- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

পানি নেই, বৃষ্টিতে তবু শঙ্কা

স্টাফ রিপোর্টার
আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানি রে, পূবালী বাতাসে
বাদাম দেইখা চাইয়া থাকি, আমার নি কেউ আসে রে।
বাউল সাধক উকিল মুন্সীর এ গান হাওর-জীবনে আজো সমানভাবে প্রতিফলিত। হাওরাঞ্চলের উপজেলাগুলোতে অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্গম। যোগাযোগের সহজ মাধ্যম বর্ষায় নৌপথে যাতায়াত। কিন্তু আষাঢ় মাস এলেও হাওরে এখনো ভাসা পানি নেই। নৌকা পড়ে আছে হাওরের শুকনো মাটিতে। দীর্ঘ তাপপ্রবাহ ও খরার পর ১৩ জুন রাত থেকে আকাশে আষাঢ়ের প্রকৃত রূপ দেখা যাচ্ছে।
গেল বছর এইদিনে সুনামগঞ্জে স্মরণকালের ভয়াল বন্যা শুরু হয়েছিল। সুনামগঞ্জের শহর ও হাওরের মানুষের মনে ওই বন্যার ভীতি আজও দূর হয়নি। দীর্ঘদিন অনাবৃষ্টি ও তীব্র তাপপ্রবাহের পর আকাশ কালো করে ঝুম বৃষ্টি নেমেছে হাওরে। নদ-নদীগুলো পানিতে উপচে ওঠছে। যদিও হাওর এখনো পানিশূন্য। কোনও কোনও হাওরে পানি ঢুকেছে বা ঢুকতে শুরু করেছে। জেলার অন্যতম বৃহৎ শনি ও মাটিয়ানেও পানি ঢুকতে শুরু করেছে। কিন্তু বিশাল এই হাওরে পানি এখনো দৃশ্যমান নয়। যদিও এ সময়ে হাওরজুড়ে নৌযানের অবাধ চলাচলের কথা ছিল। তবে কয়েকদিনে স্বাভাবিক বৃষ্টি ও ঢলের পানিতে আতংক ছড়িয়ে পড়েছে। গেল বছরের বন্যার ভীতি থেকেই এই আতংক ছড়িয়েছে।
তাহিরপুর উপজেলা মাটিয়ান হাওরের মধ্যবর্তী একটি গ্রামের নাম মাটিয়ান। ওই গ্রামের বাসিন্দা ও উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম (৭০) গতকাল বিকেলে সুনামগঞ্জের খবরকে বলেন, আষাঢ় মাসের ২ তারিখ জীবনের প্রথম গ্রাম থেকে পায়ে হেঁটে ৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত শ্রীপুর বাজারে যাচ্ছি। এ অবস্থা আমার জীবনে দেখিনি।
শনির হাওরপারের নোয়ানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শেখর রায় বলেন, প্রতিবছর জ্যৈষ্ঠ মাস থেকেই নৌকায় বিদ্যালয়ে যাই। এ বছর এখন পর্যন্ত সাইকেলে করে স্কুলে যাচ্ছি। রাস্তাও খারাপ। এ সময়ে এসে হাওরের এ অবস্থার সাথে আমরা পরিচিত নই।
তাহিরপুর বাজারের ব্যবসায়ী ও যাত্রাশিল্পী প্রদীপ রায় জানান, আষাঢ় মাসে হাওরজুড়ে ভাসা পানি থাকে। এক সময় মাসব্যাপী বাড়ির কানায় কানায় পানিতে পূর্ণ থাকত। রাত-দিন টানা বৃষ্টি আর সাথে বাওরের (প্রবল বাতাস) কারণে হাওরে সৃষ্টি হতো প্রবল ঢেউয়ের। বাড়ির ইরে (আঙিনা রক্ষার জন্য বাঁধ) আছড়ে পড়তো শক্তিশালী ঢেউ। এভাবেই চলছিল আমাদের হাওর জীবন। কিন্তু এখন অল্প বৃষ্টি হলে হাওরবাসীর মনে ভয় চেপে বসে। আর যদি বাতাসে ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়। তবে কান্নার রোল পড়ে গ্রামজুড়ে। যেখানে-সেখানে নতুন বসতি স্থাপন, রাস্তাঘাট তৈরি ও অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে হাওরে নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে।
খেলাঘর সংগঠনের উপজেলা সাধারণ সম্পাদক মাকছুম মিয়া বলেন, ৩০ বছরেরও অধিক সময় ধরে বর্ষায় হাওরে সাধারণত আগের মতো পানি ও ঢেউ হয় না। তাই নতুন গড়ে ওঠা বসতি এমনকি কিছু সরকারি স্থাপনাও বন্যা লেভেল মেনে তৈরি হয়নি। তাছাড়া গত বছরের ভয়াবহ বন্যার কারণেও মানুষের মধ্যে আতংক রয়েছে। তাই কাঙ্খিত বৃষ্টিতেও আতংক ছড়িয়ে পড়ছে।
তাহিরপুর বাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এরশাদ হোসেন বলেন, এখনো হাওর পানিশূন্য। তাই নৌকা চলছে না। অবস্থাটা এমন হেঁেটও আসতে পারছে না আবার নৌকায় চলছে না। তাই বাজারে ক্রেতা ব্যাপকভাবে কমে গেছে। তাই ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা চলছে।
তাহিরপুর লামাবাজারের ভুসিমালের ব্যবসায়ী হাসান মিয়া বলেন, বাজারে লোকজন কম। পর্যটকও নেই। বছরের যে সময়টাতে ভালো ব্যবসা হওয়ার কথা ওই সময়টাতেই মন্দা চলছে।
তাহিরপুর সদর বাজারের বৃহৎ ব্যবসায়ী সমীরণ কান্তি রায় লিটন বলেন, মাছ হাওরাঞ্চলের অর্থনীতিতে ধানের চেয়েও বেশি ভূমিকা রাখে। হাওরে পানি না থাকায় মাছ ধরতে পারছে না জেলেরা। তাই বাজারের সত্তর ভাগ কেনাবেচা কমে গেছে। হাওরের ধান গোলায় তোলার পর বাজারে কেনাবেচায় যে ধুমপড়ার কথা , তার সিকিভাগও নেই ।
উপজেলার বাদাঘাট বাজারের ধান চাউলের ব্যবসায়ী পরাণ বৈদ্য জানান, বছরের এই সময় প্রতিদিন হাজার মণ ধান আসে মিলে। আমরাও প্রতিদিন কয়েক শ বস্তা চাল বিক্রি করি। কিন্তু হাওরে পানি না থাকায় ধান পরিবহন করা যাচ্ছে না। বাজারে ক্রেতাও আসছে না। চরম বিপাকে আমরা।
তাহিরপুর সদর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জুনাব আলী বলেন, গত ত্রিশ বছর ধরে অধিকাংশ সময়ই আমরা ফেব্রুয়ারি-মার্চ থেকে পানির সাথে হাওরের ফসল রক্ষার লড়াই করি। কিন্তু এ বছর ছন্দপতন ঘটেছে। এ কারণে হাওরবাসীর স্বাভাবিক জীবন যাপনে একটা অস্বস্থিও দেখা দিয়েছে। যাতায়াতে দুর্ভোগ ও খরচ বেড়েছে। তবে কর্মহীন জেলে ও সাধারণ পরিবারের লোকজন ডেমি ধান কেটে কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন। তিনি জানান, তাঁর ইউনিয়নের ৫ শত লোক জনপ্রতি ১০-১৫ মণ করে দ্বিতীয়বারের মতো ধান ঘরে তুলতে পেরেছেন।
একটি হাউজ বোটের ব্যবস্থাপক আবিকুল হাসান । তিনি বলেন, হাওরে পানি নেই, তাই পর্যটকও নেই। কর্মীরা সবাই হাউজ বোটে বসে বসে খাচ্ছে আর পানির অপেক্ষা করছে। তাহিরপুর বাজারের কেনাকাটায়ও এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে।
তাহিরপুর উপজেলা মহিলা ভাইস-চেয়ারম্যান খালেদা বেগম বলেন, হাওরে উৎপাদিত বছরের একমাত্র ফসল বোরো ধান কাটা শেষ হয়েছে প্রায় একমাস আগে। হাওরের কুলবধূরা বাবার বাড়িতে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে আছে। ছেলে-মেয়েরাও মামার বাড়ি যাবে আম কাঁঠাল খেতে। সপ্তাহ-পনেরো দিন থেকে বধূরা নতুন শাড়ি আর ছেলে-মেয়েরা নতুন কাপড় নিয়ে নিজ বাড়ি ফিরবে। শত বছর ধরে এ রীতিই চলে আসছে হাওরপারের গ্রামীণ সমাজে। কিন্তু হাওরে পানি না থাকায় এ বছর হঠাৎ করেই ছন্দপতন ঘটেছে।
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন, আবহাওয়ার বৈশি^ক পরিবর্তনের শিকার হাওরবাসী। বৃষ্টি কিছুটা শুরু হয়েছে। আশা করছি আষাঢ় মাসের মাঝামাঝিতেই ভাসা পানি হবে হাওরে।
এই বিলম্বিত বর্ষার কারণ সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মো. খালেকুজ্জামান মতিন বলেন, ‘এল নিনোর ফলে ভারতের আসাম-গুজরাট অঞ্চলে পাঁচ থেকে আট শতাংশ বৃষ্টিপাত কম হবে। গঙ্গ, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকায় বৃষ্টিপাত কমবে। তাই ভাটির দেশে (বাংলাদেশে) বন্যার আশঙ্কা নেই। ’ এ রকম পরিস্থিতিকে ‘খুবই অস্বাভাবিক’ আখ্যা দিয়ে মতিন আরও বলেন, ‘ফসল, জীববৈচিত্র, বাস্তুসংস্থান ও মানুষের জীবন-জীবিকার জন্য বর্ষা খুবই প্রয়োজনীয় ঋতু। স্বাভাবিক বর্ষা না হলে আগামী বছর হাওরাঞ্চলে বোরো ফলনে বিরূপ প্রভাব পড়বে। খরাও দেখা দিতে পারে।
ওয়াটারকিপারস বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল বলেন, বর্ষা বিলম্বিত হওয়ায় হাওরের জীববৈচিত্রের ভারসাম্য নষ্ট হবে। যার অভিঘাতে ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডেও সাবেক মহাপরিচালক ম. ইনামুল হক বলেন, হাওরের খাস জমি ইজারা দেওয়া ও প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ করতে হবে। মাছের অভয়াশ্রমগুলো রক্ষা করতে হবে।

  • [১]