সুনামগঞ্জ জেলার মধ্যে সবচাইতে দুর্গম ও অনুন্নত উপজেলার নাম হলো শাল্লা। এখনও জেলা সদর বা বাংলাদেশের যেকোন স্থান থেকে সড়কপথে সরাসরি শাল্লা যাওয়ার কোন উপায় নেই। আগে প্রবাদবাক্যের মতো শাল্লার যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পর্কে বলা হতো, ‘বর্ষায় নাও আর হেমন্তে পাও’। অর্থাৎ নৌকা ও পদযুগল ছাড়া শাল্লার সাথে যোগাযোগের আর কোন মাধ্যম ছিল না। অবস্থা এখন পালটেছে অনেক। মোটরসাইকেলে চড়ে কম সময়ে শুকনো মৌসুমে শাল্লা যাওয়া যায় বটে, তবে এখনও ওখানে যেতে কোন পাবলিক পরিবহন ব্যবস্থা দাঁড় করানো যায় নি। এমন এক দুর্গম উপজেলা শিক্ষায় বেশ ভাল করে যাচ্ছে ধারাবাহিকভাবে। শনিবার পিইসি বা প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার ফলাফল ঘোষিত হয়। এই ফলাফলে জেলার সেরা সফলতা দেখিয়েছে দুর্গম এই উপজেলাটি। শিক্ষার সফলতার ক্ষেত্রে শাল্লার এই নজরকাড়া ফলাফল শুধু এবারের পিইসিতেই নয় বরং গত এইচএসসি পরীক্ষায়ও উপজেলাটি জেলায় সেরা ফলাফল অর্জন করেছিল। এবার পিইসি পরীক্ষায় শাল্লায় পাসের হার গড়পড়তা ৯২.৫০%। এই ফলাফল জেলার গড় ফলাফলের চাইতে বেশ ভাল। জেলায় পিইসির পাসের হার প্রায় ৮৮%। অন্যদিকে ফলাফলের মানের বিবেচনায়ও শাল্লা বেশ ভাল করেছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫১ জন। যা তুলনামূলক বিচারে মন্দ নয়। সারা দেশের মধ্যে শিক্ষার অগ্রগতিতে সুনামগঞ্জের অবস্থান অনেক নীচে, একসময় এই অবস্থান সম্ভবত নীচের দিক থেকে দ্বিতীয় ছিল। জেলার শিক্ষার হার ও মান বাড়ানোর জন্য গত কয়েক বছর যাবৎ ধারাবাহিকভাবে আলাপ আলোচনা চলমান থাকলেও এখন পর্যন্ত ইপ্সিত জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব হয় নি। তবে শাল্লার ফলাফল আমাদেরকে আশান্বিত করে যে, সেই দিন আর বেশি দূরে নয় যেদিন আমরা শিক্ষার অগ্রগতিতে জাতীয় মানের কাছাকাছি যেতে সক্ষম হব।
পিইসিতে এই যে ভাল ফলাফল অর্জন করল শাল্লা, তার পিছনে কী ছিল কারণ? উপজেলার কয়েকজন শিক্ষক বলেছেন, তারা শিক্ষার্থীদের প্রতি অধিকতর মনোযোগী ছিলেন। তারা বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা করেছিলেন। সার্বিকভাবে ভাল ফলাফল অর্জনের জন্য সকলের মধ্যে একটি উদগ্র বাসনা কাজ করেছিল। মনে প্রাণে কিছু চাইলে সেটি অর্জিত হয়, শাল্লার প্রাথমিকের বালক-বালিকারা সেটি দেখিয়ে দিয়েছে। এমন সন্তোষজনক ফলাফলের জন্য আমরা শাল্লা উপজেলার শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে বিশেষভাবে অভিনন্দন জানাই।
বর্তমান যুগ হলো জ্ঞানভিত্তিক উৎকর্ষতা অর্জনের মাধ্যমে নিজের জায়গা করে নেয়ার যুগ। এই সময়ে শিক্ষায় পিছিয়ে থেকে নিজের, পরিবারের ও দেশের উন্নয়ন সাধন করা কোনভাবেই সম্ভব নয়। আমাদের অভিভাবকম-লী এই বিষয়টি আগের যেকোন সময়ের চাইতে ভালভাবে বুঝতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁরা সন্তানসন্ততির লেখাপড়াকে সবিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। সরকারও যথেষ্ট পরিমাণে সহায়তা নিয়ে এগিয়ে এসেছেন। সবকিছুর সম্মিলিত যোগফলই হরো শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়ন। আমরা আজ শাল্লার ফলাফল নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করছি, এটি মুদ্রার একটি পিঠ। মুদ্রার অন্য পিঠটিও আমাদের সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। তথ্য অনুসারে উপজেলায় এবার পিইসি পরীক্ষার্থী ছিল ২০৮৭ জন। এখন দেখার বিষয় হলো উপজেলায় প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার মতো উপযুক্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা কত। আমাদের মনে হয় এই জায়গায় দুর্বলতার দেখা পাওয়া যাবে। আমরা তখনই পুরোপুরি সন্তুষ্ট হব যখন দেখব আমাদের একটি শিশুও শিক্ষা গ্রহণের বাইরে অবস্থান করছে না। কেউ শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে ঝরে পড়ছে না।