আসাদ মনি
‘এই টাঙ্গুয়াতে বাঘ, শুয়োরের বসবাস ছিলো। হাতিও ছিলো। এজন্য একটি বিলের নাম হাতির গাঁতা। তখন নদী গভীর থাকায় বর্ষাকালে এত পানি হতো না। তবে টাঙ্গুয়ার খালগুলো পানিতে ভরপুর থাকতো সব সময়। খাল দিয়ে ছোট নৌকা করে চলাচল করার সময় ঘন জঙ্গল চোখে ভাসতো। আমাদের ভয় হতো কখন যে বাঘ এসে আক্রমণ চালায়। গাছ-পালার গভীরতার জন্য খাল থেকে চোখের দৃষ্টি জঙ্গল ভেদ করে যেতো না। কেউলা, ঝাউবন, চাইললা, বনতুলসি, হিজল, করছ সহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছের সমাহার ও বিস্তীর্ণ ভূমি জুরে জঙ্গলের বাগ ছিলো টাঙ্গুয়ায়। সবগুলোর গাছের নাম এখন মনে নেই।’ কথাগুলো বলছিলেন তাহিরপুরের বাসিন্দা বীর মুক্তিযুদ্ধা বদরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, “৬০-৭০ বছর আগে এরকম দেখেছি টাঙ্গুয়াকে। শীতকালে ঝাঁকে ঝাঁকে অতিথি পাখি এসেছে। গভীর জঙ্গলে পাখির কলকাকলিতে আমাদের মাঝে মাদকতা এসেছে তখন। আমাদের বন্দুক ছিলো। ছোট নৌকা করে টাঙ্গুয়াতে পাখি শিকারে যেতাম। তখন তো এত নিষেধ ছিলো না। মানুষও সচেতন ছিলো না। যৌবনে যা দেখেছি এখন সে সব দেখি ছাই।”
সে সব কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, “সব নদী-নালা ভরাট হয়ে গেছে। ফলে বর্ষায় পানিতে টাঙ্গুয়া টইটুম্বুর হয়ে যায়। আগে এত জনসংখ্যা ছিলো না। প্রকৃতি তার সবকিছু আমাদের দিয়েছে। এখন টাঙ্গুয়ায় কিছুই নেই। কিন্তু টাঙ্গুয়াকে যে ভাবে অত্যাচার করে শেষ করা হয়েছে, প্রকৃতি তার প্রতিশোধ ঠিকই নেবে”
টাঙ্গুয়ার পাড়ের রুপনগর গ্রামের বাসিন্দা মো. বাদশা মিয়া বলেন, “১৫ বছর আগেও দেখছি আমরা, হায়রে মাছ আছিন টাঙ্গুয়ায়! নৌকা দিয়া চলার সময় পানির নিচে দেখা যাইতো বড় বড় রুই- কাতলা। বাড়ির পাত্থরের ইরে (পাথরের ওয়াল) বরশি দিয়া মাছ ধরা যাইতো। মাছ-ভাত আর দুধ খাইতাম সারা বছর। অখন সব হারাইয়া গেছে। টাঙ্গুয়ার হাওরে আগের মতো মাছ নাই। ”
বাদশা মিয়ার কাছ থেকে জানা য়ায়, জেলেরা টাঙ্গুয়ার অবৈধভাবে মাছ ধরেন। প্রশাসনের ৩য় পৃষ্ঠায় দেখুন
কড়া পাহাড়া থাকা সত্ত্বেও কৌশলে মাছ শিকার করা হয়। কিভাবে ? জানতে চাইলে তিনি বলেন, টাঙ্গুয়া হাওরে যারা পাহারা দেন তারা প্রতি জেলের কাছ থেকে সপ্তাহে ১ শ থেকে ৩ শ টাকা নেন। এতে পরবর্তী ১ সপ্তাহ জেলেরা নির্বিঘেœ অবৈধ কারেন্ট জাল দিয়ে ইচ্ছে মত মাছ শিকার করেন।
ম্যাজিস্ট্রেট টহল দেয়া সত্ত্বেও কিভাবে কারেন্ট জাল দিয়ে জেলেরা মাছ শিকার করেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ম্যাজিস্ট্রেট এর সাথে যারা থাকেন তারা আগাম বার্তা পৌঁছে দেন জেলেদের। মোবাইল ফোনে সংকেত পাঠানো হয়Ñ এখন ম্যাজিস্ট্রেট কোথায় আছেন, কোন দিকে যাবেন। এতে জেলেরা আগাম সর্তক বার্তা থেকে ম্যাজিস্ট্রেট টহলকৃত জায়গা ত্যাগ করেন।
তার কাছ থেকে আরো জানা যায়, টাঙ্গুয়াতে হিজল- করছ গাছের বাগ ছিলো। এসব বাগের জন্য বর্ষাকালে নিরাপদে চলাচল করা যেতো। যাত্রাপথে নৌকা ডুবলে হিজল-করছ গাছে আশ্রয় নেয়া যেতো। এখন সে রকম গাছ দেখা যায় না। যে দিকে চোখ যায় শুধু মরুভূমির মতো ফাঁকা দেখা যায়।
হিজল করছ গাছের বাগ উজাড় হওয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, ব্যক্তিগত জমিতে যেসব গাছ ছিলো তা কেটে ফেলা হয়েছে। জমির মালিকরা শুষ্ক মৌসুমে ধান চাষ করেন। অনেকে গাছ কেটে জমি চাষবাদ করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টাঙ্গুয়ার পাড়ের জয়পুর গ্রামের একাধিক জেলে বলেন, আমরা কারেন্ট জাল দিয়ে মাছ ধরি। এজন্য পাহারাদারদের প্রতি সপ্তাহে ১শ থেকে ৩শ টাকা দেই। আমরা বেশি মাছ বিক্রি করতে পারি না। তবে যারা কুনো জাল (বড় জাল) দিয়ে মাছ ধরেন তারা প্রতিরাতে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকার মাছ বিক্রি করেন।
জানা যায়, পাহারাদাররা টাঙ্গুয়াকে রক্ষা না করলেও প্রকৃতি অত্যাচারের শোধ নিজেই নিয়ে নিচ্ছে। বিভিন্ন সময় হাওরে প্রাকৃতিক ঝড়ে জেলেরা মারা যান। এছাড়াও বর্ষাকালে টাঙ্গুয়া হাওরে ঘটছে দুর্ঘটনা। এতে প্রায়ই প্রাণ নাশের ঘটনা ঘটে চলছে। ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের বানিয়ারগাঁও গ্রামের ৩ জন জেলে রাতে মাছ ধরতে গিয়ে ঝড়ের কবলে পড়েন। কিছু বুঝে উঠার আগেই তাদের নৌকা ডুবে যায়। ২ জন বেঁচে ফিরলেও তৌফিক নামের একজনকে পাওয়া যায় নি। ২ দিন পর তার লাশ পাওয়া যায়।
কবি ইকবাল কাগজী বলেন, টাঙ্গুয়া হলো মাদার ফিশারি। টাঙ্গুয়ার পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে যে ক্ষতি হয়েছে সুনিশ্চিত ভাবেই তার প্রভাব মানুষের মাঝে পড়বে। এখনই তো সুনামগঞ্জে মাছের সংকট। মানুষের চাহিদা পূরণ করছে পুকুরে চাষ করা পাঙ্গাস মাছ।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশমির রেজা বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণেই হাওরে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। টাঙ্গুয়ার হাওরকে রক্ষা করার জন্য প্রশাসনের ম্যানেজমেন্ট পরিবর্তন করা সময়ের দাবি। একজন ম্যাজিস্ট্রেটের পক্ষে ট্যাকেরঘাট থেকে দেখাশুনা করা সম্ভব নয়। এজন্য আমরা প্রস্তাব দিয়েছি গোলাবাড়িতে ১ জন ম্যাজিস্ট্রেট থাকার ব্যবস্থা করার জন্য। যারা পাহারাদার আছেন তাদের ডিউটির আগে জানাতে হবে কোন জায়গায় টহল দিবে সে।
তিনি আরো বলেন, এখন প্রযুক্তি উন্নত হয়েছে। টাঙ্গুয়াকে বাঁচাতে প্রশাসনের সেসব উন্নতর প্রযুক্তি রয়েছে তার সবগুলো কাজে লাগাতে হবে। প্রয়োজনে ড্রোন ব্যবহার করা যেতে পারে।