- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

পাহাড় থেকে বিশুদ্ধ পানি

আসাদ মনি
মানুষের তৈরি কৃত্রিম কোনো টিউবওয়েল বা কুয়া নেই। সুড়ঙ্গ ও মাটির নিচ থেকে প্রাকৃতিক ভাবেই নিরাপদ পানি বের হয়ে প্রবাহিত হচ্ছে ভূমির নিচের দিকে। এই পানি পর্যটকসহ এলাকার বাসিন্দারা সংগ্রহ করছেন। হাতের তালুতে নিয়ে পান করছেন। অনেকে বোতলে সংগ্রহ করছেন। দূরে নিয়ে যাচ্ছেন।
সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুরের পর্যটন এলাকা ট্যাকেরঘাটে এই জলধারার অবস্থান। ভারতের মেঘালয়ের পাশে বাংলাদেশের সীমান্তের ছোট পাহাড়ের নিচে ছোট সুড়ঙ্গ দিয়ে বের হচ্ছে পানি। সুড়ঙ্গের পাশে স্বচ্ছ বালুরাশির ভেতর থেকেও পানি বের হয়ে জলধারা তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ও আইইউসিএন বাংলাদেশ’র উদ্যোগে জলবায়ু সহিষ্ণু পর্যটন শিল্প উন্নয়নে দায়িত্বশীল পর্যটন ব্যবস্থাপনার প্রবর্তন প্রকল্পের মাধ্যমে গেল ২০১৭ সালে ট্যাকেরঘাটের সীমান্তবর্তী এলাকায় উন্নয়নমূলক কাজ হয়। প্রায় ১০০ কোটি টাকার প্রকল্পের ফলে এই এলাকার অনেক কিছুই নতুন করে সাজানো হয়েছে। তবে কোম্পানীর পরিত্যাক্ত জিনিসপত্র সংরক্ষণে উদ্যোগ নেয়া হলেও এই জলধারটি সংরক্ষণের কোনে উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তাই এলাকাবাসি পানির প্রবাহ আরো গতিশীল করতে সুড়ঙ্গের পাশে আরেকটা বিকল্প কংকিটের রিং স্থাপন করেছেন।
এলাকাবাসি বলছেন, যুগ যুগ ধরে তারা দেখে আসছেন সীমান্তের এই জায়গা থেকে পানি বের হয়ে আসতে। টিউবওয়েল যখন ছিলো না এখান থেকেই তারা পানি সংগ্রহ করে পান করেছেন। তবে এখন বাড়ি বাড়ি টিউবওয়েল হওয়ায় এই জলধারা থেকে পানি সংগ্রহের পরিমাণ কমেছে। বাড়ি থেকে এই জলধারা দূরে হওয়ায় পানি সংগ্রহ করা কষ্টকর এখান থেকে।
তবে টিউওয়েলের পানি থেকে ভালো এই জলধারার পানি। টিউবওয়েলের পানি সকালে রাখলে বিকালে পাত্র লাল হয়ে যায়। জলধারার পানি ১ বছর রাখলেও পাত্রের কোনো পরিবর্তন হয় না। লাল রং ধরে না। পানির স্বাদ গন্ধ একই থাকে।
সরজমিনে দেখা যায়, ভারত- বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে এই জলধারা। পাহাড়ের সুড়ঙ্গ থেকে বের হয়ে নিচে ঢালু ভূমিতে জলধারার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। পানির উৎস দেখা গেছে ছোট একটি সুরংঙ্গ। উঁচু পাহাড়ের ভেতর থেকে সমতল ভূমিতে মিলিত হয়েছে এই সুরংঙ্গ। ছোট এই পাহাড়ের উপরে গিয়ে খোঁজেও এই সুরংঙ্গের উৎস পাওয়া যায় নি।
জানা যায়, ১৯৬৬ সালে ট্যাকেরঘাটে বাংলাদেশের প্রথম চুনাপাথর খনিজ প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু ৩২৭ একর জায়গাজুড়ে। সে সময়ে চুনাপাথর খনি প্রকল্পের আওয়াতাধীন শত শত কর্মচারী এই জলধারা থেকে পানি সংগ্রহ করে পান করেছে। এই জলধারা থেকে পানি সাপ্লাই করে কোম্পানীর কর্মকর্তা কর্মচারীদের বাসায় দেয়া হতো। কোম্পানী লোকসানের জন্য প্রকল্পের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে ’১৯৯৬ সনে। ফলে সাপ্লাইও বন্ধ হয়ে গেছে।
বালিয়াঘাট গ্রামের বাসিন্দা বাবর আলী জানান, অলৌকিক কিছু নয়। ট্যাকেরঘাটের ভূমির গঠন বালু মাটি দিয়ে। পুরো এলাকাটিই উঁচু। পানির স্তর বেশি নিচে নয়। ৪০ থেকে ৫০ ফুট পাইপ দিলেই নিরাপদ পানি পাওয়া যায়। পাহাড়ের এই জায়গাটির নিচে বালু। বালুর নিচ থেকে পানি বের হয়ে আসছে।
ট্যাকেরঘাটের বাসিন্দা শামীম আহমেদ তালুকদার বলেন, আমি ছোট বেলা থেকে দেখছি এই জায়গা থেকে পানি বের হতে। মূলত পাহাড়ের ছোট সুড়ঙ্গ থেকে বের হয় পানি। আমি নিজে বাড়িতে সংগ্রহ করি এই পানি। একবছর এই পানি বোতলে করে রেখেছি। এক বছর পরও বোতলে কোনো রং হয়নি। পানির স্বাদ, গন্ধ ঠিক ছিলো।
বাজারে যে মিনারেল ওয়াটার রয়েছে তারচেয়ে এই পানি ভালো উল্লেখ করে তিনি বলেন, আশেপাশের এলাকা থেকে ভ্যানগাড়ি করে পানি নিয়ে যায় এখান থেকে। এছাড়াও অনেক পর্যটকরা বোতলে করে এখান থেকে পানি নিয়ে যায়।
ট্যাকেরঘাটের আনসার ক্যাম্পের সদস্য রোমান বলেন, আমাদের ক্যাম্পের পেছনেই এই জলধারা। আমরা সব কাজে এই পানি ব্যবহার করি। খুবই ভালো এই পানি। এটাতে কোনো আয়রন নেই, খারাপ কোনো পর্দাথ নেই। বিশুদ্ধতার কারণে সবাই এই পানি ব্যবহার করছি। পান করার সময় মনে হয় পরিশোধিত পানি পান করছি।
পরিবেশ গবেষক সেলিনা সুমি বলেন, পানিটা খুব ভালো। আমি দেড় মাস আগেও গিয়েছি ট্যাকেরঘাটে। ৩ বোতল পানি নিয়ে এসেছি। বাসায় এখনো পান করছি সে পানি। একটা বুনো ফুলের ফ্লেভার রয়েছে পানিতে। অক্টোবর মাসেই ফ্লেভারটি বেশি পাওয়া যায়। নরমাল প্লাস্টিকের বোতলে রাখলেও খুব ভালো থাকে।
এই জলধারার উৎস কী? এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পাহাড়ের একটা ছড়ার পানি এটা। একেবারে পাহাড়ের মাঝখান থেকে বের হচ্ছে। দেখা যায় একটা সড়ঙ্গ থেকে বের হচ্ছে। এই এলাকার মাটি ও পাথরের কোয়ালিটি পানি কে একবারে বিশুদ্ধ ফিলটার করে বের করছে।

  • [১]