- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

পাঠ-প্রতিক্রিয়া- ‘আমারে ডর দেখাইও না বুলবুলি’

কুমার সৌরভ
[শিল্পী সংগ্রামী কমরেড ভবতোষ চৌধুরী, গুরুপ্রসাদ দেবাশীষ কর্তৃক সংকলিত ও সম্পাদিত, প্রকাশক-মূর্ধন্য, ঢাকা, প্রকাশকাল- ২০২২]
গণসঙ্গীতশিল্পী ও রাজনীতিক কমরেড ভবতোষ চৌধুরীকে (১৯৫৫-২০১১) নিয়ে স্মৃতিচারণ ও মূল্যায়নধর্মী সংকলনগ্রন্থ ‘শিল্পী সংগ্রামী কমরেড ভবতোষ চৌধুরী’। তিনি সিলেট উদীচী ও সিপিবি’র সাথে জড়িত থেকে গণমানুষের রাজনীতি ও গণসঙ্গীত চর্চায় নিয়োজিত ছিলেন। সংকলনে ৩৪টি স্মৃতিচারণ ও মূল্যায়নধর্মী নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। লেখকরা শিল্পীর জীবন, কর্ম ও চরিত্রের নানা দিক নিয়ে স্মৃতি ও বিশ্লেষণ হাজির করেছেন যা একজন পূর্ণাঙ্গ ভবতোষ চৌধুরীকে আবিষ্কার করতে সহায়ক। এসব লেখার মাধ্যমে ভবতোষ চৌধুরীর জীবন দর্শনের একটি রূপ খুঁজে পাওয়া যায়। এই দর্শন হলোÑ মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য। এ ছাড়া শিল্পীর নিজের রচিত ৩৬ টি গণসঙ্গীত ও ২টি ছোটগল্প, ১টি প্রবন্ধ ও ১টি সাক্ষাৎকার এই সংকলনের মূল্যবান ভুক্তি। স্মৃতি সংকলন হলো- উদ্দীষ্ট ব্যক্তির দশদিক এক মলাটে আবদ্ধ করা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিটি জীবনের নানা বাঁকে যাদের সাথে চলেছেন তাদের চাইতে বেশি চেনা আর কারও দ্বারা সম্ভব নয়। তাই এরকম স্মৃতি সংকলনে সাধারণত স্মৃতিচারণমূলক লেখার প্রাধান্যই থাকে। সংকলনটি ভবতোষ চৌধুরীর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে জানতে সহায়ক হবে। একইসাথে সংকলনটি এই সংগ্রামী শিল্পীর সাধনা ও আদর্শকে জনমনে স্থায়ী করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানুষের মাঝে আদর্শিক চেতনা জাগাতেও সক্ষম হবে।
কমরেড ভবতোষ সোনালী ব্যাংকে চাকুরির সুবাদে সিলেট বসতি স্থাপন করেন। ব্যাংকের সিবিএ রাজনীতিতে জড়িত থেকে আন্দোলন সংগ্রাম করার কারণে ১৯৮১ সনে চাকুরীচ্যুত হন। পরে আর চাকুরী ফিরে পাওয়ার চেষ্টা না করে সার্বক্ষণিক রাজনীতি ও গণসঙ্গীত চর্চায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। চেষ্টা করলে আইনী পন্থায় কিংবা আপোস করে তিনি চাকুরী ফিরে পেতে পারতেন। কিন্তু ভবতোষ ও পথ মাড়াননি। তিনি যে চাকুরীর মত ক্ষুদ্র গ-িবদ্ধ জীবন যাপনের জন্য জন্মাননি। তিনি আরও বড় দায়িত্ব নিয়ে পৃথিবীতে এসেছেন। তাই সময়ের আহ্বানে নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগে বিন্দুমাত্র ভাবেননি তিনি। চাকুরীচ্যুতির পর গভীরভাবে রাজনীতি ও সংস্কৃতি চর্চায় জড়িত হন। তিনি সিলেটসহ সারাদেশে গণসঙ্গীতের মাধ্যমে জাগরণ সৃষ্টিতে স্বকালে অনবদ্য ভূমিকা রেখেছেন। বিশেষ করে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন, মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলনে তাঁর সাংগঠনিক ও সাঙ্গীতিক ভূমিকা ছিল অসামান্য। ব্যক্তিগত জীবনে অসাম্প্রদায়িক ও উদার মনোভাব পোষণ করতেন। সিলেটের গণমানুষের কবি দিলওয়ারকে তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। তাঁর বিয়েতে কবি দিলওয়ার অভিভাবকত্ব করেছিলেন। সিলেট অঞ্চলের আরেক প্রবাদপ্রতীম ব্যক্তি গণমানুষের লোকশিল্পী শাহ্ আব্দুল করিমের সাথেও তিনি অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ সময় কাটিয়েছেন। আদর্শগতভাবে সিপিবি’র রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হলেও সামাজিক সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে তিনি সিলেটের বামপন্থী অনেকের সাথে সুসম্পর্কের বন্ধনে জড়িয়ে পড়েছিলেন। সাম্যবাদী দলের নেতা কমরেড আছদ্দর আলী এরকম একজন। ভবতোষ চৌধুরী মনে করতেন গণমানুষের পক্ষে কথা বলা এবং সকলের একই মঞ্চে মিলিত হওয়া একান্ত দরকার। সকলে মিলে একসাথে সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখতেন কমরেড ভবতোষ চৌধুরী।
তিনি প্রায় তিন শতাধিক গণসঙ্গীত রচনা করেছেন। দুর্ভাগ্য তাঁর অধিকাংশ গানই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। জীবন সম্পর্কে উদাসীন ভবতোষ নিজের সর্জিত গানের বিষয়েও উদাসীন থেকেছেন। সময়ের প্রয়োজনে অনবরত গান লিখেছেন, সুরারোপ করেছেন, গেয়েছেন মঞ্চ থেকে মঞ্চে, এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়। কিন্তু গানগুলো পা-ুলিপি আকারে সংরক্ষণের চিন্তা আসেনি তাঁর মাথায়। তিনি লিখে রেখে যাননি এসব মূল্যবান গীতসম্ভার। আজ যখন তিনি নেই তখন হারিয়ে গেছে তার সৃষ্টিও। সংকলকরা খুঁজে ও বিভিন্ন জনের সাথে যোগাযোগ করে অতি অল্প গানই উদ্ধার করতে পেরেছেন। সংকলনে অন্তর্ভুক্ত ৩৬টি গানই আপাতত হারাধনের মানিক। তাঁর গানগুলো উদ্ধারে সংশ্লিষ্টদের আরও উদ্যোগী ভূমিকা প্রয়োজন। যাঁরা ভবতোষ চৌধুরীর গান গেয়েছেন বা যাদের কাছে তাঁর গান সংরক্ষিত আছে এ কাজে তাঁদের আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসা উচিৎ। কোন অবস্থাতেই ভবতোষ চৌধুরীর গানগুলোকে হারিয়ে যেতে দেয়া উচিৎ হবে না।
স্মৃতিচারণমূলক লেখাগুলোতে এই শিল্পী কমরেডের পার্টি ও রাজনীতির প্রতি আনুগত্য, নিবেদন ও গণরাজনীতির প্রতি দায়বদ্ধতার কথা উঠে এসেছে। অন্যের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ার এক সহজাত গুণ ছিল তাঁর চরিত্রে। আর আদর্শিক ডাক আসলে ভুলে যেতেন ব্যক্তিগত সবকিছু। ব্যডক্তগত জীবনে ছিলেন ভয় ডরহীন মানুষ। নিজে গানে যেমন বলেছেন- ‘আমি বাংলাদেশের বাঙালি আমারে ভয় দেখাইও না বুলবুলি’ ব্যক্তিজীবনেও ছিলেন এমনই নিঃশঙ্ক। পরিবেশ পরিস্থিতির প্রতিকূলতাকে জয় করেছেন চারিত্রিক দৃঢ়তা দিয়ে। তবে নিজেকে নিয়ে ছিলেন একেবারেই উদাসীন। এমনও হয়েছে বাসায় কাউকে কিছু না বলে দূরে চলে গেছেন তিনি পার্টির কাজে বা গণসঙ্গীতের আসরে। তিনি গণমানুষের স্বার্থ সংরক্ষণে সার্বক্ষণিক সময় দিতে গিয়ে উপেক্ষা করছেন সাংসারিক ও পারিবারিক দায়-দায়িত্ব। এ দায়িত্ব সামলেছেন শিল্পীর যোগ্য ও সংগ্রামী সহধর্মীনি লাকী চৌধুরী। ২০০৪ সনে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হলে শিল্পীর সংগ্রামী পথচলার গতি বন্ধ হয়ে পড়ে। আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে তাঁর সুচিকিৎসা না হওয়ার বিষয়টি অনেক লেখকের স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে। এ সময় তাঁর প্রতি উপেক্ষা দেখানোর প্রসঙ্গও অনেকেই সখেদে উল্লেখ করেছেন। এই অসুস্থতাই ২০১১ সনের ১৯ নভেম্বর শিল্পীকে মৃত্যুর হিমশীতল অন্ধকারে নিয়ে যায়।
সংকলনে অন্তর্ভুক্ত তাঁর রচিত গণসঙ্গীত কয়েকটির কতিপয় চরণ নীচে দেয়া হলো-

আমি বাংলাদেশের বাঙালী,
আমারে ডর দেখাইও না বুলবুলি
আমি ভাষাশহিদ বাঙালি
আমারে ডর দেখাইও না বুলবুলি।
সাগর সাগর নদী নদী,
ঢালছে রক্ত নিরবধি গো
আমার আগের যত বাঙালি
আমারে ডর দেখাইও না বুলবুলি।

ব্রিটিশ আমলে পাইলায় শোষণ
পাঞ্জাব আমলে খোয়াইলায় ধন
বাঙাল আমলে ক্ষুধায় মরণ
কি করছিলায় পাপ গো আমার বাঙালি না বাপ।

বাগানমে চা ছরমিক যেতনি ভগ্নীভাই
হামরা পাত্তি তুলকে সারে জীবন কাটাই।।
বড়োবাবু ছোটোবাবু বড়ে ম্যানেজার
শাসনকে লিয়ে সবই একই বরাবর
খালি মাংতা বেশি বেশি কাম করনা চাই।।

ভোট দেব মা বলো কত মনরে আমার
ভোটের বোঝা বয়ে বয়ে চাষার প্রাণ যে ওষ্ঠাগত
উৎপাদনের মন্ত্র লয়ে ফসল ফলাই মাঠে মাঠে মা
ওগো, বেটা আমার জটর জ্বালায় মনরে আমার
শাসন আর মানবে কত

ওহো সামাল সামাল ভাই জোট বাঁধো আজ
সময় চলে যায়, যায় রে
তোমার আমার ঘরে অন্ধকার
সুখের পাখি ঐ যায় উড়ে।।
আমাদেরই মেহনতে কারখানার চাকা চলে রে
আমাদেরই রক্তঘামে ক্ষেতে সোনা ফসল ফলে রে।।

আজকের দিনটা শ্রমিকের, আজকের দুনিয়াটা শ্রমিকের
আজকের দিনটা আমাদের, আজকের দুনিয়াটা কৃষকের
হো হো হো হো হো হো হো।।

বড়লোক সব স্বাধীন হইল, চাষি হইল না
দুঃখ গেল না, দুই তিনবার তো স্বাধীন হইলাম দুঃখ গেল না
ব্রিটিশের মন্ত্র পাইয়া, একি কায়দা যায় চালাইয়া
শাসন শোষণ বাড়ায় তারা, টেকশো কমে না
দুঃখ গেল বা। বড়লোক…।।
পাদটীকা
এমন মূল্যবান সংকলনটি আরেকটু সুসম্পাদিত হওয়া উচিৎ ছিল। বেশ কিছু ভুল বানান বইয়ের গাম্ভীর্য ক্ষুণœ করেছে। এই সামান্য ত্রুটিটুকো বাদ দিলে সংকলনটি এতদঞ্চলের এক মহান সংগ্রামীর জীবনের আলেখ্য হয়ে বহু মূল্যবান দলিল হিসাবে বিবেচিত হবে। সম্পাদকম-লীকে এজন্য অভিনন্দন ।
আক্ষেপ
জনগণের জন্য উৎসর্গীকৃত মহান ব্যক্তিদের স্মৃতি ধরে রাখার প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা আমাদের দেশে একেবারেই নেই। কমরেড ভবতোষও কালের গর্ভে হারিয়ে যেতেন তাঁর পরিজন উদ্যোগ গ্রহণ না করলে। আমাদের এই সীমাবদ্ধতা ও ক্ষুদ্রতা কাটিয়ে ওঠা জরুরি। গুণীদের কদর করা বা স্মরণ করা এজন্য নয় যে, এতে তাঁরা মহিমান্বিত হবেন। বরং এজন্য করা দরকার যে এতে সমাজে আরও কীর্তিমান তৈরির পথ সুগম হয়। আদর্শকে সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে হলে আদর্শবানদের পাদপ্রদীপের সামনে আনতে হবে। এ দায়িত্ব আদর্শিক সংগঠনগুলোরই।
সংগ্রামী শিল্পী কমরেড ভবতোষ চৌধুরীর অমর স্মৃতির প্রতি অভিবাদন।

  • [১]