- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

পাথর শ্রমিক তানভিরের জীবন কি এতোই তুচ্ছ?

কার্গো থেকে পাথর উঠানো নামানোর সময় তানভির মিয়া নামের এক শ্রমিক পা ফসকে নদীর পানিতে পড়ে যায়। গত মঙ্গলবার দুর্ঘটনাটি ঘটে ছাতকের সুরমা নদীতে। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে খোঁজে পাওয়া যায়নি। ৫ ঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরীরা নদী থেকে তার লাশ উদ্ধার করে। অনিরাপদ কর্মপরিবেশের কারণে আমাদের দেশে অহরহ এমন দুর্ঘটনা বেড়ে চলেছে। কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুতায়িত হয়ে শ্রমিক মারা যায়, বহুতল ভবনের কাজ করতে যেয়ে নির্মাণ শ্রমিক নিহত হয়, বদ্ধ ফ্যাক্টরিতে আগুনে দগ্ধ হয়ে দলে দলে মরে যায় শ্রমিক। এরকম খবর প্রায়শই সংবাদপত্রের পাতায় ছোট্ট হেডিংয়ের নিউজে আসে। পরে এই হতভাগ্য শ্রমিকদের নিয়ে তেমন কোনো কথাবার্তা আর বজায় থাকে না। এরা কেউ সমাজের বিশিষ্ট কেউ নয়, এদের জন্য কথা বলার তাই কেউ থাকে না। দুর্ঘটনায় মৃত্যুকে এদের কপালের লিখন বলে চালিয়ে দেয়ার চতুর প্রবণতা থাকে। এদের পরিবার দুর্ঘটনায় মৃত্যু ঘটার কারণে কোনো ক্ষতিপূরণ পায় কিনা সংবাদপত্রে সেসব ফলোআপ নিউজ প্রকাশ হয় না কখনও। যেন বা একজন শ্রমিকের মৃত্যুতে এই বিশাল পৃথিবীর কিছুই আসে যায় না। একজন মরে গেলে আরও দশ জন ছুটে আসবে তার জায়গা দখল করতে। এই সামাজিক অমনোযোগিতার কারণে শ্রমিকদের কর্ম এলাকা বা কর্মপরিবেশ যে ক্রমাগত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে সেই বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যায়।
শ্রমিকদের কাজের জায়গার পরিবেশ কেমন হবে, সেখানে ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য কী কী আগাম ব্যবস্থা নিতে হয়; এসব বিষয়ে দেশে আইন আছে। কিন্তু কোথাও শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ ঝুঁকিহীন করার জন্য মালিকদের তৎপরতা চোখে পড়ে না। প্রাতিষ্ঠানিক কতিপয় জায়গায় কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও অপ্রাতিষ্ঠানিক জায়গাগুলোতে শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য ন্যূনতম ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না। দুর্ঘটনার জন্য কোনো মালিকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের খবর পাওয়া যায় না। ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকের পরিবার কোনো উপযুক্ত ক্ষতিপূরণও পান না। মালিক পক্ষ রাষ্ট্রীয় এই ঔদাসিন্যের কারণে বেপরোয়া হয়ে কাজের মানুষের জীবনকে বাজি রেখে নিজেদের মুনাফা বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় মেতে উঠার সুযোগ পান। অন্য কথায় বলা যেতে পারে, প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থাটি মালিকদের স্বার্থের সহায়ক। এই ব্যবস্থায় শ্রমজীবীর স্বার্থ রক্ষিত হয় না।
আমরা গাল ফুলিয়ে গলা উঁচু করে শ্রমিক, কৃষক, মেহনতী মানুষের জন্য সুন্দর কথামালা রচনা করি বিশেষ বিশেষ দিবসে। আমরা বলি, এবং এ কথাটাই সত্য, শ্রমজীবীদের কারণেই আমাদের উন্নয়নের চাকা সচল রয়েছে। আজ আমরা যে প্রবৃদ্ধির কথা বলি, জাতীয় আয় বাড়ার যে আত্মতৃপ্তি অনুভব করি, উন্নয়নের বর্ণনায় উজ্জ্বল হই, স্বল্পোন্নত থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার গর্ব অনুভব করি; সে সবকিছুর পিছনে মূলত এই শ্রমজীবীদের অবদান। এই শ্রমজীবীরা আমাদের কৃষক, শ্রমিক, অভিবাসী কর্মজীবী-শ্রমজীবী। এরা যে উন্নয়নের বিশাল বৃত্ত রচনা করেন তার বড় অংশ ঢুকে যায় অনুৎপাদনশীল বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর পকেটে। শ্রমজীবীদের অবদানে ফুলে ফেঁপে উঠা এই সুবিধাভোগী গোষ্ঠীটি ক্ষমতার অংশ হয়ে উঠে আর পিছনে ফিরে তাকায় না। তাই বিভিন্ন জায়গায় অনিরাপদ কর্মপরিবেশের কারণে শ্রমিকের মৃত্যু ঘটলেও ঘটনাগুলো থেকে যায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রতিকারহীন। এই অবস্থার অবসান ঘটা উচিৎ।
ছাতকে তানভির মিয়ার মৃত্যুর জন্য দায়ী কার্গোর মালিক অথবা তানভিরের নিয়োগকারীর নিকট থেকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ আদায় করে তার পরিবারকে দেয়া হোক। মাত্র ১৭ বছর বয়স ছিলো তানভিরের। তার আরও বহু দিন এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার ছিলো। যাদের কারণে এবং যে অব্যবস্থার জন্য সে বেঁচে থাকতে পারলো না তাদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

  • [১]