- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

পাড়াগাঁয়ের স্কুলের শতবর্ষ

হাসান শাহরিয়ার
ব্রিটিশ আমলে এ অঞ্চলে (বর্তমান বাংলাদেশ) সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। কোনোটি স্থাপিত হয় বিভিন্ন শহরে, কোনোটি পল্লী এলাকায়। অনেক প্রতিকূলতা ডিঙ্গিয়ে অধিকাংশ বিদ্যালয়ই এখনও টিকে আছে। অনেকেই হয়তো বিশ্বাস করবেন না যে, অজ পাড়াগাঁয়ের একটি স্কুল হাঁটিহাঁটি পা পা করে শতবর্ষ পূর্ণ করেছে। এই স্কুলটি হলো পাইলগাঁও ব্রজনাথ উচ্চ বিদ্যালয় বা পাইলগাঁও বি. এন. উচ্চ বিদ্যালয়। ১৯১৯ সালে সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার পাইলগাঁয়ে এই উচ্চ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। তখনকার জমিদার সুখময় চৌধুরী ও তার ভাইপো ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী এই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। স্কুলের ব্যয়ভার নির্বাহ করা হতো তাদের যৌথ জমিদারির খাত থেকে। সুদীর্ঘ কুড়ি বছর তারা এই স্কুলের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। ১৯৪২ সালে সুখময় চৌধুরীর মৃত্যুর পর বিশিষ্ট কংগ্রেস নেতা, আসাম বিধানসভা ও কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা পরিষদের সদস্য এবং বিদ্যানুরাগী ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী জমিদারির তদারক হন। তার চেষ্টায় ১৯৪৬ সালে স্কুলটির পরিচালনার দায়িত্ব সরকার গ্রহণ করে। এই ঐতিহ্যবাহী স্কুলের ছাত্র ছিলেন প্রাক্তন মন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এবং অর্থনীতিবিদ আখলাকুর রহমান। এই স্কুলের অনেক ছাত্র ব্রিটেনে বসবাস করছেন।
পাইলগাঁয়ের এক মনোজ্ঞ স্থানে স্কুলটির অবস্থান। চারদিক খোলা, বর্ষায় জলমগ্ন হয়; কিন্তু হেমন্তে এক অপরূপ সাজে সজ্জিত হয়। জমির পাকা ধান কাটার প্রতিযোগিতা চলে। এক শ’ বছর পরও স্কুলটির মূল ভবনের টিনের ছাদ অক্ষুণœ আছে। স্কুলটির উন্নয়নের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান। ইতিমধ্যেই তার চেষ্টায় বিজ্ঞান ভবন নির্মিত হচ্ছে। তিনি বিজ্ঞানাগারের যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করেছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন, অচিরেই সেখানে একটি কারিগরি মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হবে। প্রাক্তন আমলা এমএ মান্নানের বিশেষ চেষ্টায় অবহেলিত সুনামগঞ্জ সদরে স্থাপিত হচ্ছে মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, নার্সিং ইন্সটিটিউট এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ছাতক থেকে সুনামগঞ্জ পর্যন্ত রেল রাইন স্থাপনেরও উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। কিন্তু স্কুলে যাওয়াÑআসার রাস্তাটি খুবই খারাপ। দীর্ঘদিন যাবত এর কোনো সংস্কার হয়নি বলেই মনে হয়। ভারত বিভক্তির পূর্বে স্কুলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ব্রজেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী আসামের এমএলসি ও আমার বাবা মকবুল হোসেন চৌধুরী এমএলএ ছিলেন। তাদের মধ্যে খুব সখ্যতা ছিল। সে সময় হিন্দুদের দ্বারা সম্পাদিত পত্রিকাগুলোর মধ্যে সাপ্তাহিক ‘জনশক্তি’ ছিলো অত্যন্ত জনপ্রিয় ও শক্তিশালী সংবাদপত্র। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে ‘জনশক্তি’ কংগ্রেসের মুখপত্র হিসেবে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে। অসহযোগ আন্দোলন শুরুর আগে ১৯২০ সালে করিমগঞ্জে অনুষ্ঠিত সুরমা উপত্যকা রাষ্ট্রীয় সম্মেলনের চতুর্থ অধিবেশনে একটি ‘জাতীয়তাবাদী’ সংবাদপত্র প্রকাশের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। দেশবরেণ্য নেতা সিলেটের কৃতিসন্তান বিপিনচন্দ্র পাল এই সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। তিনি প্রস্তাবিত এই পত্রিকার নাম দেন ‘জনশক্তি’। সুখময় চৌধুরীও জননেতা ছিলেন। ১৯১৯ সালে যখন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিলেট পরিদর্শন করেন তখন সুখময় চৌধুরী সিলেট পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৪২ সালে তিনি পরলোক গমন করেন।
ব্রজেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীকে ‘জনশক্তির’ ‘ত্রাণকর্তা’ বললে অত্যুক্তি হবে না। তার ছোটভাই হরেন্দ্রনারায়ন চৌধুরীর অবদানও কম নয়। এক সময় নিস্তারণ গুপ্ত ‘জনশক্তি’ সম্পাদনা করেছেন। ‘জনশক্তি’র সঙ্গে ব্রজেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, অর্থাভাব ও সরকারী অত্যাচারে ‘জনশক্তি’ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে ব্রজেন্দ্রনারায়ণ এগিয়ে আসেন এবং বহু ক্ষতি স্বীকার করে পত্রিকাটি কিনে নেন। তবে ১৯৪২ সালের ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনে কংগ্রেসবাদীদের সঙ্গে ‘জনশক্তি’ সম্পাদকও গ্রেফতার হন। কারামুক্ত হয়ে পত্রিকা পুনঃপ্রকাশের উদ্যোগ নিলে প্রেস (ইমার্জেন্সি পাওয়ারস) অ্যাক্ট অনুযায়ী সরকার জামানত দাবি করলে ব্রজেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী দোষ স্বীকার করে এবং জামানত দিয়ে পত্রিকা বের করতে অনীহা প্রকাশ করেন। নীতিতে অনঢ় থেকে তিনি পত্রিকাটি তার ভাইয়ের কাছে বিক্রি করে দেন। নিস্তারণ গুপ্ত ‘জনশক্তি’ পুনঃপ্রকাশের আবেদন করলে ‘ভারতের নিরাপত্তা বিঘœকারী সংবাদ জনশক্তিতে প্রকাশিত হয়’ এই অভিযোগে ভবিষ্যৎ সচ্চরিত্রতার জামিনস্বরূপ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ৫০০ টাকা দাবি করেন। ‘জনশক্তি’র সর্বশেষ সম্পাদক নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামীর মতে, ব্রজেন্দ্রনারায়ণ চৌধরীর অকৃপণ দানে জিন্দাবাজারে পত্রিকার নিজস্ব বাড়ী, ফ্ল্যাট, যন্ত্রাদিসম্বলিত বিরাট প্রেস, কার্যালয় ইত্যাদি হয়েছিল। ‘জনশক্তি’ সম্পর্কে ব্রজেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী নিজে বলেছেন, ‘১৯২০ হইতে আইন-অমান্য আন্দোলনের দরুন কামিনী চন্দ, সতীশ দেব, ক্ষিতীশ শ্যাম, ক্ষীরোদ দেব প্রভৃতি কর্তৃক প্রবর্তিত সাপ্তাহিক ‘জনশক্তি’-র উপর রাজরোষের ঝড় বহিয়া যখন উহা বিপর্যস্ত তখন ১৯২৬ হইতে ইহার আর্থিক দায়িত্ব, উন্নতি ও পরিচালনার ভার আমার হাতে আসে। ইহাতে আমার প্রায় সাড়ে সাত হাজার টাকার ক্ষতি হয়। পরে ইহার খরচটা উঠিয়া আসিত এবং সম্পাদক প্রভৃতি চারি পাঁচজনের অন্নসংস্থান হইত। ১৯৪২-এর আন্দোলনের সময় সরকার জামিন চাহিলে নীতিগত কারণে উহা দিতে অনিচ্ছুক হইয়া আমার ভ্রাতার নিকট উহা মাত্র ৫০০ টাকা মূল্যে বিক্রয় করি। ১৯২৮-২৯-এ ইংরাজী একটি সংস্করণ ছিল যাহার লিখা ও সম্পাদনা আমার নিজের ছিল।’
তিনি অত্যন্ত মেধাবি ছাত্র ছিলেন । কৃতিত্বের সঙ্গে এমএ ও বিএল পাশ করার পর ১৯০৭ সালে সিলেট বারে যোগ দেন ও বছর খানেক ওকালতি করেন। পিতার মৃত্যুর পর তিনি জমিদারির পাশাপাশি রাজনীতি ও সমাজ সেবায় আত্মনিয়োগ করেন এবং ১৯২৩ সাল পর্যন্ত স্বরাজ্য দলের নেতা ছিলেন। ১৯৩০ সালে আইন অমান্য আন্দোলনের সময় জিলা কংগ্রেসের সভাপতিরূপে ব্রজেন্দ্র নারায়ণ বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। ২য় আইন অমান্য আন্দোলন করেন ১৯৩২ সালে। দু’বারই তিনি কারারুদ্ধ হন। প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় পরিষদে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ১৯৩৬ সাল থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত তিনি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা পরিষদের সদস্য ছিলেন। কংগ্রেস হাই কমান্ডের সং্গে মতবিরোধ হওয়ায় ১৯৪০ সালে তিনি সদস্যপদ ত্যাগ করেন। তার উদ্যোগে ১৯৩৯ সালে সিলেট মহিলা কলেজ স্থাপিত হয়। তিনি দুই বছর ঐ কলেজের অবৈতনিক অধ্যক্ষ ছিলেন। তার চৌহাট্টার বাড়িতেই বর্তমান সরকারি মহিলা কলেজ অবস্থিত। তাদের পরিবার সিলেট রসময় মেমোরিয়েল হাইস্কুলটিও প্রতিষ্ঠা করে।
দেশ বিভাগের পর অনেক হিন্দু নেতাই ভারতে চলে যান। কিন্তু ব্রজেন্দ্র নারায়ণ সিলেটের মায়া ত্যাগ করতে পারেননি। ১৯৬২ সালে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসার জন্য কলকাতা নিয়ে যাওয়া হলে দশ বছর পর সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁদের স্থাপিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান স্থানীয় লোকেদের দ্বারা স্টিয়ারিং কমিটি গঠনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে ।
পাইলগাঁও ব্রজনাথ উচ্চ বিদ্যালয়টির শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে জমকালো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় গত ২৫ জানুয়ারি। ওই দিন দুর্গম ও উৎসবমুখর পাইলগাঁয়ে বসেছিল এক অবিস্মরণীয় মিলনমেলা। পুরাতন ও নতুন ছাত্রছাত্রী, শিক্ষকÑশিক্ষয়ত্রী, স্কুল পরিচালনা কমিটির সদস্যগণ এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি তথা অবালবৃদ্ধবণিতা মহানন্দে ও হেসেখেলে বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। ভারতের দিল্লি, কলকাতা ও মুম্বাই থেকে আগত ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরীর নাতনি ড. অপর্ণা বসু ও স্বামী ভারতের প্রাক্তন কেন্দ্রীয় সচিব দীপংকর বসু, ভাস্বতি চক্রবর্তী ও স্বামী বিশিষ্ট সাংবাদিক আশীস চক্রবর্তী, মিতালী চৌধুরী, নাতি প্রতাপ নারায়ণ চৌধুরী ও স্ত্রী শুক্লা চৌধুরীর উপস্থিতি ছিল অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ। উপস্থিত অনেকেই তাদের এক নজর দেখার জন্য চারদিকে ভিড় জমান। নাতনি ড. অপর্ণা বসু, ভাস্বতি চক্রবর্তী, মিতালী চৌধুরী ও নাতি প্রতাপ নারায়ণ চৌধুরী ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরীর স্মৃতি তর্পণ করেন। তারা আয়োজকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। ব্রিটেন থেকে এসেছিলেন একদল প্রাক্তন ছাত্র। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। সভাপতিত্ব করেন জগন্নাথপুর উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান। তার অক্লান্ত চেষ্টায়ই স্কুলটির শতবর্ষ পালিত হয়। বৃহত্তর সিলেটবাসী ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরীর বংশধরদের সম্মানে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী তাদের বিশেষভাবে সম্মানিত করেন।
অনেক কষ্ট স্বীকার করেও পর্যটকরা ঐতিহ্যময় প্রাচীন পুরাকীর্তি পাইলগাঁও জমিদার বাড়িটি দেখতে যান, জানতে চান এর ৩০০ বছরের ইতিহাস। দুঃখের বিষয় বাড়িটি এখন ধ্বংসপ্রায়। পাইলগাঁও যাওয়ার রাস্তাটির সঙ্গে সঙ্গে জমিদার বাড়িটিরও সংস্কার ও সংরক্ষণ প্রয়োজন।
লেখক: প্রবীণ সাংবাদিক, ইন্টারন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট অ্যামেরিটাস, কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন (সিজেএ), জাতীয় প্রেসক্লাবের প্রাক্তন সভাপতি, সম্মানিত ফেলো বাংলা একাডেমি।
ঢাকা, ৩১ জানুয়ারি ২০২০

  • [১]