- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

পাথর কোয়ারিগুলোতে অব্যাহত মৃত্যুর মিছিল বন্ধ করুন

সিলেটের কোম্পানিগঞ্জে টিলা কেটে অবৈধ পাথর কাটায় নিয়োজিত করায় শনিবার আনিস আলী নামের আরেক শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই নিহত শ্রমিক আনিস আলীও সুনামগঞ্জের বাসিন্দা। সদর উপজেলার আহমেদাবাদ গ্রামের কমরউদ্দিনের ছেলে তিনি। এর আগে গত বৃহস্পতিবার সিলেটের গোয়াইনঘাটে পাথর কোয়ারিতে পাথর কাটার সময় তিন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। নিহত ওই তিন শ্রমিকের দুই জনই ছিলেন সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গোলেরগাঁওয়ের। এরও আগে গত ২৩ জানুয়াির কোম্পানিগঞ্জেই অনুরূপ পাথর উত্তোলনের সময় মাটি চাপায় ৫ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।  আড়াই সপ্তাহে সিলেটের তিন  পাথর কোয়ারিতে নয় জন শ্রমিকের প্রাণ গেল যার তিন জনই সুনামগঞ্জের। নয় শ্রমিক নিহত হওয়ার খবরগুলো জাতীয় গণমাধ্যমে তেমন প্রচার পায় নি। সম্ভবত সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রেই এই গরিব শ্রমিকরা শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গির করুণ শিকার হয়েছেন। সংবাদ প্রচার বাদ দিলেও আইনগত দিকগুলো খতিয়ে দেখলেও শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনায় চরম নিস্পৃহতা লক্ষ করা গেছে প্রশাসনের। গোলাপগঞ্জে নিহত পাথর শ্রমিকদের লাশ কোনরূপ আইনি নিয়ম অনুসরণ কিংবা ময়নাতদন্ত ছাড়াই মালিকপক্ষ লাশগুলো যার যার বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। মালিকের উদ্দেশ্য ছিলো তাদের অবৈধ কাজের ফলে নিহত হওয়ার ঘটনাগুলো চাপা দিয়ে দেওয়া। কিন্তু সুনামগঞ্জের পুলিশ প্রশাসনের সময়োচিত ভাল সিদ্ধান্তের কারণে শেষ পর্যন্ত লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। একটি মামলাও রুজু হয়েছে। সুনামগঞ্জের পুলিশ প্রশাসন এই ব্যবস্থা না নিলে ঘটনাটি এখানেই পাথরচাপা পড়ে যেত নিঃসন্দেহে। এজন্য আমরা সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার ও সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ধন্যবাদ জানাই। শনিবার ও ২৩ জানুয়ারির শ্রমিক নিহতের ঘটনায় কোম্পানিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করার মতো একটি মামুলি প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন ওখানকার পুলিশ প্রশাসন।
সিলেটের বিভিন্ন কোয়ারিতে পাথর শ্রমিকদের নিহত হওয়ার ঘটনা কয়লাখনিতে শ্রমিক নিহত হওয়ার ভয়াবহ স্মৃতিগুলো স্মরণ করিয়ে দেয়। টিলা কেটে কিংবা বোমা মেশিন ব্যবহার করে পাথর আহরণ করা সম্পূর্ণরূপে অবৈধ। কিন্তু ঠিক এই কাজগুলোই দেদারসে চালু রয়েছে সিলেটের গোয়াইনঘাট, কোম্পানিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের সদর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায়। স্থানীয় প্রভাবশালীরা এইসব অবৈধ কর্মকা-ে নিয়োজিত। প্রতিহত করার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তাগণ এদেরকে সহযোগিতা করেন। ঠিক এই ধরনের কাজে সহযোগিতার ব্যাপক অভিযোগ উঠেছিল কোম্পানিগঞ্জের এক উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বিরুদ্ধে যিনি পরবর্তীতে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় বদলী হয়ে এসেছিলেন। প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ তৎপর থাকলে কখনও এমন অবৈধ কাজ চলতে পারে না, এটি শিশু মাত্রও বুঝতে সক্ষম।
পরিবেশ বিধ্বংসী একইসাথে নিয়োজিত শ্রমিকদের জীবনের জন্য চরম হুমকি হয়ে উঠা এই পাথর আহরণ কর্মকা-ের বিষয়ে সরকার তড়িৎ ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এই সর্বনাশের বিস্তার কোন পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে তা অনুমান করা শক্ত। লোক দেখানো তৎপরতায় এসব বন্ধ করা যাবে না। সিলেটের গোয়াইনঘাট ও কোম্পানিগঞ্জের তিনটি দুর্ঘটনার বিষয়ে আইনের যথাযথ প্রয়োগ আমাদের একান্ত কাম্য। এখানে যে ব্যক্তিরা কোয়ারি ও পাথর কাটার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন তাদের প্রত্যেকে কঠোর আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি করা দরকার। নিহত-আহত শ্রমিকদের জন্য তাদের নিকট থেকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ আদায় করাও আরেক মুখ্য কর্তব্য। যে শ্রমিকরা নিহত হয়েছেন তারা নিতান্ত পের্টে তাগিদে এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত হয়েছিলেন। নিহত হওয়ায় তাদের পরিবার এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পতিত হয়েছে। অসহায় এই পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব। সবচাইতে বেশি প্রয়োজন পাথর কোয়ারিগুলোতে অব্যাহত মৃত্যুর মিছিল বন্ধ করা।  

  • [১]