- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

পাবজি, ফ্রি ফায়ারে আসক্ত শিক্ষার্থীরা

ইয়াকুব শাহরিয়ার, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ
সফিউল আলম (ছদ্মনাম)। দক্ষিণ সুনামগঞ্জের একটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে নবম শ্রেণির ছাত্র। যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়তো তখন তার স্কুল বন্ধ হয়েছিলো। স্কুল বন্ধ হওয়ার আগেও স্মার্ট ফোনের সকল ফাংশনই বুঝতো না সে। দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ। বন্ধ আছে প্রাইভেট ক্লাসও। অনলাইন ক্লাসের অজুহাত দেখিয়ে বিধবা মাকে দিয়ে কিনে নিয়েছে স্মার্ট ফোন। টিকটক ভিডিও তৈরির নামে সমাজের সকলের সামনে করছে বেহায়াপনা, ডুবে আছে ইন্টারনেটের দুনিয়ায়। ফ্রি ফায়ার, পাবজি, লুডুসহ বিভিন্ন অন্তর্জালীয় খেলার নেশায় মেতে আছে সে। এ তো গেলো একজন সাফিউল আলমের কথা। এমন অসংখ্য স্কুল পড়ুয়া সাফিউল আলম, অনিক, ঝলকরা বখে যাচ্ছে করোনার এই অযাচিত সময়ে। অভিভাবকরা বলছেন, যদি স্কুল কলেজ খুলে যেতো তাহলে এতো সময় পেতো না ‘টিনএজার’ শিক্ষার্থীরা। অনেকে আবার ‘গভীর নেশা’ তৈরিকারী এসব খেলার অ্যাপসও বন্ধের দাবি জানান।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার একাধিক স্কুলের বেশ কয়েকজন স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীর খোঁজ নিয়ে এসব তথ্য জানা যায়। এতে যেমন ব্যয় হচ্ছে অভিভাবকের অতিরিক্ত টাকা, বেশি ক্ষতি হচ্ছে ঐসব শিক্ষার্থীদের।
জানা যায়, রাত-দিন পুরোটা সময় ধরে অনেক উঠতি বয়সের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘক্ষণ ধরে মোবাইলের দিকে অপলক চেয়ে থাকে। বেশিক্ষণ মোবাইল ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকার কারণে চোখের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। ঘুমের ব্যাঘাত হওয়ার কারণে দিনে বেলা করে উঠছে ঘুম থেকে। এতে যেমন বাড়ছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি তেমনি মানসিক চাপের জন্যে অকারণে রাগও বাড়তে পারে এসব শিশুদের। একমুখী চিন্তা ও নিদ্রাহীনতায় কমে যেতে পারে স্মরণ শক্তি। যা শিক্ষা জীবনে মারাত্মক রকমের প্রভাব ফেলবে। ডাক্তাররা এমন পরিস্থিতি থেকে ফিরিয়ে আনতে অভিভাবকদের দায়ীত্বশীল হওয়ার উপর জোর দিয়েছেন। মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের উপর বিশেষ নজর রাখার কথা বলেন তারা। রাতে যেনো কোনো ভাবেই উঠতি বয়সের এসব স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের কাছে মোবাইল ফোন না থাকে সেদিকে বিশেষ নজর রাখার তাদিগ দেন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা।
অভিভাবক জাবেদ নূর ও হেলেনা বেগম বলেন, আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যত একেবারেই শেষ। দীর্ঘ ১৫ মাস ধরে স্কুল কলেজ বন্ধ। ছেলেমেয়েরা একেবারেই পড়াশোনা করছে না। মোবাইলে, ইন্টারনেটে মারাত্মকভাবে ঝুঁকে পড়েছে তারা। নৈতিকতার স্থলন হচ্ছে খুব। দ্রুত স্কুল কলেজ খুলে দেওয়ার দাবি করছি।
পাগলা সরকারি মডেল হাইস্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ সৈয়দ রমিজ উদ্দিন বলেন, দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধের কারণে শিক্ষার্থীরা মোবাইলে আশক্ত হয়ে উঠেছে। এজন্য যতদ্রুত সম্ভব স্বাস্থ্যবিধি স্কুল খুলে দেওয়ার আহ্বান করছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেনো বিষয়টি সদয় দৃষ্টিতে দেখেন সে অনুরোধ করছি।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (টিএইচও) ডা. জসিম উদ্দিন বলেন, অতিরিক্ত মোবাইল ফোন, ট্যাব এ জাতীয় ডিভাইস ব্যবহারের কারণে উঠতি বয়সের শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বে।
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মানোরোগ বিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ডা. মোহাম্মদ হাসান বলেন, আমরা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খুব একটা কথা বলি না। এটা কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। এই অতিমারির সময় শিক্ষার্থীরা যে হারে ইন্টারনেট কিংবা ইন্টারনেট ভিত্তিক গেমে আসক্ত হয়েছে সেটা অত্যন্ত উদ্বেগ প্রকাশ করার মতো বিষয়। অন্যান্য নেশার মতো এটাও একটা নেশা। এ নেশায় অনেকে আত্মহত্যাও করছেন। আমাদের চোখের সামনেই একটি ইন্টারনেট রোগে আক্রান্ত জাতি তৈরি হচ্ছে। এর মানে এ নয় যে, ইন্টারনেট সব কিছুই খারাপ দিচ্ছে। ভালো অনেক কিছুই দিচ্ছে তরুণরা নিচ্ছেন কম। এখনই যদি আমরা না জেগে উঠি তাহলে আমরা একটি মানসিক রোগাক্রান্ত জাতি তৈরি করতে যাচ্ছি।

  • [১]