জেলা প্রশাসক জেলার ১৮টি পাঠাগারে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই বিতরণ করেছেন। মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠাগার কর্তৃপক্ষের হাতে এই বইগুলো তুলে দেওয়া হয়েছে। বইগুলো মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় বিতরণের জন্য সরবরাহ করেছে। দেশের নতুন প্রজন্মকে স্বদেশ, এর নির্মাণের ইতিহাস ও জাতীয় বীরদের সাথে পরিচিত করিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে বই বিতরণের এই উদ্যোগটি প্রশংসনীয় ও সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। আমরা এজন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে ধন্যবাদ জানাই, সাথে সাথে কামনা করি এই ধরনের উদ্যোগের পরিধি ও পরিমাণ আরও বাড়–ক। তবে বিতরণকৃত বইগুলো যাতে পাঠাগারের আলমিরার মধ্যে আটকে না থাকে সেজন্য পাঠাগার কর্তৃপক্ষকে পাঠাভ্যাস গঠনের দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। আমাদের নতুন প্রজন্মের পাঠ্যসূচিবহির্ভূত বই পাঠে নিদারুণ অবহেলার বিষয়টি সুবিদিত। এখন বই পাঠের চাইতে ফেসবুকিংয়ে তাদের অপার আনন্দ। অনেকে তথ্যপ্রযুক্তির চমৎকার সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে হীন সব কর্মকা-ে। একটি বড় অংশ যৌনতা নির্ভর বিভিন্ন সাইটে সময় ব্যয় করে থাকে বলে বিভিন্ন অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। পাঠ অনীহা এবং বিভিন্ন মন্দ উপসর্গে আমাদের তরুণ ও যুব সমাজের জড়িয়ে পড়ার এই তথ্যগুলো জাতিবিধ্বংসী । ভবিষ্যতে দেশকে যারা নেতৃত্ব দিবে, যারা সমাজ ও পরিবারের হাল ধরবে সেই তরুণ প্রজন্মকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা তাই রাষ্ট্রের অপরিহার্য কর্তব্য বিশেষ। এই জায়গায় পাঠাভ্যাস বৃদ্ধি বিষয়ে মনোযোগী হওয়া একটি কার্যকর উপায় রূপে পরিগণিত হয়ে থাকে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই বিতরণের কর্মসূচিটি যদি এই লক্ষ্যাভিমুখী হয় তবেই এটি স্বার্থক হবে।
বই পাঠে অনীহার বিষয়টি নতুন নয়। এই অনীহা প্রমাণ করে যে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা জ্ঞান তৈরির কাজে অসফল হয়েছে। অথচ শিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো আলোকিত মানুষ তৈরি করা। আলোকিত মানুষগুলো সমাজ ও রাষ্ট্রের যাবতীয় অন্ধকার দূর করবে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো আমাদের জনপদে বরাবরই প্রাতিষ্ঠানিক লেখা পড়ার বিষয়টি একটি চাকুরি পাওয়ার যোগ্যতা অর্জনের বিষয়রূপে শিক্ষার্থীদের কাছে বিবেচিত হয়েছে। শিক্ষার প্রতি এই মানসিকতা দিনে দিনে আরও অবনতিশীল পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে। আজকাল প্রাইমারি সমাপনী পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও নাকি ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ নকল প্রবণতা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে পৌঁছে গিয়েছে। ফলে জ্ঞান ও দক্ষতানির্ভর বিশ্ব ব্যবস্থায় আমরা প্রত্যাশিত জায়গা করে নিতে পারছি না। শিক্ষা মানুষের মননশীলতা তৈরির উপকরণও বটে। আজ ব্যক্তির মধ্যে যে হিং¯্রতা, লোভ, স্বার্থান্ধতা, অসহিষ্ণুতা দেখা যায় তার পিছনে অপরাপর সামাজিক অনুষঙ্গের সাথে শিক্ষা ব্যবস্থারও যে একটি যোগসূত্র রয়েছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আমাদেরকে অবশ্যই ওই জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
এখন প্রতিটি উপজেলায় সরকারি পাঠাগার আছে। সরকার ইউনিয়ন পর্যায়ে পাঠাগার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছেন। পাঠাগারগুলোকে কার্যকর অর্থে গতিশীল করা গেলে মানুষের মনন তৈরির জায়গাটি শক্ত হবে। এই জায়গায় পাঠাগার কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব অপরিসীম। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র যেমন করে সারা দেশে পাঠাভ্যাস তৈরিতে আলোড়ন তুলতে পেরেছে, সেই উদাহরণ অনুসরণ করে দেশের প্রতিটি পাঠাগারকে এগিয়ে আসতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই বিতরণের প্রাসঙ্গিকতায় এই আমাদের প্রত্যাশা।