসের বারন্দায় হাঁটতে হাঁটতে বলেন, একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের আবেদন করবেন তিনি। আমার খটকা লাগে। সুনামগঞ্জ শহর থেকে সম্ভব? আবার ভাবি, তিনি নিশ্চয় বুঝে-শুনেই এ পথে পা বাড়িয়েছেন।
আবেদনে পত্রিকার দুটি নাম দিতে হয়। এর মধ্যে আমরা ‘দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর’ পছন্দ করি। এর পেছনে একটা কারণও ছিল, পত্রিকার নামের সঙ্গে ‘সুনামগঞ্জ’ লেখা থাকলে ঝামেলা কম হবে এবং অনুমতি পেতে সহজ হবে। দরখাস্তটি তৎকালীন জেলা প্রশাসক জনাব ইয়ামিন চৌধুরীর হাতে দেওয়ার পর তিনি দেখেন এবং তিনিও খানিকটা অবাক হন। তবে এই উদ্যোগ নেওয়ায় তিনি বেশ খুশি হয়েছিলেন। আবেদনটি তাঁর হাতে দেওয়ার সময় আমরা একটা ছবি তুলি। সেখান থেকে বের হয়ে দাদাকে বলি, অনুমতি পেলে পত্রিকা বের করতেন তো? নাকি এমনি নিলেন। তিনি জোড় দিয়েই বলেন, পত্রিকা করবেনই।
দিন যায়, একদিন আবার ফোন, দাদার যেন আর খুশি ধরে না, পত্রিকার অনুমিত হয়ে গেছে। সেই কাগজ হাতে পেয়ে আমাকে ফোন করেছেন। সেই দিন থেকেই উৎসাহ প্রবল বেড়ে গেছে। তিনি শহরে আমাদের আপনজনদের বিষয়টি জানিয়ে প্রস্তুতি শুরু করেন। তবে অনেকেই সেটা সম্ভব হবে কিনা এই নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন। এর অবশ্য বেশ কারণ ছিল, পত্রিকা প্রকাশনায় আর্থিক বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা কীভাবে ম্যানেজ হবে। পঙ্কজ দার স্বপ্ন আর সাহসের কাছে অবশ্য সব বাধা এক সময় তুচ্ছ হয়ে যায়।
দিনের পর দিন বৈঠক, নানাজনের পরামর্শ, সহযোগিতায় প্রস্তুতি এগিয়ে যায়। প্রস্তুতির চূড়ান্ত পর্বে প্রকাশের দিনক্ষণ ঠিক হবে। তখন আগস্ট মাস সামনে। এই শোকের মাসে পত্রিকার বের না করার পরামর্শ দেন অনেকেই। সিদ্ধান্ত হয়, জুলাই মাসের ৩০ তারিখেই প্রকাশিত হবে ‘দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর’। ২০১২ সালের ৩০ জুলাই।
সময় বড়ই দ্রুত চলে যায়। চার বছর চলে গেছে। সুনামগঞ্জের খবর একদিনের জন্যও প্রকাশনা বন্ধ থাকেনি। সুনামগঞ্জের খবর প্রথম সংখ্যা সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়। এমন বড় কলেবরে সুনামগঞ্জ থেকে একটি দৈনিক পত্রিকা বের হয়েছে, এটা সবাইকে মুগ্ধ করে। এরপর প্রতিদিনের পত্রিকার সঙ্গে সমৃদ্ধ বিশেষ সংখ্যাগুলো পাঠকদের প্রত্যাশা পূরণে সচেষ্ট হয়েছে। শুধু তাই নয়, সুনামগঞ্জের পাঠকের কাছে এখন সুনামগঞ্জের খবর অতিপ্রিয় একটি পত্রিকা। অনেকের পরিবারের সদস্য এখন সুনামগঞ্জের খবর। অনেকেই সকালে পত্রিকাটির অপেক্ষায় থাকেন। পেতে দেরি হলে ভালো লাগে না তাদের। ভুল-ত্রুটি যে হয় না, এমনটা নয়। এসব বিষয়গুলি আবার পাঠকেরাই সরাসরি সম্পাদককে জানান। একটা বিশ্বাস-আস্থা তৈরি হয়েছে সুনামগঞ্জের খবরের প্রতি। এই প্রতিষ্ঠানের কর্র্মীদের প্রতি। এখানেই সুনামগঞ্জে খবরের সার্থকতা।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের পর শহর থেকে আরও কয়েকটি দৈনিক প্রকাশিত হয়েছে। এর আগেও দুয়েকটির নাম আমরা শুনেছি, তবে সেগুলো নামেই ছিল, পাঠকের হাতে দেখা যেত না। সুনামগঞ্জে দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের ক্ষেত্রে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর পথ প্রদর্শক। এখন আমার মনে হয়, পত্রিকা প্রকাশ করা হয়তো সহজ, কিন্তু পাঠকেরা কাছে গ্রহণযোগ্যতা, আস্থা অর্জন অত সহজ নয়, যেটা দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর পেরেছে। এর পেছনে রয়েছে প্রতিষ্ঠানের সব কর্মীদের নিরলস শ্রম, ভালো করার চেষ্টা এবং পাঠকের প্রতি দায়বদ্ধতা। আমি দেখেছি, নানা চাপ, টানাপোড়েন ছাপিয়ে প্রতিদিন দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর পাঠকের হাতে পৌঁছাতে কত কষ্ট করেন পঙ্কজ দা এবং প্রতিষ্ঠানের সব কর্মীরা। পরদিন যখন কেউ পত্রিকার কোনো সংবাদের প্রশংসা করেন, তখন পেছনের সব কষ্ট ভুলে যান তারা। আসলে সংবাদপত্রকে প্রতিদিন পাঠকের কাছে পরীক্ষা দিতে হয় এবং প্রতিদিনই পাস করতে হয়। এখানে সময় নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আজকের চেয়ে আগামিকালের ফল আরও ভালো হতেই হবে। না হলে ঠিকে থাকা যাবে না। এই পরীক্ষা চলতেই থাকবে। সুনামগঞ্জে খবরের এই পরীক্ষা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন নিজের সঙ্গে। অন্য কারো সঙ্গে নয়। দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর পাঁচ বছরে পা দিয়েছে। আমাদের এই প্রিয় শহরের প্রিয় মানুষদের প্রিয় পত্রিকা এখন সুনামগঞ্জের খবর। পাঠকই সুনামগঞ্জের খবরকে এগিয়ে নেবেন সামনের দিকে। অতীতে যেটি তাঁরা করেছেন।
লেখক: সাংবাদিক ও আইনজীবী