সাইদুর রহমান আসাদ
সুনামগঞ্জের হাওর এলাকায় এখনও নিরাপদ খাবার পানির সংকট রয়েছে। হাওরাঞ্চলের নিরাপদ খাবার পানির সংকটের জন্য প্রতি বছর পানি বাহিত রোগের শিকার হচ্ছেন অনেক মানুষ। এছাড়াও শুষ্কু মৌসুমে আছে নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহারের পানির সংকট।
‘বর্ষায় নাও, হেমন্তে পাও’ এই প্রবাদ বাক্যে সুনামগঞ্জের পবিবেশগত বৈচিত্র্যতা ফুটে উঠেছে। হাওর জনপদের জেলা সুনামগঞ্জের বর্ষায় চারদিকে থৈ থৈ পানি থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে জনপদের চিত্র ব্যতিক্রম। শুকনায় টুইটম্বুর হাওর, জলাশয় শুকিয়ে পানির আকাল পড়ে যায়। শহরে বাড়ি বাড়ি গভীর নলকূপ, সাবমারসিবল পাম্প ও সাপ্লাই থাকায় সমস্যা না হলেও পানির সংকট দেখা দেয় ওই সময় প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে। এসময় নিরাপদ খাবার পানির সংকটের পাশাপাশি নদী—নালা শুকিয়ে যাওয়ায় গোসল ও অন্যান্য কাজে ব্যবহারেও পানির জন্য দূরে যেতে হয়। পুরো গ্রামের মানুষকে দু’একটি টিউবওয়েলের উপর নির্ভরশীল হতে হয়।
২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের জন্য ১৭ টি লক্ষ্যের মধ্য একটি হলো নিরাপদ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা। এসডিজি ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী বাড়ি বাড়ি টিউবওয়েল দেয়া প্রয়োজন।
জেলা জনস্বাস্থ্য অফিস বলছে, গ্রামে গ্রামে ৮০ জনের জন্য একটি টিউবওয়েলের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এই সংখ্যাটি কমিয়ে আনতে কাজ করছেন তারা। বর্তমানে কমিউনিটি ভিত্তিক পানির ব্যবস্থা নিয়ে কাজ চলছে। এই ব্যবস্থাপনায় তিন কিলোমিটার এলাকায় পাইপ লাইনের মাধ্যমে প্রায় তিনশ’ থেকে সাড়ে তিনশ’ পরিবারকে পানি সরবরাহ করবে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। সেখানে ১ হাজার লিটার পানি ধারণ ক্ষমতা ট্যাংকে উন্নত মোটর দিয়ে পানি তুলা হবে। এছাড়াও ছোট ট্যাংকের মাধ্যমে ১০ টি পরিবারকে নিরাপদ খাবার পানি সরবরাহ করার ব্যবস্থা রয়েছে।
৭ টি জেলা নিয়ে ‘হাওরাঞ্চলে পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন’ নামে আরেকটি প্রকল্পের কাজ চলছে। এই প্রকল্পে সুনামগঞ্জে ৯০ কোটি টাকার বরাদ্দ পেয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪ সনে শেষ হবে। এই কাজ শেষ হলে নিরাপদ খাবার পানির সহজলভ্যতা বাড়বে।
হাওরের বর্তমান চিত্র হচ্ছে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন অপ্রতুলতার জন্য অনেকে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য মতে, গত এক বছরে জেলায় পানিবাহিত রোগ ডায়ারিয়ায় ৬ হাজার ৪৫ জন আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এরমধ্যে সুনামগঞ্জ সদর ২২৫, বিশ^ম্ভরপুর ৫৩, ছাতক ১২৫৮, শান্তিগঞ্জ ৩২১, দিরাই ৪৫০, ধর্মপাশা ২৫৪, দোয়ারাবাজার ১১২৩, জগন্নাথপুর ৩৭৬, জামালগঞ্জ ৪৬৭, শাল্লা ৬৬ ও তাহিরপুরে ১৪৪৩ জন ডায়ারিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন।
মধ্যনগরের বাসিন্দা মুহিত কান্তি দে বলেন, সবার বাড়িতে টিউবওয়েল নেই। যাদের বাড়িতে টিউবওয়েল আছে শুকনা মৌসুমে সেগুলোতে পানি ওঠে না। তখন কষ্ট করতে হয়। নদী শুকিয়ে যায়। তখন গোসল বা স্নান সারতে অসুবিধায় পড়তে হয়।
তাহিরপুর উপজেলার শ্রীপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের পাঠাবুকা গ্রামের বাসিন্দা রিফছন হাবিব বললেন, আমাদের গ্রামের ৩৮৩ টি পরিবার রয়েছে। পুরো গ্রামে সচল টিউবওয়েল রয়েছে থেকে ৯ টি। গ্রামের মানুষ এই টিউবওয়েলগুলো থেকে পানি সংগ্রহ করেন। তিনি আরও বলেন, এখন অনেক টিউবওয়েলে পানি উঠে না। গ্রামের পাশের পাঠলাই নদীতে এখন খুবই অল্প ময়লা পানি। এ কারণে নদীতে গোসল করা যায় না। যে টিউবওয়েলগুলোতে খাবার পানিই পেতে হিসসিম খেতে হয়, সেখানে আমরা গোসলও করি কষ্ট করে।
জামালগঞ্জের বেহেলী ইউনিয়নের হরিনগর বাগানী গ্রামের বাসিন্দা এরশাদ মিয়া বলেন, গ্রামে একজন না একজন ডায়ারিয়ায় আক্রান্ত রোগী থাকে। ২ দিন আগেও আমার পেট খারাপ ছিলো। এখন মোটামুটি সুস্থ আছি।
তিনি বলেন, আমাদের বাড়িতে টিউবওয়েল নেই। অন্যের বাড়ির টিউবওয়েল থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করি। অনেক সময় তাদের টিউবওয়েল নষ্ট হয়ে যায়। এজন্য বাড়ির মালিক বকাঝকা করে। তখন পানি ফুঁটিয়ে পান করি। মেম্বার চেয়ারম্যানকে বলে আসছি আমাদের টিউবওয়েল দেয়ার জন্য। কিন্তু তারা দিচ্ছে না।
তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অফিসার ডা. মির্জা রিয়াদ হাসান বললেন, তাহিরপুরে হাসপাতালে ডায়ারিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অনেক রোগী আসেন। তাদের মধ্যে বেশিরভাগ শিশু। এখনও অনেক মানুষ নিরাপদ খাবার পানি সংকটে রয়েছে। স্যানিটেশনের অপ্রতুলতা তো রয়েছেই। নিরাপদ খাবার পানির অভাব ও স্বাস্থ্য সম্মত স্যানিটেশনের জন্য ডায়ারিয়ায় আক্রান্ত হয় তারা।
সিভিল সার্জন ডা. আহম্মদ হোসেন বললেন, সবাইকে নিরাপদ পানি পান করতে হবে। নিরাপদ খাবার পানির উৎস নলকূপ। সেক্ষেত্রে নলকূপ যদি না থাকে পুকুর বা নদীর পানি ফুটিয়ে পান করতে হবে। এছাড়া খাবার খাওয়ার আগে ভালো করে পরিষ্কার পানি এবং সাবান দিয়ে প্লেট ও হাত মুখ পরিষ্কার করতে হবে। হাওরাঞ্চলের মানুষ এই বিষয়গুলো সচেতন নয়। এসব কারণে তারা পানিবাহিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল কাশেম বললেন, সুনামগঞ্জে নিরাপদ খাবার পানির জন্য কাজ করছি। জেলার ১২ উপজেলায় গত তিন বছরে ১৬ হাজার টিউবওয়েলের বরাদ্দ পেয়েছি। এখানে অনেক এলাকায় শুষ্কু মৌসুমে পানি উঠে না। এসব এলাকায় আমরা গভীর নলকূপ অথবা সাবমারসিল পাম্পের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করছি। গেল ৩ বছরে প্রায় ১০ হাজার নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। আরও ৬ হাজার স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া গ্রামকে যাতে শহরের সুবিধা দেয়া যায়, সেজন্য পাইপ লাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করার কাজ করছি আমরা। এজন্য আরও ১৯৬ টি কমিউনিটি ভিত্তিক পানি সরবরাহ কাজ চলমান রয়েছে।