- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

পান সিগারেট পাঁচালী

মতিউর রহমান
কেন জানি না হঠাৎ জীবনভর থাকা নি¤œ রক্তচাপ উচ্চরক্তচাপে প্রমোশন পেয়েছে, তা ছাড়া এক জায়গায় না থেকে উঠানামা করে। হাঁটু, কোমর আর মেরুদ-ের ব্যথায় তা-ব নৃত্য সহ অন্যান্য আনুষাঙ্গিক রোগের ঠেলায় ঘরে বসেই সময় কাটছে। বাইরে তেমন বেরুতে পারি না, বিভিন্ন সামাজিক রাজনৈতিক কর্মকা-েও অংশগ্রহণ করতে পারি না। বন্ধুবান্ধব যে কয়জন ছিল তারাও এখন বীতশ্রদ্ধ হয়ে সময় দিতে নারাজ। তবে ডিশ, টিভির কল্যাণে নতুন অনেক বন্ধু-বান্ধবী হয়েছে বিভিন্ন সিরিয়ালের কারণে। এখন কটকটী, কিরনমালা, বেদের মেয়ে মলুয়া, ভুতু, দিয়া, আর্য্যসহ অনেক নতুন সাথী জুটেছে। ডাক্তার, কবিরাজ, মহাশয়দের শত নিষেধ সত্বেও পান চিবাই আর পরিবারের সদস্যদের লুকিয়ে সিগারেটে দম দেই। ঢাকায় গিয়েছিলাম চিকিৎসার জন্য। সেখানকার চিকিৎসকদের দেওয়া ঔষধে কিছুটা ভালই বোধ করছি। ঢাকার চিকিৎসকরা পান সিগারেট নিষেধ করা সত্বেও কেন জানিনা এই কু-অভ্যাসটি ছাড়তে পারছি না। মনে হয় এটাই আমার জীবনের পরাজয়। তবে সবার কাছে অনুরোধ সচেতন অথবা অবচেতন মনে এই কু অভ্যাসে জড়াবেন না।
মুুক্তিযুদ্ধের আগে পান সিগারেট মুখে নিয়েছি বলে মনে পড়ে না। ভারতের শরণার্থী শিবিরে নাসির বিড়ির মাধ্যমে প্রথমে ধূমপানে হাতেখড়ি আর মেখালয়ের সীমান্তবর্তী বাজার বালাটের খাসিয়া সুন্দরী যুবতীর দোকানে পান খাওয়া শুরু। পানওয়ালীর পানের চেয়ে টকটকে পান খাওয়া ঠোঁট দেখার আকর্ষণই বোধহয় বেশী ছিল, আর ফাও হিসাবে তার সাথে খোশ গল্পই ছিলো পান আসক্তির মূল কারণ। তারপর আস্তে আস্তে নাসির বিড়ি থেকে সিগারেট পানের সাথে বাহাড়ী জর্দা সহ অন্যান্য মশলাপাতির সংযোজন। বর্তমানে সিগারেট আর পানের নেশায় আসক্ত একজন নেশাখোর হয়ে মরণব্যাধিতে আক্রান্ত। তবে স্বাধীনতার পর বহু বন্ধুবান্ধবদের সাথে মিশেছিÑবহু অনৈতিক নেশার আমন্ত্রণ পেয়েছি, তিনতারা পাঁচ তারা হোটেলে বহু আমন্ত্রণ পেয়েছি কিন্তু সবসময় ঘৃণা ভরে বা ভদ্রভাবে সে সমস্ত আমন্ত্রণ উপেক্ষা করেছি। তবে মাঝে মাঝে তথাকথিত এলিট বুদ্ধিজীবী ব্যবস্ায়ী, সমাজের হোমরা, চোমড়া রাজনীতিবিদদের ধারে কাছে বসে বাজারে প্রচলিত এনার্জি ড্রিংকস পান করতে করতে অনেক দ-মুন্ডের কর্তা ও তাঁদের বান্ধবীদের বেহায়াপনা আর কীর্তিকলাপ দেখেছি, সে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা, তার একশতভাগের দুয়েক ভাগ যদি লিখি অথবা প্রকাশ করি তাহলে তাদের রোষানলে পড়ে আমার বারটা বাজতে হয়তো দেরি হবে না। অবশ্য তাদের মধ্যে অনেকেই নেই। এই সমস্ত আড্ডায় কে সরকারি দলের নেতা আর কে বিরোধী দলের নেতা চেনাই দায়, এ সমস্ত আড্ডায় তাদের যে হৃদতা তা ভাষায় বুঝাবার নয়। আর আমরা যারা মফস্বলে রাজনীতি করি অনেকেই একজন আরেকজনকে প্রাণের শত্রু ছাড়া কিছুই মনে করি না। কখনও একে অপরের বিরুদ্ধে অস্ত্রের ভাষায় কথা বলতে দ্বিধা বোধ করি না। আসলে আমাদের এই সংস্কৃতি পরিহার করতে হবে।
যাক আবার সিগারেটের প্রসঙ্গে ফিরে আসি। কিছুদিন আগে লন্ডন গিয়েছিলাম বেড়াতে। সাথে বহু কৌশল করে বেশ কয়েক কার্টুন সিগারেট নিয়ে গিয়েছিলাম। কয়েকদিন পর সিগারেট শেষ হয়ে যাওয়ায় বাসার পাশে ইস্টহাম বাজারে সিগারেট কিনতে যাই। বাজারে গিয়ে দেখলাম সব দোকানে সিগারেট বিক্রি হয় না, নির্দিষ্ট কিছু দোকানে বিক্রি হয়। অপ্রাপ্ত বয়স্ক কারো কাছে সিগারেট বিক্রি অপরাধ। অপ্রাপ্ত বয়স্ক কারো কাছে সিগারেট বিক্রি করার সময় ধরা পড়লে দোকানীকে কঠিন শাস্তি দেওয়া হয়। লন্ডনে অফিস ট্রেন বাস দোকান রেস্টুরেন্ট ধূমপান করা দ-নীয় অপরাধ। বাজারের বেঞ্চিতে বসে বসে দেখেছি পুরুষদের হাতে সিগারেট খুবই কম। তবে মা জননীদের হাতে সিগারেট প্রায়ই আছে। পশ্চিমা দেশের কোন বাসায় সিগারেট খাওয়া মানে নিজে বিষ খাওয়া ও অন্যদের খাওয়ানো। কারণ শীতের দেশের ঘরবাড়িগুলো ওই দেশের আবহাওয়ার উপযোগী করে বানানো। বাতাস আসা যাওয়ার জন্য আমাদের দেশের মতো ভেন্টিলেটর নেই। সিগারেটের ধোঁয়া ও গন্ধ বের হবার রাস্তা না থাকায় ঘরে দুর্গন্ধ ও ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। তাই আয়েশ করে সিগারেট টানার মজাই পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে প্রচন্ড ঠান্ডার মধ্যে বাইরে গিয়ে সিগারেট টানতে হয়। তবুও আমার মতো সিগারেট খোর পিতৃ শ্রদ্ধার সুযোগ নিয়ে মাঝে মাঝে ঘরের ভিতরেই সিগারেট টানা শুরু করি। কিন্তু বাদ সাধে ক্লাস থ্রিতে পড়–য়া নাতি সামিন। তার সাথে লন্ডনে চার মাস অবস্থানকালে কতবার যে প্রতিজ্ঞা করেছি আর সিগারেট খাবো না আর কতবার যে ভেঙ্গেছি তার ইত্তয়া নেই। তবে সে স্কুলে গেলে আয়েশ করে সিগারেট টেনেছি। সেই সাথে গন্ধ তাড়াবার জন্য কত ক্যান এয়ার ফ্রেশনার ব্যবহার করেছি তার হিসাব করা কঠিন। দোকানে গিয়ে যখন শুনলাম এক প্যাকেট বেনসনের দাম আট পাউন্ড পর্যন্ত তখন নেশা মুহূর্তের মধ্যে ছুটে যায়। আট পাউন্ড সমান বাংলাদেশী টাকায় একহাজার চল্লিশ টাকার মতো। দাম শুনে হতচকিত হয়ে যখন দোকানদারের দিকে তাকাচ্ছি তখন পূর্ব পরিচিত পাকিস্তানী একজন সেলসম্যান বললো- আপনি যদি একটু অপেক্ষা করেন তবে সাড়ে তিন পাউন্ডে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের কল্যাণে চোরাই পথে আসা বাংলাদেশী বেনসন দিতে পারব। তার কথায় আশ্বস্ত হয়ে বললাম ভাই তাড়াতাড়ি করুন, গত দুই দিন ধরে দম দিচ্ছি না। সেলসম্যানটি দোকানের বাইরে গিয়ে একটু পরে এনে এক প্যাকেট দেশী বেনসন দিল এবং বললো এগুলো বিক্রি করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ, অন্য জায়গায় রাখি এবং পরিচিত কাস্টমারদের দিয়ে থাকি। আপনার প্রয়োজন হলে আসবেন, সে বললো। তাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়ে সিগারেট নিয়ে ঘরে ফিরলাম।
তবে সুখের কথা পানের বেলায় কোন লুকোচুরি নেই। পানের দাম বাংলাদেশ থেকেও সস্তা তবে চুন সুপারী আর জর্দার দাম বেশী। বাংলাদেশী এমন কোন ব্রান্ডের জর্দা বাকী নেই যা লন্ডনে পাওয়া যায় না। হাকিমপুরী, স্বপ্নপুরী প্রভৃতি জর্দার একেকটি ডিব্বা প্রায় দেড়শত টাকা। লন্ডনে আমি প্রায় চার মাস ছিলাম। এই চারমাসে এই কু-নেশার খাই মেটাতে গিয়ে প্রায় দেড় থেকে দুই লক্ষ টাকা খরচ। সুনামগঞ্জ শহরে আপনার যত টাকাই থাকুক কিন্তু তামাক আর হুক্কা ব্যবহারের জন্য টিক্কা পর্যন্ত আপনি পাবেন না। আমাদের দেশ থেকে এ প্রথা উঠে গেলেও মুরুব্বী বাংলাদেশীদের ও আরবীয়দের কল্যাণে তা এখনও লন্ডন শহরে বেঁচে আছে। আরবীয়, ভারতীয়, পাকিস্তানীরা এখনও হুক্কা চালু রেখেছেন।
সহৃদয় পাঠক দয়া করে যারা এগুলো ধরেননি তারা ভবিষ্যতে কোন দিন ছুঁয়েও দেখবেন না। টাকা তো যাবেই, বন্ধৃুবান্ধব হারাবেন, বিছানায় শয্যাশায়ী হবেন, ডাক্তারের পকেটভারী করে নিজেও আমার মতো বিভিন্ন রোগে শোকে ভোগে অকালে প্রাণ খোয়াবেন।
লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা।

  • [১]