কয়েকদিন আগে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে সুনামগঞ্জের কয়েকটি স্থানে যথেচ্ছভাবে স্টোনক্রাশার মেশিন চালানোর একটি খবর প্রকাশিত হয়েছিল। জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে একটি সভা আয়োজন এবং ওই সভায় অবৈধ ও যথেচ্ছভাবে স্টোনক্রাশার মেশিন চালানো নিয়ন্ত্রণের লক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর প্রচারিত এই সংবাদের মধ্য দিয়ে ক্ষতিকর স্টোনক্রাসার মেশিনের বিষয়টি জনসমক্ষে প্রকাশিত হল। সুনামগঞ্জে স্থানীয়ভাবে উত্তোলিত পাথর ও ভারত থেকে বৈধ-অবৈধ পথে আসা পাথর ভাঙতে এইসব ক্রাসার মেশিন চালানো হয়। এটি এই অঞ্চলের একটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। জানা যায়, বিভিন্নœ বাণিজ্যিক ব্যাংক স্টোনক্রাশার মেশিন স্থাপনের জন্য প্রচুর ঋণ দিয়ে থাকে। যেকোন ব্যবসা যদি মানুষের জন্য ক্ষতির কারণ না হয় তাহলে সেটিকে অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের জন্য ভাল বলতে হয়। কিন্তু স্টোনক্রাশার মেশিনগুলো যেভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে তাতে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য ব্যাপকভাবে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে বলে এই ব্যবসায়কে আপাতত ভাল বলার সুযোগ নেই। প্রথমত স্টোনক্রাশার মেশিনগুলো জনবিচ্ছিন্ন কোন এলাকায় স্থাপন করা হয়নি। ফলে স্টোনক্রাশারের বিপুল শব্দে মানুষের শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মেশিন যখন চালু থাকে তখন এ থেকে উৎপন্ন তীব্র শব্দ মানুষের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। শিশুরা ভয় পেয়ে যায়। অন্যদিকে পাথর ভাঙার সাথে এ থেকে বিপুল পরিমাণ পাথর চূর্ণ তৈরি হয় যা বাতাসে মিশে গিয়ে মানুষের ফুসফুসের ক্ষতি করে চলে। যেসব এলাকায় ক্রাশার মেশিন চালানো হয় সেসব এলাকার লোকজন এর ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে বলেছেন। জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এমন মেশিনের ব্যবহার তাই নিয়ন্ত্রণের জোর দাবি উঠেছে।
পাথর ভাঙার কাজটি নিয়ন্ত্রণ ও ঝুঁকিমুক্ত করতে জেলা প্রশাসন বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের চিন্তা করছেন বলে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ডিবিসি নিউজে প্রচারিত একটি অনুষ্ঠানে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসকের বক্তব্য থেকে জানা যায়। এর মধ্যে প্রধান হলোÑ এই মেশিনের ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ন্ত্রণে আনা। একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে ক্রাশার মেশিন চালানোর চিন্তা করা হচ্ছে। অবশ্যই জায়গাটি হবে নির্জন ধরনের। অর্থাৎ স্টোনক্রাশার মেশিনগুলো যত্রতত্র চালানোর পরিবর্তে জোনভিত্তিক পরিচালনার ব্যবস্থার কথা ভাবা হচ্ছে। এই লক্ষে ক্রাশার মালিকদের উদ্বুদ্ধকরণের কাজ শুরু করা হয়েছে বলে ওই অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন। আরেকটি উদ্বেগজনক তথ্য হলÑ জেলায় ঠিক কতটি ক্রাশার মেশিন চলছে তার কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। জেলা প্রশাসনের জানার বাইরেও প্রচুর ক্রাশার বিভিন্ন জায়গায় চলছে। আর এইসব মেশিনের সিংগভাগেরই নেই কোন কর্তৃপক্ষীয় অনুমোদন। নিয়ম মোতাবেক পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এইসব ব্যবসা পরিচালনার জন্য জেলা প্রশাসনের অনুমতির সাথে পরিবেশ অধিদপ্তরেরও ছাড়পত্র গ্রহণ করতে হয়। কিন্তু সুনামগঞ্জ অঞ্চলে যেসব পাথর ভাঙার মেশিন চালানো হয় তারা এসব অনুমতি বা ছাড়পত্রের ধার ধারছেন না। সুতরাং পাথর ভাঙার এই ব্যবসাকে কর্তৃপক্ষীয় নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে আসাও আরেকটি বড় কাজ।
সুনামগঞ্জের চলতি নদীতে অবৈধ বোমা মেশিন ব্যবহারের মাধ্যমে পাথর উত্তোলনের মত বিপদজনক কর্মকা- পরিচালিত হয় বলে প্রায়শ গণমাধ্যমে খবর হয়। এইসব পাথর ভাঙার কাজে নিয়োজিত ক্রাশার মেশিনগুলোও অবৈধভাবে পরিচালিত হয়ে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের বারটা বাজিয়ে চলেছে। অবৈধ যাবতীয় কর্মকা-ই আইনি পন্থায় দমন করা আবশ্যক। আশার কথা হলÑ দেরিতে হলেও ক্রাশার মেশিনের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জেলা প্রশাসন কার্যকর চিন্তা-ভাবনা শুরু করেছেন। সুতরাং আমরা আশা করতে পারি, পাথর ভাঙানোর ব্যবসাটি অচিরেই একটি নির্দিষ্ট জোনে চলে যাবে। এবং সকলেই নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ও ছাড়পত্র নিয়ে এই ব্যবসা পরিচালনা করবেন। আমরা জানি, বালু ও পাথর এই অঞ্চলের অর্থনীতির অন্যতম প্রাণশক্তি। বহু মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এর উপর নির্ভরশীল। এই ব্যবসা নিয়ম মেনে পরিচালিত হোক তাই আমাদের কামনা।